তিনি ‘সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন’: কারাগারে ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর বোন উজমা খান
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইমরান খান সুস্থ আছেন বলে জানিয়েছেন তার বোন উজমা খান।
মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) তিনি রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
উজমা খানের এই সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে ইমরান খানের মৃত্যু ও অসুস্থতা নিয়ে চলমান জল্পনার অবসান ঘটেছে।
সাক্ষাতের পর উজমা বলেন, 'আমি আমার বোন আলীমা খান ও নুরীন খানের সঙ্গে পরামর্শের পর বিস্তারিত তথ্য জানাব।'
আদালতের আদেশ সত্ত্বেও দলীয় নেতৃত্ব ও পরিবারের সদস্যদের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দেখা করতে বাধা দেওয়া নিয়ে সম্প্রতি পিটিআইয়ের নেতাকর্মীদের উদ্বেগ বাড়ছিল।
দলের নেতৃত্ব এবং পরিবারের সদস্যদের ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করার অনুমোদনের দাবিতে পিটিআই ইসলামাবাদ হাইকোর্টের বাইরে বিক্ষোভ এবং আদিয়ালা কারাগার অভিমুখে পদযাত্রার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল।
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিরাপত্তার কারণে কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী সাক্ষাতের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
তারা আরও অভিযোগ করেছেন, এর আগে যারাই ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, তারা সবাই তার সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।
অন্যদিকে, পিটিআইয়ের আজকের নির্ধারিত বিক্ষোভের আগে ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডি প্রশাসন শহর দুটিতে জনসমাবেশ ও বিক্ষোভে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ১৪৪ ধারা কার্যকর করেছে।
গত সপ্তাহে খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদি অষ্টমবারের মতো ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি না পেয়ে কারাগারের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। এমনকি ১৬ ঘণ্টার অনশনের পরেও তাকে ইমরানের সঙ্গে সাক্ষাত করার অনুমতি না দেওয়ায় পিটিআই এই বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়।
২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে ইমরান খান কারাগারে রয়েছেন। তিনি ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে এক অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুত হন।
সাক্ষাতের আগে উজমা বলেন, 'অবশেষে তিনি তার ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি পেয়ে খুশি' এবং কারাগার থেকে ফিরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলবেন।
আলীমা খান বলেন, কারাবন্দি পিটিআই প্রতিষ্ঠাতাকে এক মাস ধরে একাকী রাখা হয়েছে।
তিনি ভারী নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেন, পুলিশ রাস্তায় ময়লা পানি ফেলে রেখেছে এবং সরকার তার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাত নিয়ে ভীত।
তিনি বলেন, 'আজ তারা এখানে পাঞ্জাবের অর্ধেক পুলিশ মোতায়েন করেছে। আমরা বুঝতে পারছি না তারা কী নিয়ে এত ভয় পাচ্ছে।'
এক প্রশ্নের জবাবে আলীমা বলেন, কর্তৃপক্ষ 'তার বোন নুরিনের ভারতীয় মিডিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত নিয়ে চিন্তিত, তবে তিনি বিশ্বব্যাপী এই উদ্বেগ তুলে ধরবেন।'
তিনি বলেন, 'আমাদের ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করা আমাদের বৈধ ও সংবিধানগত অধিকার' এবং পরিবারের সদস্যরা তার সাক্ষাতের অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত 'যতদিন প্রয়োজন অপেক্ষা করবে'।
তিনি অভিযোগ করেন, পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ 'অগণতান্ত্রিক' পুলিশি বিধিনিষেধ আরোপ করেছেন এবং সরকার 'বারবার মিথ্যা বলছে'।
তিনি বলেন, শুধু একটি সাধারণ পারিবারিক সাক্ষাতের অনুমতি দিলেই এই সমস্যার সমাধান হবে।
ইমরান খানের ছেলেরাও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে কর্তৃপক্ষ তার অবস্থা সম্পর্কে 'অপরিবর্তনীয় কিছু গোপন করছে'। কারণ গত তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ইমরান খান জীবিত থাকার কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ পরিবারের সদস্যরা পাচ্ছে না।
আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ইমরানের সঙ্গে জেলে সাক্ষাতের সুযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে। এমনকী তাকে আরও কড়া নিরাপত্তার কারাগারে স্থানান্তরের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে।
এরমধ্যেই তার ছেলে কাসিম খান রয়টার্সকে বলেন, আমার পরিবার এখনও (ইমরান খানের সঙ্গে) কোনো সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেনি। অন্যরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন কি না এমন যাচাইযোগ্য তথ্যও পাইনি আমরা, অথচ আদালত প্রতি সপ্তাহের সাক্ষাৎ করতে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, 'আপনার বাবা নিরাপদ আছেন কি না, আহত কি না, এমনকি বেঁচে আছেন কি না—তা না জানতে পারা এক ধরনের মানসিক নির্যাতন।'
কাসিম লিখিত মন্তব্যে আরও বলেন, গত কয়েক মাস ধরে পরিবারের সঙ্গে ইমরানের এমন কোনো যোগাযোগ হয়নি, যেটাকে স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা যায়।
তিনি বলেন, 'আজ আমরা তার অবস্থা সম্পর্কে কোনো যাচাইযোগ্য তথ্যই পাচ্ছি না। আমাদের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো—কিছু একটা অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে, যা আমাদের কাছ থেকে লুকানো হচ্ছে।'
পরিবার জানায়, ইমরানের খানের ব্যক্তিগত চিকিৎসককে গত এক বছর ধরে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়নি।
নিরাপত্তা বৃদ্ধি
আদিয়ালা কারাগারের চারপাশে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সতর্কতায় বজায় রাখা হয়েছে। কারাগারের সড়কের আশেপাশে পাঁচটি অতিরিক্ত চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে।
পুলিশ মোতায়েনে ১২টি থানার কর্মকর্তা, নারী পুলিশ কর্মকর্তা এবং ৭০০-এর বেশি নিরাপত্তা কর্মী ছিলেন, তারা দমনশীল সরঞ্জাম নিয়ে প্রস্তুত ছিলেন।
এদিকে পিটিআইয়ের বিক্ষোভকে ঘিরে ইসলামাবাদও রাওয়ালপিন্ডিতে ১৪৪ ধারা কঠোরভাবে প্রয়োগের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডিতে ১৪৪ ধারার প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
ইসলামাবাদে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, পিটিআই নেতারা ইসলামাবাদ হাইকোর্ট বা রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা জেল; যেখানেই বিক্ষোভ করতে আসুন না কেন, ১৪৪ ধারার অধীনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি পিটিআই-সমর্থিত আইনপ্রণেতাদের আইন মেনে চলার আহ্বান জানান।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারার ক্ষমতাবলে, জেলা প্রশাসন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোনো এলাকায় চার বা তার বেশি মানুষের সমাবেশ নিষিদ্ধ করতে পারে।
রাজধানী ইসলামাবাদে প্রশাসন গত ১৮ নভেম্বর থেকে দুই মাসের জন্য জনসমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
অন্যদিকে, রাওয়ালপিন্ডি ডেপুটি কমিশনার হাসান ওয়াকার চিমা ১ থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত শহরটিতে ১৪৪ ধারা জারি করেছেন।
