ঘনিষ্ঠ মিত্র মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বন্দী, তবুও কেন চুপ পুতিন?
নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর রুশ সোশ্যাল মিডিয়া নেটওয়ার্কগুলোতে ভ্লাদিমির পুতিনের একটি উক্তি সম্বলিত মিম ভাইরাল হয়েছে। এতে পুতিনের ছবির পাশে লেখা, 'আমরা আমাদের আপনজনদের হাল ছাড়ি না।' কিন্তু পাশে থাকা ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে লিবিয়ার গাদ্দাফি, সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ, ইউক্রেনের ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ এবং সর্বশেষ ভেনিজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোকে। এরা সবাই এক সময় মস্কোর 'মূল মিত্র' হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন।
গত শনিবার মার্কিন কমান্ডোরা যখন মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায়, তার আগেই মার্কিন বাহিনী ভেনিজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—যা রাশিয়া সরবরাহ করেছিল—ধ্বংস করে দেয়। তবে মস্কো কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি। ক্রেমলিন কেবল ঘটনাটিকে 'অগ্রহণযোগ্য সশস্ত্র আগ্রাসন' বলে নিন্দা জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদুরোর পতনে রাশিয়ার জন্য তাৎক্ষণিক ক্ষতি হলেও দীর্ঘমেয়াদী কিছু সুবিধাও রয়েছে। লন্ডনের 'সেন্ট্রাল এশিয়া ডিউ ডিলিজেন্স' থিঙ্ক ট্যাঙ্কের প্রধান আলিশার ইলখামভ আল জাজিরাকে বলেন, 'একদিকে পুতিনের সম্মান ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে কারণ মাদুরো ছিলেন ল্যাটিন আমেরিকায় তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র। তবে পুতিনের কাছে এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, ট্রাম্প তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করছেন।'
ইলখামভ মনে করেন, এই নতুন বিশ্বব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক আইনের সার্বভৌমত্বের চেয়ে পেশিশক্তি বা 'ফোর্স' বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে, যা পুতিনের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। বিশেষ করে ইউক্রেন এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দেশগুলোতে রাশিয়ার আধিপত্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে এটি মস্কোকে 'কার্ট ব্লাঞ্চ' বা অবাধ স্বাধীনতা দিতে পারে।
জার্মানির ব্রেমেন ইউনিভার্সিটির রাশিয়া গবেষক নিকোলাই মিত্রোখিনের মতে, গত আগস্টে আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে ট্রাম্প ও পুতিনের শীর্ষ বৈঠকে হয়তো 'প্রভাব বলয়' ভাগাভাগি নিয়ে কোনো গোপন সমঝোতা হয়েছে।
মিত্রোখিন বলেন, 'সম্ভবত ট্রাম্প ইউক্রেন বিষয়ে রাশিয়াকে ছাড় দিয়েছেন এবং বিনিময়ে রাশিয়া গ্রিনল্যান্ড বা ভেনিজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিয়েছে।' তিনি আরও যোগ করেন, রাশিয়ার আর্কটিক অঞ্চলে হাইড্রোকার্বন বা তেল-গ্যাস উত্তোলনে ভবিষ্যতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিম সাইবেরিয়ার 'বাজেনোভস্কা সুইতা' (বিশ্বের বৃহত্তম শেল অয়েল মজুত) থেকে তেল উত্তোলনে মার্কিন প্রযুক্তির বিকল্প নেই।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর বিশেষজ্ঞ গালিয়া ইব্রাগিমোভা মনে করেন, মাদুরোকে রক্ষা না করায় ট্রাম্পের সঙ্গে পুতিনের সম্পর্ক রাতারাতি ভালো হয়ে যাবে না। তিনি বলেন, 'পুতিন সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত এই ভেবে যে, মাদুরোর ঘনিষ্ঠ কেউ আমেরিকানদের কাছে তথ্য ফাঁস করেছে। এখন পুতিন নিজের নিরাপত্তা আরও জোরদার করবেন।'
ইব্রাগিমোভা আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, মাদুরোকে যেভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা দেখে পুতিন হয়তো ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে অপহরণের পরিকল্পনা করতে পারেন।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অক্টোবরে মাদুরো পুতিনের কাছে জরুরি বার্তা পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি এস-৩০০ মিসাইল সিস্টেমের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র, সুখোই ফাইটার জেটের মেরামত এবং রাডারসহ লজিস্টিক সাপোর্টের অনুরোধ করেছিলেন। এমনকি তিনি 'আর্থিক সহায়তা পরিকল্পনা'ও চেয়েছিলেন। তবে মস্কো সেই অনুরোধে সাড়া দিয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ক্রেমলিনপন্থী বিশ্লেষকরা অবশ্য মাদুরোর পতনকে 'পশ্চিমা ষড়যন্ত্র' হিসেবেই দেখছেন। আরআইএ নভোস্তি সংবাদ সংস্থায় কিরিল স্ট্রেলনিকভ লিখেছেন, 'সমষ্টিগত পশ্চিম রাশিয়াকে হারানোর চেষ্টা কখনোই ছাড়বে না। তবে তারা চেষ্টা করতে পারে, এবং শেষ পর্যন্ত অনেক ওপর থেকে যন্ত্রণাদায়কভাবেই নিচে পড়বে।'
