‘টার্ন দ্য ভলিউম আপ’: নিউইয়র্ক মেয়র নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয়ের পর ট্রাম্পকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ মামদানির
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন ইতিহাস গড়ে ২০২৫ সালের নিউইয়র্ক সিটি নির্বাচনে মেয়র হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন জোহরান মামদানি।
ঐতিহাসিক এই জয়ে বিজয়ী ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি সমালোচনা করে তিনি বলেন, 'যদি কেউ ট্রাম্পের বিশ্বাসঘাতকতায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি জাতিকে বাঁচানোর পথ দেখাতে পারে, তবে তা নিউইয়র্কই—যে শহর ট্রাম্প বেড়ে উঠেছেন। আর কোনো স্বৈরশাসককে পরাজিত করার একমাত্র উপায় হলো সেই ব্যবস্থাই ভেঙে ফেলা যা তাকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করেছে।'
'এভাবে শুধু ট্রাম্প না, পরবর্তী যে কেউই হয়ে উঠবে তাকে কিভাবে রুখতে হয় সেটাও শেখা যায়। ট্রাম্প, আমি জানি আপনি এটি দেখছেন। আপনাকে শুধু চারটি কথা বলার আছে: টার্ন দ্য ভলিউম আপ!' বলেন তিনি।
মামদানি যেমনটা আশা করেছিলেন, ট্রাম্প সত্যিই নজর রাখছিলেন। ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল-এ লিখেন, '…এবং তাই শুরু হলো!'
মামদানিকে 'কমিউনিস্ট' ও 'নাটকবাজ' বলে ঠাট্টা করা ট্রাম্প আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, তিনি মামদানি মেয়র হলে নিউইয়র্ক শহর থেকে ফেডারেল তহবিল আটকে দিতে পারেন। তবুও এটি মামদানিকে থামাতে পারেনি।
মামদানি বলেন, ট্রাম্পের মতো বিলিয়নিয়াররা কর ফাঁকি দিয়ে এবং কর ছাড়ের সুযোগ নিয়ে যে 'দুর্নীতির সংস্কৃতি'র মাধ্যমে লাভবান হয়েছেন, তার প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হবে সেটির মূলোৎপাটন করা।
বিজয়োত্তর ভাষণে নিউইয়র্কবাসীর উদ্দেশে মামদানি বলেন, 'আপনাদের জন্যই আমরা লড়ে যাব, কারণ আপনারাই আমরা'। তিনি আরও বলেন, তার এই নিরঙ্কুশ জয় প্রমাণ করেছে, ট্রাম্পের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীকেও পরাজিত করার পথ দেখাতে পারে নিউইয়র্ক।
ভাষণ শেষ হতেই ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে ওঠে বলিউডের জনপ্রিয় গান 'ধুম মাচালে'। মঞ্চে তখন মামদানির সঙ্গে ছিলেন মামদানির স্ত্রী রামা দুয়াজি ও তার মা, খ্যাতনামা ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ার।
বিজয় ভাষণে মামদানি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলেন, 'অ্যান্ড্রু কুমোর ব্যক্তিজীবনের জন্য শুভকামনা জানাই, তবে আজকের রাতেই তার নাম শেষবারের মতো উচ্চারণ করলাম। কারণ আমরা এখন এমন এক রাজনীতির পাতা উল্টে দিচ্ছি, যা বহুজনকে বঞ্চিত করে কেবল অল্প কয়েকজনের সেবা করেছে।'
মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তার প্রথম ভাষণে মামদানি বলেন, 'আমার প্রশাসন শুরু হলে (১ জানুয়ারি) আমরা বাড়িওয়ালাদের জবাবদিহি করাবো। কারণ আমাদের শহরের 'ডোনাল্ড ট্রাম্প'-রা ভাড়াটে মানুষের শোষণ করতে খুবই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।'
তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দেন, 'আমরা ইউনিয়নসমূহের পাশে দাঁড়াবো এবং শ্রমিকদের অধিকারের সুরক্ষা সম্প্রসারিত করব।'
অভিবাসী শহর হিসেবে নিউইয়র্কের পরিচিতি তুলে ধরে মামদানি বলেন, 'নিউইয়র্ক একটি অভিবাসী-নির্ভর শহর থাকবে, এটি অভিবাসীদের দ্বারা নির্মিত, অভিবাসীদের দ্বারা চালিত, এবং আজ থেকে এটি অভিবাসীর নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। তাই শুনুন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প: আমাদের কারও কাছে পৌঁছাতে চাইলে আপনাকে সবার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।'
'ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া এই জাতিকে এই শহর (নিউইয়র্ক) দেখিয়েছে কীভাবে তাকে হারাতে হয়,' বলেন তিনি।
নিউইয়র্ক সিটি নির্বাচনে বিজয়ের পর জোহরান মামদানি তার আনন্দ উদ্যাপন করেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর ঐতিহাসিক 'ট্রিস্ট উইথ ডেসটিনি' ভাষণ উদ্ধৃত করে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পর ভারতের স্বাধীনতার মুহূর্তে এই ভাষণটি দিয়েছিলেন নেহরু।
মামদানি বলেন, 'ইতিহাসে এমন মুহূর্ত খুব কমই আসে, যখন আমরা পুরোনো থেকে নতুনে পদার্পণ করি, যখন এক যুগের অবসান ঘটে এবং একটি জাতির দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখা আত্মা তার প্রকাশ খুঁজে পায়।'
এই উদ্ধৃতি টেনে তিনি আরও বলেন, 'আজ রাতে নিউইয়র্কও পুরোনো থেকে এক নতুনে পদার্পণ করেছে।'
