ভিসা বিধিনিষেধ ভারতীয়দের জন্য খারাপ হলেও, ভারতের জন্য হয়তো নয়
ধনী দেশগুলো এখন অভিবাসন নীতি কঠোর করছে। আমেরিকার এইচ-ওয়ানবি বা দক্ষ কর্মীদের ভিসার নতুন আবেদনকারীদের এখন ১ লাখ ডলার অগ্রিম ফি দিতে হবে। ব্রিটেন পড়াশোনা শেষে থাকার ভিসার মেয়াদ দুই বছর থেকে কমিয়ে ১৮ মাস করেছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি-র ওপর ৬ শতাংশ শুল্ক বসানোর প্রস্তাবও দিয়েছে তারা।
কানাডাও বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। ধনী দেশগুলোর জোট ওইসিডি জানিয়েছে, ২০২৪ সালে কাজের জন্য ধনী দেশে যাওয়া অভিবাসীর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় এক-পঞ্চমাংশ কমেছে। পড়াশোনার জন্য যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ১৩ শতাংশ।
এতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে ভারত। আমেরিকার এইচ-ওয়ানবি ভিসার আবেদনকারীদের প্রায় ৭০ শতাংশই ভারতীয়। দেশটিতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ৩০ শতাংশই ভারতের, যা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। ব্রিটেনে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ২৫ শতাংশ এবং কানাডায় প্রায় ৪০ শতাংশই ভারতীয়। সব মিলিয়ে ১৮ লাখ ভারতীয় বিদেশে পড়াশোনা করছে।
ভারতের বিশাল জনসংখ্যা, ইংরেজি জানা মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত প্রকৌশলীদের কারণেই এই সংখ্যা এত বেশি। তবে ইংরেজি ভাষাভাষী 'বড় চার' দেশ—আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমেছে। করোনার পর এই সংখ্যা হঠাৎ বেড়েছিল, এখন তা আবার কমছে।
বিদেশে যাওয়া কমে গেলে ভারত তিনটি প্রধান উপায়ে প্রভাবিত হবে।
প্রথমত, রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় কমে যাবে। প্রবাসীদের পাঠানো টাকা ভারতের জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ। এই টাকা দিয়ে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতির ৪০ শতাংশ মেটানো হয়। ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো ধনী দেশগুলো রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। এর আগে উপসাগরীয় বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এগিয়ে ছিল। তবে আমেরিকায় কর্মরতরা সাধারণত সবচেয়ে বেশি বেতন পান। সান ফ্রান্সিসকোর একজন সফটওয়্যার ডেভেলপার বেঙ্গালুরু, হায়দ্রাবাদ বা দুবাইয়ের সমমানের কর্মীর চেয়ে অনেক গুণ বেশি আয় করেন।
আহমেদাবাদের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্টের চিন্ময় তুম্বে মনে করেন, এই কড়াকড়ি কতদিন থাকবে তার ওপর রেমিট্যান্সের প্রভাব নির্ভর করবে। সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এ নিয়ে সুর কিছুটা নরম করেছেন। তিনি বলেছেন, আমেরিকার জন্য প্রয়োজনীয় মেধা তাদের দেশে পর্যাপ্ত নেই। এতে অবশ্য তার সমর্থকরা রেগে গেছেন।
তারা মনে করছেন, এতে 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হচ্ছে। আপাতত আমেরিকায় থাকা ভারতীয়রা দেশে ফিরছেন না বা ছুটি কাটাতেও আসছেন না। তারা ভয় পাচ্ছেন, একবার বের হলে হয়তো আর ঢুকতে পারবেন না। তবে মিস্টার তুম্বে এর মধ্যে একটি ইতিবাচক দিকও দেখছেন। বিদেশে শিক্ষার্থী কম যাওয়া মানে হলো, তাদের ফি বাবদ ভারত থেকে টাকা বাইরে কম যাচ্ছে।
