'লৌহমানবী' থ্যাচারের পর সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক হ্যান্ডব্যাগ যার হাতে
মার্গারেট থ্যাচার যখন তার বাক্স-আকৃতির লাউনার লন্ডন পার্সটি নিয়ে ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করেছিলেন, তারপর থেকে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক হ্যান্ডব্যাগ—এবং তা নানা দিক থেকেই।
এই 'ব্যাগটি' হলো জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির হাতে থাকা কালো রঙের টোট ব্যাগ। আনুষ্ঠানিকভাবে এর নাম 'গ্রেস ডিলাইট টোট' হলেও, এটি এখন 'সানায়ে টোট' নামেই বেশি পরিচিত। চামড়ার তৈরি এই ব্যাগটি এতটাই বড় যে এতে একটি 'এ৪' সাইজের ফাইল অনায়াসে এঁটে যায়। আয়তাকার এই সাধারণ দেখতে ব্যাগটির ওপরে একটি রুপালি ক্ল্যাসপ রয়েছে এবং এর হাতলগুলো কাঁধে বা কনুইয়ের ভাঁজে বহন করার মতো যথেষ্ট লম্বা। এটি তৈরি করেছে ১৮৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত জাপানের একটি চামড়াজাত পণ্যের কোম্পানি 'হামানো'।
'টেন ম্যাগাজিন জাপান'-এর সম্পাদক সাউরি মাসুদা হামানো ব্র্যান্ডকে লন্ডনের অভিজাতদের প্রিয় চামড়াজাত পণ্যের ব্র্যান্ড অ্যাসপ্রের সাথে তুলনা করে এটিকে 'জাপানের অ্যাসপ্রে' বলে অভিহিত করেছেন। ব্যাগটি মোট নয়টি ভিন্ন রঙে পাওয়া যায় এবং এর দাম ১,৩৬,৪০০ ইয়েন (প্রায় ৮৮০ ডলার)।
অন্য কথায়, ব্যাগটি দেখতে একেবারেই সাধারণ, ব্যতিক্রম শুধু একটিই: এটি জি-৭ ভুক্ত একটি দেশের নেতার হাতে, যে পদে থাকা কোনো ব্যক্তির সাধারণত হ্যান্ডব্যাগ বয়ে বেড়ানোর কথা নয়।
মিসেস তাকাইচির নির্বাচনের আগে, এমন একজন প্রভাবশালী নারী রাজনীতিবিদের কথা ভাবা প্রায় অসম্ভব ছিল যিনি একটি ব্যাগ বহন করেন। ইতালির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ব্যাগ ব্যবহার করেন না। মেক্সিকোর প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবামও করেন না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসও করেননি। এমনকি জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে অ্যাঙ্গেলা মার্কেলও তার মেয়াদকালে ব্যাগ ব্যবহার করতেন না।
একই কথা হিলারি ক্লিনটনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এমনকি লিজ ট্রাসও তার সংক্ষিপ্ত মেয়াদকালে ব্যাগ বহন করেননি (যদিও বাকিংহাম প্যালেসে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সাথে দেখা করার সময় রানির নিজের বিখ্যাত ব্যাগটি তার সাথেই ছিল)।
কিন্তু কেন এমন হয়? ফ্যাশন জগতে বড় আকারের ব্যাগের জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও এর উত্তরটি বেশ সহজ: ক্ষমতায় থাকা পুরুষরা ব্রিফকেস বহন করেন না। তাহলে নারীরা কেন করবেন?
ব্যাগ ছাড়া থাকার অর্থ হলো এটা বোঝানো যে, আপনার ভার বহনের জন্য অন্য লোক আছে। কমলা হ্যারিসের সঙ্গে কাজ করা স্টাইলিস্ট কার্লা ওয়েলচ যেমনটা বলেছেন: 'তাদের সবারই ব্যাগ থাকে। পার্থক্য হলো, সেই ব্যাগটি বহন করে একজন সহকারী।' (আমেরিকার জনপ্রিয় টিভি সিরিজ 'ভিপ'-এ এই বাস্তবতাকে নিয়ে মজা করা হয়েছিল, যেখানে মূল চরিত্রের একজন সহকারীকে তার 'ব্যাগ ম্যান' বা 'বডি ম্যান' হিসেবে দেখানো হতো।)
এই কারণেই বিখ্যাত টিভি সিরিজ 'সাকসেশন'-এর শেষ সিজনে একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে এক নারী চরিত্রকে তার 'হাস্যকর রকমের বড়' হ্যান্ডব্যাগ বহন করার জন্য উপহাস করা হয়েছিল। তার বিশাল বারবেরি ব্যাগটি ধনী ও ক্ষমতাবানদের অলিখিত নিয়ম সম্পর্কে তার অজ্ঞতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল, যেখানে বোঝানো হয় যে ক্ষমতাবানদের নিজের জিনিস নিজের কাঁধে বইতে হয় না। সাধারণত, ব্যক্তি যত গুরুত্বপূর্ণ, তার ব্যাগ তত ছোট হয়। কিন্তু এখন মিসেস তাকাইচি এই হিসাব বদলে দিচ্ছেন।
