ইভি, সৌরবিদ্যুতের পর ভবিষ্যতে যেসব ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করবে চীন
প্রযুক্তিতে চীনের নেতৃত্ব নিয়ে অনেকেই উদ্বিগ্ন। তাদের অনেকে সাধারণত ইলেকট্রিক গাড়ি (ইভি), সোলার প্যানেল ও ওপেন-সোস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসব নিয়েই ভাবেন বেশি। তাদের জন্য খারাপ খবর আছে। সম্প্রতি চীন আরও দুটি প্রযুক্তিতে অগ্রসর হচ্ছে বলে জানা গেছে। তার একটি হলো স্বয়ংক্রিয় যানবাহন ও অপরটি হলো নতুন ওষুধ। এই শিল্পগুলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে, এগুলো চীনের উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে বিশ্বে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরবে।
এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর প্রতিটিতে চীনের অগ্রগতি ছিল বিস্ময়কর। তাদের রোবোট্যাক্সি বিপ্লবও দ্রুত গতি পাচ্ছে। এটি পরিবহন, লজিস্টিকস এবং দৈনন্দিন শহুরে জীবনকে নতুন করে সাজাতে পারে। দেশটির স্বয়ংক্রিয় ট্যাক্সিগুলো আমেরিকার ওয়েইমো ট্যাক্সির তুলনায় মাত্র এক তৃতীয়াংশ খরচে তৈরি করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই এগুলো লাখ লাখ কিলোমিটার চালানো হয়েছে এবং ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে। এদিকে, ওষুধের ক্ষেত্রে চীন নিজেদেরকে জেনেরিকের অনুকরণকারী থেকে পরিবর্তন করে নতুন ওষুধ তৈরিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ডেভলপারে পরিণত হয়েছে। তাদের এ ওষুধের মধ্যে ক্যান্সার প্রতিরোধী ওষুধও রয়েছে। পশ্চিমা প্রতিদ্বন্দ্বীরা এখন চীনা কোম্পানিগুলোর ওষুধের লাইসেন্স নিচ্ছে। চীন থেকেই একটি বড় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির উত্থান হবে, এমন দিন আর বেশি দূরে নেই।
এ শিল্প দুটির উত্থান চীনের উদ্ভাবনী কাজের অনেক কিছুই সামনে নিয়ে এসেছে। প্রচুর প্রতিভা, বিস্তৃত উৎপাদন ও আকৃতির দিক থেকে বিশাল হওয়ায় দ্রুতই ভ্যালু চেইনে এগিয়ে যাচ্ছে চীন। রোবোট্যাক্সি উৎপাদন মূলত ব্যাপক ইভি উৎপাদনের উপর ভর করে এগিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়াও স্বয়ংক্রিয় গাড়ি চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় লিডার ও অন্যান্য সেন্সর সরবরাহকারী হিসেবে একচ্ছত্র আধিপত্যও চীনের। আর এ বিশাল কর্মযজ্ঞ চীনকে খরচ কমাতেও সাহায্য করেছে। অপরদিকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য রোগীর দলও বড় এবং জেনেরিক ওষুধ তৈরি থেকে প্রাপ্ত মুনাফা ওষুধ উদ্ভাবনকে দ্রুততর করেছে।
চীনের সফলতার পেছনে আরেকটি চমকপ্রদ উপাদান হলো এর চটপটে ও সহনশীল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। অন্যান্য শিল্পের মতো, স্থানীয় সরকারগুলিও সংস্থাগুলোকে সস্তায় ঋণ এবং অন্যান্য সাহায্য দিয়েছে। কিন্তু এই অগ্রগতিকে প্রকৃতপক্ষে দ্রুত করেছে তাদের দক্ষ ও নমনীয় নিয়ম। ২০১৬ সালে রাজনৈতিক নেতারা চীনকে 'বায়োটেকনোলজি সুপারপাওয়ার' হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য ঘোষণা করার অল্প সময়ের মধ্যেই দেশটি বেশ কয়েকটি সংস্কার বাস্তবায়ন