দ্বিতীয় প্রভাব হলো, ভারতীয়রা এখন নতুন গন্তব্যের দিকে ঝুঁকছে। গত দুই বছরে জার্মানিতে ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬৮ শতাংশ বেড়েছে। কারণ জার্মানি দক্ষ অভিবাসনের নিয়ম শিথিল করেছে এবং ইংরেজিতে পড়ার সুযোগ বাড়িয়েছে। রাশিয়ায় এই সংখ্যা বেড়েছে ৫৯ শতাংশ। ফ্রান্সে বেড়েছে এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। ফ্রান্স এক বছরের ফরাসি ভাষার কোর্স চালু করেছে এবং ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বাড়িয়েছে।
জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির দেবেশ কাপুর বলেন, এর ফলে ভারতের সঙ্গে অন্য দেশগুলোর নতুন সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। নব্বইয়ের দশকে সিলিকন ভ্যালিতে ভারতীয়দের উপস্থিতির কারণেই আইটি কোম্পানিগুলো ভারতের ওপর ভরসা করতে শিখেছিল। নতুন এই যোগাযোগ ভবিষ্যতে বাণিজ্যের নতুন পথ খুলতে পারে।
তৃতীয় প্রভাবটি বেশ ইতিবাচক। পশ্চিমা কোম্পানিগুলো এখন মেধা বা ট্যালেন্ট খুঁজতে আর নিজের দেশে বসে থাকছে না। তারা ভারতে তাদের কাজ সরিয়ে আনছে। ওয়াল স্ট্রিটের ব্যাংকগুলো তাদের 'গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার' বা নিজস্ব আউটসোর্সিং শাখায় কর্মী নিয়োগ বাড়িয়েছে। এগুলো এখন আর সাধারণ কল সেন্টার নয়। এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই গবেষণা, ফার্মাসিউটিক্যাল ল্যাব এবং জটিল গাণিতিক মডেলিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে।
এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এখন শিক্ষার্থীদের কাছে চলে আসছে। অস্ট্রেলিয়ার ডিকিন ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অফ উলংগং ভারতে ক্যাম্পাস খুলেছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ভারত সফরের পর ব্রিস্টল এবং ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ও মুম্বাইতে ক্যাম্পাস খোলার পরিকল্পনা করছে।
মিস্টার তুম্বে মনে করেন, আসল চ্যালেঞ্জ হলো সেরা বিজ্ঞানীদের দেশে ফিরিয়ে আনা। চীন তাদের মেধাবীদের ফিরিয়ে আনতে পেরেছে, যাদের 'সি টার্টল' বা 'সামুদ্রিক কচ্ছপ' বলা হয়। ভারত সরকারও গবেষকদের ফিরিয়ে আনার কিছু পরিকল্পনা নিয়েছে, তবে সেগুলো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। আমেরিকায় স্বাগত না জানানো হলেও ভারতের শীর্ষ বিজ্ঞানীদের সামনে চীন, ইউরোপ, সিঙ্গাপুর বা মধ্যপ্রাচ্যের মতো বিকল্প আছে।
এমনকি আমেরিকা ফি বাড়ানোর পর চীন বিদেশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কিত বিষয়ে মেধাবীদের জন্য বিশেষ ভিসা চালু করেছে। এর বিপরীতে ভারতে বেতন কম, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনীতি বেশি এবং দূষিত শহরগুলোর জীবনযাত্রার মানও নিচু।
দীর্ঘমেয়াদে এই কড়াকড়ি ভারত ও আমেরিকা—উভয়ের সমৃদ্ধির পথ বন্ধ করে দিতে পারে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ভারত থেকে আমেরিকায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের যাওয়াটা মেধা পাচার বা 'ব্রেইন ড্রেন' ছিল না। এটি ছিল 'ব্রেইন সার্কুলেশন' বা মেধার আদান-প্রদান। এইচ-ওয়ানবি লটারির মাধ্যমে মোটা বেতনের সুযোগ আছে জেনেই ভারতীয় শিক্ষার্থীরা কম্পিউটার সায়েন্স শিখত। ভারতের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের কোর্স বাড়াত।
এতে সিলিকন ভ্যালি যেমন মেধা পেয়েছে, তেমনি ভারতের বেঙ্গালুরুও লাভবান হয়েছে। আমেরিকা থেকে যারা দক্ষতা ও টাকা নিয়ে ফিরেছে, তারা নিজেরা ব্যবসা শুরু করেছে বা অন্যদের ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে। আপাতত মেধা আদান-প্রদানের এই চক্রের একটি অংশ অর্থাৎ ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি খাত বেশ ভালোই চলছে।