'ভোগ জাপান'-এর ফ্যাশন ডিরেক্টর এমি কামেওকা বলেন, তাকাইচির ব্যাগটি একজন পেশাদার নারী হিসেবে তার ভাবমূর্তিকে আরও শক্তিশালী করে এবং তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি—'কাজ, কাজ এবং আরও কাজ'—এর কথাই মনে করিয়ে দেয়। এই ব্যাগে ফাইল এবং ট্যাবলেট দুটোই রাখা যায়, যা একই সাথে আভিজাত্য এবং উপযোগিতার বার্তা দেয়। হামানো কোম্পানিও তাদের 'গ্রেস ডিলাইট টোট' ব্যাগটিকে 'কর্মজীবনে নারীদের আকাঙ্ক্ষা পূরণকারী' ব্যাগ হিসেবেই বিক্রি করে।
মিসেস মাসুদা বলেন, ব্যাগটি ঐতিহ্যগতভাবে জাপানিও বটে। হামানো ব্র্যান্ডটি মূলত জাপানের রাজপরিবারের জন্য পণ্য সরবরাহ করার জন্যই পরিচিত ছিল। যদিও তিনি উল্লেখ করেন যে, আগে এই কোম্পানিটি 'খুব রক্ষণশীল, ফ্যাশন সচেতন নন এমন নারীদের' কাছেই জনপ্রিয় ছিল, কিন্তু মিসেস তাকাইচির ব্যবহারের ফলে এটি এখন নতুন প্রজন্মের গ্রাহকদের নজরে এসেছে, যারা তার এই পছন্দকে জাতীয় গর্বের প্রতীক হিসেবে দেখছেন।
শুধু তাই নয়, এই ব্যাগটি মিসেস তাকাইচিকে তার স্বঘোষিত রাজনৈতিক আদর্শ মার্গারেট থ্যাচারের সাথেও যুক্ত করেছে। থ্যাচারের নিজের ব্যাগের প্রতি আসক্তি থেকেই বিশ্ব 'হ্যান্ডব্যাগিং' শব্দটি পেয়েছিল, যার অর্থ হলো অপ্রত্যাশিতভাবে তীব্র ভাষায় তিরস্কার করা। (মিসেস তাকাইচিও নীল জ্যাকেট এবং মুক্তার গয়না পছন্দ করেন, যা থ্যাচারের স্টাইলের অন্যতম স্বাক্ষর ছিল।)
মার্গারেট থ্যাচারের জন্য হ্যান্ডব্যাগ ছিল নিজেকে একজন সাধারণ নারীর সঙ্গে মেলানোর একটি উপায়। ব্রিটিশ 'ভোগ' ম্যাগাজিন তার ব্যাগ সম্পর্কে বলেছিল, এটি এমন একজন 'সংবেদনশীল, সুসংগঠিত ব্যক্তির প্রতিফলন, যা একটি গোছানো মনের পরিচায়ক।'
কিন্তু এটুকুই সব ছিল না।
থ্যাচারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এডউইনা কারি সেই ব্যাগটিকে প্রধানমন্ত্রীর 'অস্ত্র' বলে অভিহিত করেছিলেন। থ্যাচার নিজেই তার ব্যাগটিকে তার সরকারের একমাত্র 'ফাঁস-রোধী' জায়গা বলে উল্লেখ করতেন। ২০১৩ সালে, তার সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী সিন্থিয়া ক্রফোর্ড দ্য গার্ডিয়ানে লিখেছিলেন, 'যেকোনো অত্যন্ত গোপনীয় বা মূল্যবান জিনিস আমরা তার হ্যান্ডব্যাগে রাখতাম, কারণ আমরা জানতাম এটি কখনই তার থেকে আলাদা হবে না।'
ব্যাগটি এতটাই তার মালিকের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল যে, ১৯৮৮ সালে রোনাল্ড রিগানের সাথে থ্যাচারের শেষ রাষ্ট্রীয় সফরের সময়, তৎকালীন সেক্রেটারি অফ স্টেট জর্জ শুলৎজ তাকে তার ব্যাগের একটি রেপ্লিকা উপহার দিয়েছিলেন। ২০১১ সালে, তার ব্যবহৃত একটি অ্যাসপ্রে ব্যাগ চ্যারিটি নিলামে ৩৯,৮০০ ডলারে বিক্রি হয়েছিল। তিনি যখন ক্ষমতা ছাড়েন, ততদিনে তার ব্যাগগুলো তার 'অদম্য কর্তৃত্বের শক্তিশালী প্রতীকে' পরিণত হয়েছিল।
মিসেস তাকাইচির ব্যাগেরও কি একই রকম দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, ক্ষমতা এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্য থাকবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটি ইতিমধ্যেই জাপানে বিক্রির ঝড় তুলেছে এবং দেশব্যাপী 'উন্মাদনা' ও 'ভাইরাল সেনসেশন' নিয়ে অসংখ্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
'ভোগ' ম্যাগাজিনের মিস কামেওকা বলেন, 'পুরুষ রাজনীতিবিদদের চেয়ে মানুষ তার পোশাক-আশাকের দিকে অনেক বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।' আর এই বিশেষ অ্যাকসেসরিজটি এর আকারের কারণে নজর এড়ানো প্রায় অসম্ভব।
হামানো কোম্পানির ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে, কালো রঙের গ্রেস ডিলাইট টোট ব্যাগের জন্য তারা এত বেশি অর্ডার পেয়েছে যে, বর্তমান ব্যাচের উৎপাদন শেষ হয়ে গেছে এবং কোম্পানিটি বর্তমানে 'কারখানার প্রায় ১০ মাসের উৎপাদনের সমান অর্ডার' পেয়েছে।
হামানো বর্তমানে আগামী বছরের আগস্টের শেষে এই ব্যাগ সরবরাহ করার পরিকল্পনা করছে।