করে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ওষুধের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মীসংখ্যা চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং ২০ হাজার নতুন ওষুধের আবেদন মাত্র দুই বছরে মুছে ফেলা হয়। মানুষের ওপর পরীক্ষামূলক প্রয়োগের অনুমোদন পেতে যে সময় লাগত, তা ৫০১ দিন থেকে কমে ৮৭ দিনে নেমে আসে। গত বছর দেশটির সংস্থাগুলো বিশ্বের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের এক-তৃতীয়াংশ সম্পন্ন করেছে।
অনুরূপভাবে, চীন রোবোট্যাক্সি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করতে দ্রুত উদ্যোগী হয়েছিল। স্থানীয় কর্মকর্তারা, প্রতিভা এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে আগ্রহী হয়ে, দ্রুত গতিতে পাইলট প্রকল্পগুলোর অনুমোদন দিয়েছেন এবং স্বয়ংক্রিয় গাড়িগুলোকে গাইড করার জন্য সেন্সর ও অন্যান্য ডিজিটাল অবকাঠামো স্থাপন করেছেন। আর গুলো ৫০টিরও বেশি শহরে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হয়েছে। অনেকেই দায়বদ্ধতার আইন এবং পরীক্ষার নির্দেশিকা নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। যদিও দুর্ঘটনার কারণে মাঝে মাঝে থামতে হয়েছে। তবুও পাইলট প্রকল্পগুলো প্রকৌশলী এবং নীতিনির্ধারকদের নতুন প্রযুক্তিটি বুঝতে সাহায্য করেছে।
দেশের ভেতরে কঠোর প্রতিযোগিতার কারণে ব্যক্তিগত কোম্পানিগুলোর জন্য পরিবেশ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু যারা টিকে যায় তারা নিজেদের অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি চ্যাম্পিয়ন হিসেবে গড়ে তোলে। মুদ্রাস্ফীতিতে জর্জরিত একটি অর্থনীতিতে চীনের রোবোট্যাক্সি পরিচালনাকারীরা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে এবং সস্তা, মানুষের দ্বারা চালিত ট্যাক্সিগুলোর সাথেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। নতুন প্রযুক্তিগুলো যে ভর্তুকি পায়, তা শেষ পর্যন্ত দেশটির কম বেতনপ্রাপ্ত জনগণের পকেট থেকে আসে। ফলে সৃষ্ট মূল্য যুদ্ধে অনেক লোকসানে চলা উদ্যোগ টিকে থাকবে না। তবে যারা টিকে থাকবে, তারা অর্থ উপার্জনের জন্য বিদেশের বাজারের দিকে তাকাবে।
সুতরাং, চীনের কম খরচে উদ্ধাবনের একটি নতুন ঢেউ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পরবে। তবে তা বিভিন্ন উপায়ে ঘটবে। চীনের সস্তা ওষুধ সুবিধা আনতে পারে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল বিশ্বে। কিন্তু চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য আমেরিকার লাভজনক বাজারটি হলো সবচেয়ে লোভনীয় পুরস্কার, যা বিশ্বের মোট ওষুধখাতের মুনাফার ৭০ শতাংশের এর উৎস। আর পশ্চিমা ওষুধ প্রস্তুতকারকদের সাপ্লাই চেইনে চীনের গুরুত্বের অর্থ হলো এই সম্পর্কটি সিমবায়োটিক বা পরস্পরের জন্য উপকারীও হতে পারে।
অন্যদিকে, রোবোট্যাক্সিগুলোর ক্ষেত্রে চীনা প্রযুক্তি রপ্তানি আরও সাধারণ পথ অনুসরণ করবে। আমেরিকার নিজস্ব শিল্প রয়েছে ও তাদের চীনের প্রযুক্তি নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগও রয়েছে। তাই তারা বাধা সৃষ্টি করবে। তবে অন্য দেশে যেখানে স্বয়ংক্রিয় যানবাহনের ক্ষেত্রে দেশীয় প্রচেষ্টা অনেক পিছিয়ে আছে, সেখানে এটি সম্ভাব্য স্থান দখল করতে পারে।
