মৃত যাত্রীর ‘শেষ যাত্রা’: বিদেশের মাটিতে মৃত্যু হলে আসলে কী ঘটে?
সেপ্টেম্বরের এক সোমবার। ভোর ৫টায় বেন ভোসের ফোন বেজে উঠল। সপ্তাহে এমন ভোর তার জন্য নতুন কিছু নয়। ফোনের ওপাশ থেকে আমস্টারডামের শিফোল বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল জানাল, এশিয়া থেকে আসা একটি ফ্লাইটে মাঝপথেই এক যাত্রী মারা গেছেন।
ব্যস, ভোসের কাজ শুরু হয়ে গেল। তিনি শিফোল মর্চুয়ারির কো-অর্ডিনেটর। বছরে শত শত বার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তিনি। যারা বিদেশে বা ফ্লাইটে মারা যান, তাদের শেষ যাত্রার দায়িত্ব তার কাঁধেই।
ভোর ৬টায় ফ্লাইট নামার পর ভোস এবং নেদারল্যান্ডসের বর্ডার পুলিশ বা 'মারেচৌসি'-র একজন প্রতিনিধি প্লেনের ভেতরে যান। যাত্রীরা নেমে যাওয়ার পরই তারা সেখানে প্রবেশ করেন। সঙ্গে থাকেন একজন মেডিকেল পরীক্ষক, যিনি মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করেন। এরপর ভোস এবং পুলিশ কর্মকর্তা মৃতদেহটি একটি বডি ব্যাগে ভরে প্লেনের পেছনের ইমার্জেন্সি দরজা দিয়ে বের করে আনেন। সেখান থেকে সোজা মর্গে।
ভোস বলেন, 'প্লেনের কাছেই বিশেষ গাড়ি থাকে। আমরা প্লেন থেকে সোজা গাড়িতে উঠে যাই, যাতে বিমানবন্দরের ভিড়ের মধ্যে কেউ কিছু দেখতে না পায়।'
মৃতের প্রতি সম্মান আর গোপনীয়তা রক্ষা করাই ভোসের প্রধান কাজ। একই সঙ্গে শোকার্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়াও তার দায়িত্ব। বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে মারা গেলে কী হবে—এমন চিন্তা সাধারণত কেউ করেন না। কিন্তু ভোস এবং তার দল এই কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে পরিবারগুলোকে সাহায্য করেন।
অনেক বিমানবন্দরেই মর্গের ব্যবস্থা থাকে, কিন্তু শিফোল বিমানবন্দরের মতো পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়া মর্গ খুব একটা দেখা যায় না। ১৯৯৭ সালে চালু হওয়া এই মর্গটি ইউরোপের ব্যস্ততম এই বিমানবন্দরের এক কোণায় অবস্থিত।
বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই এটি একটি মর্গ। কাঠের নকশা আর কাঁচের জানালা দেওয়া ভবনটির ভেতরে ফিউনারেল হোম বা শেষকৃত্যের সব ব্যবস্থাই আছে। মরদেহ ধোয়ানো, সাজানো বা হিমঘরে রাখার ব্যবস্থা—সবই এখানে হয়। এমনকি বিভিন্ন ধর্মের নিয়ম মেনে শেষকৃত্যের ব্যবস্থাও আছে।
ভোসের মতে, বিমানবন্দরের সব বিভাগ যেমন ছোটখাটো বিষয়ে নজর রাখে, তার দলও ব্যতিক্রম নয়।
শেষ যাত্রার প্রস্তুতি
মরদেহ দেশে বা বিদেশে পাঠানোর এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় 'রিপ্যাট্রিয়েশন অফ মর্টাল রিমেইনস'। এটি বেশ জটিল। ভোস ও তার দল ডাক্তার, এয়ারলাইন কর্মী, দূতাবাস এবং সরকারি সংস্থার সঙ্গে মিলে কাগজপত্র ঠিক করেন। অনেক দেশ, যেমন যুক্তরাষ্ট্র, মরদেহ পাঠানোর আগে 'এমবামি' বা রাসায়নিক দিয়ে সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক করে। ভোসের দল এসব ব্যবস্থাও করে দেয়।
মর্গটি ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে। কারণ মৃত্যু তো আর সময় দেখে আসে না। ভোস বলেন, 'এটি সপ্তাহে ৭ দিন, ২৪ ঘণ্টার কাজ। কখনোই থামে না।'
