যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প–জেলেনস্কি বৈঠকের আহ্বান ইউক্রেনের
চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে এক বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছেন ইউক্রেনের নিরাপত্তা প্রধান রুস্তেম উমেরভ।
তিনি বলেন, যুদ্ধ বন্ধে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ মাসের সর্বাধিক উপযুক্ত তারিখে জেলেনস্কির যুক্তরাষ্ট্র সফর আয়োজনের চেষ্টা চলছে।
মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) উমেরভ জানান, জেনেভায় আগের বৈঠকে আলোচিত চুক্তির মূল বিষয়গুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেন 'সাধারণ বোঝাপড়ায়' পৌঁছেছে।
তবে সম্ভাব্য ট্রাম্প–জেলেনস্কি বৈঠকের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি হোয়াইট হাউস।
একইদিন যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করে যে তাদের কর্মকর্তারা আবুধাবিতে রুশ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন।
এরআগে, স্থানীয় সময় সোমবার দিবাগত রাতভর দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বিমান হামলা হয়। কিয়েভে রুশ হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত হয়, আর রোস্তভ অঞ্চলে ইউক্রেনীয় হামলায় তিনজনের মৃত্যুর কথা জানায় রুশ কর্তৃপক্ষ।
উমেরভ বলেন, নভেম্বরেই সঠিক সময়ে জেলেনস্কির যুক্তরাষ্ট্র সফর আয়োজন করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তির চূড়ান্ত ধাপ সম্পন্ন করার আশা করছেন তারা।
তিনি জানান, জেনেভায় রোববারের বৈঠকে দু'পক্ষ শান্তি পরিকল্পনার মূল শর্তগুলো নিয়ে একমত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, ইউক্রেন একটি শান্তি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে, তবে কিছু ছোটখাটো বিষয় এখনও সমাধান বাকি আছে।
তবে ইউক্রেন ও রাশিয়ার গ্রহণযোগ্য শর্তের ব্যবধান এখনও বিশাল। আর কিয়েভ যে ধরনের চুক্তি মেনে নিতে পারে, ক্রেমলিন তাতে রাজি হবে বলে মনে হয় না।
ইউক্রেন ও ইউরোপের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত চুক্তির প্রাথমিক খসড়ার সমালোচনা করে বলেন, এটি রাশিয়ার পক্ষে বেশি সুবিধাজনক।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির পাল্টা প্রস্তাবে রুশ দখলকৃত অঞ্চলগুলোর স্বীকৃতি বাদ দেওয়া হয়, ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর আকার বাড়ানো হয় এবং ন্যাটোতে যোগদানের সুযোগ রাখা হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্কিত ২৮ দফা পরিকল্পনায় এসব পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়ে জেলেনস্কি বলেন, এখন যুদ্ধ শেষের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নযোগ্য হতে পারে।
ক্রেমলিনের একজন কর্মকর্তা এসব সংশোধনীকে 'অগঠনমূলক' বলে প্রত্যাখ্যান করেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানান, তাদের দল আবুধাবিতে রুশ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আবার বৈঠক করবে।
রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেন, তারা পরিকল্পনার সংশোধিত সংস্করণ এখনও পাননি এবং আলাস্কায় ট্রাম্প–পুতিন বৈঠকের 'মূলভাব' এতে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
এদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার জানান, ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্রদের 'কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং' বৈঠকও মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হবে।
এর আগে জেলেনস্কি জানান, স্টারমারের সঙ্গে তার 'ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ' আলোচনা হয়েছে।
এ আলোচনার মধ্যে রাতভর হামলায় কিয়েভের দিনিপ্রোভস্কি জেলায় একটি বহুতল ভবনে আগুন লাগে এবং বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়।
জরুরি সেবা বিভাগ জানায়, তিন শিশুসহ ১৮ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং সম্ভাব্য হতাহতের খোঁজে অভিযান চলছে।
পেচেরস্ক জেলার আরেকটি বহুতল ভবনেও হামলায় আগুন লাগে এবং সেখানকার বাসিন্দাদেরও সরিয়ে নেওয়া হয় বলে জানান কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো।
তিনি বলেন, ভবনের ওপরের তলাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে আগুন নেভানো হয়েছে।
হামলার সময় কিয়েভজুড়ে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেলে এয়ার ডিফেন্স সক্রিয় হয় এবং বাসিন্দাদের ভূগর্ভস্থ পার্কিং ও বাংকারে আশ্রয় নিতে বলা হয়।
ইউক্রেনের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোতে 'বৃহৎ ও সুপরিকল্পিত' হামলা চালানো হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মতে, সারারাত ইউক্রেনের দিকে ২২টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৪৬০টির বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়।
রোমানিয়ার আকাশে ন্যাটো চারটি বিমান পাঠায়, যা গত চার দিনের মধ্যে তৃতীয়বার রুশ ড্রোন আটকাতে তাদের বিমান উড়ানোর ঘটনা। মলদোভাতেও ছয়টি রুশ ড্রোন শনাক্ত হয়।
রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা সারারাতে ব্ল্যাক সি ও কুর্স্কসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ২৪৯টি ইউক্রেনীয় ড্রোন আটকেছে।
রাশিয়ার রোস্তভ অঞ্চলে ইউক্রেনীয় হামলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে তিনজনে পৌঁছেছে।
ওই অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত গভর্নর ইউরি স্লিউসার জানান, হাসপাতালে দুজন মারা যান।
এছাড়া, টাগানরোগ শহরে একজন নিহত হন। শহরটির মেয়র সভেতলানা কাম্বুলোভা প্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।
তিনি জানান, হামলায় আরও ১০ জন আহত হয়েছে।
ক্রাসনোদার অঞ্চলের গভর্নর ভেনিয়ামিন কন্দ্রাতিয়েভ ইউক্রেনের রাতের বোমাবর্ষণকে 'কিয়েভের অন্যতম বড় ও দীর্ঘস্থায়ী হামলা' হিসেবে বর্ণনা করেন।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও রুশ কর্মকর্তাদের প্রণীত প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা ইউক্রেন ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছিল।
তারা বলেছিলেন, পরিকল্পনাটি ক্রেমলিনের জন্য বেশি লাভজনক।
তবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট ট্রাম্প প্রশাসন দুই পক্ষের সঙ্গে সমানভাবে যোগাযোগ করছে না, এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন।
জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র–ইউক্রেন আলোচনা শেষে ট্রাম্প বলেন, 'সম্ভবত কিছু ভালো ঘটতে পারে'।
যদিও তিনি সতর্ক করেন, 'শেষ দেখা না পর্যন্ত বিশ্বাস করবেন না।'
জেলেনস্কি প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলোকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, প্রধান সমস্যা হলো পুতিনের দাবি- রাশিয়ার দখলে থাকা অঞ্চলগুলোর আইনি স্বীকৃতি।
রাশিয়া দনেস্ক ও লুহানস্কসহ পুরো পূর্ব দনবাস অঞ্চল থেকে ইউক্রেনের সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার দাবি করে আসছে। এছাড়া তারা ক্রিমিয়া ও খেরসন এবং জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
ইইউ'র পররাষ্ট্র নীতি প্রধান কায়া কালাস বলেন, চূড়ান্ত শান্তি পরিকল্পনাটি এমন হতে হবে যাতে রাশিয়া ভবিষ্যতে আর আক্রমণ চালাতে না পারে এবং রাশিয়া 'কখনোই' জি৮-এ ফিরতে না পারে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। আর হাজার হাজার সৈন্য ও বেসামরিক মানুষ নিহত বা আহত হয়েছে।