বাকি বিশ্বের কীভাবে এর প্রতি সাড়া দেওয়া উচিত? এই প্রতিযোগিতা পশ্চিমা অর্থনীতিগুলোকে ফাঁপা করে দেওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। যেখানে চীনা ডাম্পিং এবং ভর্তুকির প্রমাণ রয়েছে, সেখানে চীনা রপ্তানির বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া যুক্তিযুক্ত এবং প্রয়োজনীয়। যেখানে নিরাপত্তার ঝুঁকি রয়েছে, সেখানেও পদক্ষেপ নেওয়াও ন্যায্য। রোবোট্যাক্সির মাধ্যমে সংগৃহীত ডেটা নজরদারির হুমকি তৈরি করতে পারে। তাছাড়া চীনের ফার্মাসিউটিক্যাল ক্ষেত্রেও দুর্নীতির কেলেঙ্কারি ঘটেছে।
তা সত্ত্বেও, নিরাপত্তা বা সুরক্ষার নামে আবেগপ্রবণ প্রতিরোধমূলক নীতি গ্রহণ একটি ভুল হবে। চীনা উদ্ভাবনের সুফলগুলোকে অবরুদ্ধ বা সীমাবদ্ধ করলে জীবনযাত্রার সামর্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন ভোক্তারা তখন সস্তা ও উন্নত ওষুধ এবং পরিবহনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন।
এই কারণেই পশ্চিমা দেশগুলোর নিজেদের অভ্যন্তরীণ উদ্ভাবন প্রক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে আবার ভাবা দরকার। চীনের উত্থানকে অনিবার্য বা ভাগ্য নির্ধারিত বলে ধরে নেওয়া লোভনীয়। কারণ চীনের প্রযুক্তিগত আধিপত্য কেবল একনায়কতান্ত্রিক হুকুম এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি অনুদানের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে এমনটা ভাবা সহজ এবং গণতান্ত্রিক দেশগুলো এই পথে হাঁটতে চাইবে না। কিন্তু চীনের বেসরকারি খাতের উদ্ভাবনী দক্ষতা এবং এর নিয়ন্ত্রকদের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও সাফল্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ। দুঃখের বিষয় হলো, এই জায়গায় পশ্চিমা দেশগুলো ভুল দিকে হাঁটছে।
ধীর গতির জীবন
আমেরিকার কাছে প্রতিযোগিতা করার মতো বিশাল যোগ্যতা ও প্রচুর অর্থ আছে। কিন্তু বহু রাজ্যে, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাট-শাসিত রাজ্যগুলোতে, নিয়ন্ত্রকরা স্বয়ংক্রিয় যানবাহনকে হয় আটকে দিচ্ছেন বা বিলম্বিত করছেন। সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে এবং মৌলিক গবেষণার জন্য তহবিল কাটছাঁট করছে। অন্যান্য পশ্চিমা দেশের মতো, আমেরিকাও অভিবাসী, এমনকি মেধাবী অভিবাসীদের প্রতিও বিরূপ মনোভাব দেখাচ্ছে।
ওষুধের ক্ষেত্রে, চীনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অংশ যখন বাড়ছে, তখন ইউরোপ পিছিয়ে পড়ছে। ইউরোপের অর্থনীতিগুলোর নতুন প্রযুক্তির জন্য অর্থ জোগাড় ও তা বিকাশের জন্য আরও একীভূত হওয়া জরুরি। সেই সব দেশেও নিয়ন্ত্রকরা প্রায়শই ঝুঁকি নেওয়া এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগের বিনিময়ে কেবল সুরক্ষাকেই বেশি মূল্য দেন।
এমন কোনো কথা নেই যে ভবিষ্যত চীনের হাতেই থাকতে হবে। কিন্তু ইভি, সৌর শক্তি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির কথা বাদ দিলেও, যদি পশ্চিমা বিশ্ব স্বয়ংক্রিয় গাড়ি এবং ওষুধ শিল্পে প্রতিযোগিতা করতে চায়, তবে তাদের অবশ্যই চীনের উত্থান থেকে সঠিক শিক্ষা নিতে হবে।