প্রতি বছর প্রায় ২,৫০০ মরদেহ আনা-নেওয়ার কাজ করে এই মর্গ। এর মধ্যে নেদারল্যান্ডসের নাগরিক যেমন আছেন, তেমনি আছেন বিদেশি পর্যটকরাও।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশে ঘুরতে গিয়ে ডাচ নাগরিকদের মৃত্যুর হার বেড়েছে। ২০২৪ সালে ১,২৭৫ জন ডাচ নাগরিক বিদেশে মারা গেছেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
শীতকালে কাজের চাপ বাড়ে। কারণ অনেকেই স্কি করতে যান, আবার বয়স্করা গরমের দেশে বেড়াতে যান। ভোস বলেন, 'অনেক ডাচ নাগরিক স্পেন বা পর্তুগালে যান। কিন্তু তারা বয়স্ক এবং সেখানেই মারা যান।'
এক দেশ থেকে আরেক দেশে মরদেহ পাঠানোর কোনো আন্তর্জাতিক আইন নেই। তবে ১৯৩৭ সালে বার্লিন চুক্তির মাধ্যমে কিছু নিয়ম ঠিক করা হয়েছিল। মরদেহের জন্য একটি বিশেষ ট্রাভেল ডকুমেন্ট বা 'মর্চুয়ারি পাসপোর্ট' লাগে। এতে নাম ও মৃত্যুর কারণ লেখা থাকে।
আগে জিংক বা দস্তার আস্তরণ দেওয়া কফিন ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এখন আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী মরদেহকে বায়ুনিরোধক ব্যাগে রাখা হয়। এরপর কফিনে ভরে সিল করা হয়। শেষে ভোস বা তার দলের কেউ লাল মোমের সিল মেরে নিশ্চিত করেন যে সব কাগজপত্র ঠিক আছে।
মরদেহ এক দেশ থেকে আরেক দেশে নেওয়া বেশ খরচে ব্যাপার। এমাসর ডি লুকা নামে এক বিশেষজ্ঞ জানান, এতে ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ ইউরো খরচ হতে পারে।
ভালো ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স বা ভ্রমণ বীমা থাকলে এই খরচ কোম্পানি বহন করে। তবে বীমা করার সময় শর্তগুলো ভালো করে দেখে নেওয়া জরুরি। ভোস বলেন, 'আমি সবসময় বলি, বিশ্বভ্রমণে বের হওয়ার আগে অবশ্যই ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স করুন।'
সবসময় সহজ নয়
মাঝে মাঝে পরিস্থিতি বেশ জটিল হয়ে ওঠে। যেমন কোনো আশ্রয়প্রার্থী বা শরণার্থী মারা গেলে, যার পাসপোর্ট নেই। অথবা রাশিয়ার মতো দেশে মরদেহ পাঠাতে হলে। যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার আকাশপথ বন্ধ এবং কাগজপত্র ঠিক করতে অনেক সময় ও টাকা লাগে।
আবার কখনো কখনো মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ থাকলে পুলিশ তদন্ত করে। তখন সাংবাদিক বা উৎসুক জনতার ভিড় সামলাতে হয়।
সোশ্যাল মিডিয়াও মাঝে মাঝে সমস্যা তৈরি করে। টিকটকে মর্গের ভিডিও দেখে অনেক সময় মানুষ সেখানে ভিড় করে। ভোসকে তখন নিরাপত্তারক্ষীর ভূমিকা পালন করতে হয়।
১৯৯০ সাল থেকে ফিউনারেল ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছেন ভোস। ৩৫ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি অনেক কিছু দেখেছেন। তার মতে, কাজের সবচেয়ে বড় তৃপ্তি হলো কঠিন সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
তিনি বলেন, 'মৃত ব্যক্তি ও তার পরিবারের জন্য কাজটা শেষ করার পর মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি আসে। যখন সব কিছু ঠিকঠাক হয়, সেটাই আসল সন্তুষ্টি।'
