আফগানিস্তানের মতো 'অন্তহীন যুদ্ধ' এড়াতে ট্রাম্পের প্রতি ভেনেজুয়েলার মাদুরোর আহ্বান
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ার প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, আফগানিস্তানের মতো আরেকটি 'অনন্তকাল ধরে চলা যুদ্ধে' যুক্তরাষ্ট্রকে যেন টেনে না নেওয়া হয়। এদিকে ট্রাম্পের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তিনি আমেরিকা মহাদেশকে 'নার্কো-সন্ত্রাসীদের' হাত থেকে মুক্ত করবেন।
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের মিরাফ্লোরেস প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসের বাইরে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাদুরো ট্রাম্পকে যুদ্ধ নয়, শান্তির পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানান। এর আগে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরি 'ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড' অঞ্চলটিতে পৌঁছেছে।
'আর কোনো অনন্তকাল ধরে চলা যুদ্ধ নয়। আর কোনো অবিচারপূর্ণ যুদ্ধ নয়। লিবিয়া নয়, আফগানিস্তান নয়। শান্তির জয় হোক,' বৃহস্পতিবার রাতে ৬২ বছর বয়সী মাদুরো এ ঘোষণা দেন যখন তিনি ভিড় ঠেলে একটি সরকারপন্থী সমাবেশে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন।
ভেনেজুয়েলার এই নেতার বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পরই হেগসেথ আরও চাপ বাড়াতে ঘোষণা দেন একটি নতুন সামরিক অভিযানের—যার নাম তিনি দিয়েছেন 'অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার'।
'পশ্চিম গোলার্ধ হলো আমেরিকার প্রতিবেশ—আর আমরা এটিকে রক্ষা করব,' হেগসেথ টুইট করেন। তিনি বলেন, সাদার্ন কমান্ডের এই মিশনের লক্ষ্য হলো 'আমাদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করা' এবং 'যে মাদক আমাদের মানুষকে হত্যা করছে' তা দমন করা।
এখন হেগসেথ কেন এই ঘোষণা দিলেন, তা স্পষ্ট নয়। কারণ ১০ মাস আগেই যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল ফোর্সেস সাদার্ন কমান্ড জানিয়েছিল যে তারা শীঘ্রই একটি অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে। তারা বলেছিল, এই অভিযানে ক্যারিবীয় অঞ্চলে অবৈধ পাচার শনাক্ত ও নজরদারিতে বিভিন্ন ধরনের রোবোটিক ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।
হেগসেথের সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলো সম্ভবত মাদুরোর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের চাপ সৃষ্টির প্রচারণাকে নতুন করে তুলে ধরার একটি চেষ্টা হতে পারে। এই প্রচারণায় ইতোমধ্যেই ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরে সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌযানে প্রাণঘাতী হামলা চালানো হয়েছে।
সরকারিভাবে, বৃহৎ এই মার্কিন সামরিক মোতায়েন ট্রাম্প প্রশাসনের 'মাদকবিরোধী যুদ্ধ'-এর অংশ এবং এর উদ্দেশ্য হলো ল্যাটিন আমেরিকার মাদক কার্টেলগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে কোকেইন ও ফেন্টানিল প্রবাহ রোধ করা।
কিন্তু ভেনেজুয়েলা কোকেইনের উৎপাদক নয়—এই কাজ প্রায় সম্পূর্ণভাবে করা হয় বলিভিয়া, কলম্বিয়া ও পেরুতে—এবং এটি ফেন্টানিল পাচারের নেটওয়ার্কের অংশও নয়, যা মূলত মেক্সিকোর দিকে কেন্দ্রীভূত।
ফলস্বরূপ, অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন যে ট্রাম্পের এই বৃহৎ সামরিক মোতায়েন—যা ১৯৮৯ সালের পানামা আক্রমণের পর থেকে অঞ্চলে সবচেয়ে বড়—একটি রাজনৈতিক অভিযান, যার উদ্দেশ্য হলো এমন কিছু অর্জন করা যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার প্রথম মেয়াদে করতে ব্যর্থ হয়েছেন―মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করা।
সিবিএস নিউজ এই সপ্তাহে রিপোর্ট করেছে যে সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে ভেনেজুয়েলায় সম্ভাব্য অভিযানের "বিকল্পসমূহ" উপস্থাপন করেছেন, যার মধ্যে আছে স্থলভিত্তিক হামলাও। তবে দুইটি সূত্র জোর দিয়ে বলেছে যে, এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়ভান গিল "উত্তর আমেরিকার সাম্রাজ্য"-কে লক্ষ্য করে দৃঢ় বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, "হামলা করার সাহসও কোরো না। আমরা প্রস্তুত।"
ভেনেজুয়েলায় বিমান হামলার আশঙ্কা বাড়তে থাকায়, রয়টার্স জানিয়েছে যে মাদুরো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো মার্কিন আক্রমণের বিরুদ্ধে "গেরিলা-ধরনের আক্রমণ" পরিকল্পনা করা হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার পরিকল্পনায় রয়েছে ২৮০টিরও বেশি স্থানে ছোট ছোট সামরিক ইউনিট নাশকতা ও অন্যান্য গেরিলা কৌশল অবলম্বন করে বিদেশি যোদ্ধাদের প্রতিহত করা।
দ্বিতীয় কৌশল, যাকে বলা হয়েছে 'অ্যানার্কাইজেশন', তাতে গোয়েন্দাসহ সরকারপন্থি গোষ্ঠীগুলো কারাকাসের রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এবং ভেনেজুয়েলাকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাবে যাতে বিদেশি বাহিনীর জন্য দেশটি শাসন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে—এমনটাই দুইটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে রয়টার্স।
