জীবন বদলে দেওয়া চোখের ইমপ্লান্ট, দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাচ্ছেন অন্ধ রোগীরা
চোখের পেছনের অংশে একটি জীবন পরিবর্তনকারী ইমপ্লান্ট বসানোর পর বেশ কয়েকজন অন্ধ মানুষ আবার পড়তে পারছেন।
সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক সায়েন্স করপোরেশনের তৈরি 'প্রাইমা' ইমপ্লান্ট নিয়ে ইউরোপের পাঁচটি দেশে ৩৮ জন রোগীর ওপর চালানো গবেষণা নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত হয়েছে।
এতে দেখা যায়, ৩২ জন রোগীর চোখে ইমপ্লান্ট বসানোর পর ২৭ জন আবার কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তি দিয়ে পড়তে সক্ষম হয়েছেন। এক বছর পর তাদের দৃষ্টিশক্তি গড়ে ২৫টি অক্ষর বা পাঁচ লাইনের উন্নতি হয়েছে।
লন্ডনের মুরফিল্ডস আই হাসপাতালে পাঁচজন রোগীর চোখে এই মাইক্রোচিপ প্রতিস্থাপনকারী সার্জন জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক এই ট্রায়ালের ফলাফল 'অবিশ্বাস্য'।
অন্ধ হিসেবে আইনত নিবন্ধিত ৭০ বছর বয়সী শীলা আরভিন বিবিসিকে বলেন, 'আবার পড়তে পারা এবং ক্রসওয়ার্ড করতে পারা স্বর্গীয় অনুভূতি। এটি দারুণ, অসাধারণ। এতে আমি অনেক আনন্দ পাই।'
এই প্রযুক্তি ড্রাই এজ-রিলেটেড ম্যাকুলার ডিজেনারেশনের (এএমডি) একটি উন্নত পর্যায়ের ধরন 'জিওগ্রাফিক অ্যাট্রোফি' (জিএ)-তে আক্রান্ত মানুষের জন্য নতুন আশার দুয়ার খুলে দিয়েছে। যুক্তরাজ্যে প্রায় আড়াই লাখ এবং বিশ্বজুড়ে পাঁচ মিলিয়ন মানুষ এই রোগে আক্রান্ত।
এই রোগে আক্রান্তদের মধ্যে বেশিরভাগই প্রবীণ। আক্রান্তদের চোখের পেছনের রেটিনার একটি ক্ষুদ্র অংশের কোষ ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মারা যায়, ফলে কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা ও বিকৃত হয়ে যায়। এতে রঙ ও সূক্ষ্ম বিস্তারিত দেখা সম্ভব হয় না।
নতুন পদ্ধতিতে মানুষের চুলের পুরুত্বের সমান ২ মিমি আকৃতির একটি ফটোভোলটাইক মাইক্রোচিপ রেটিনার নিচে প্রতিস্থাপন করা হয়। এরপর রোগীরা ক্যামেরাযুক্ত বিশেষ চশমা পরেন, যা ইনফ্রারেড বিমে ভিডিও চিত্র ইমপ্লান্টে পাঠায়। ছবিগুলো একটি ছোট প্রসেসরে গিয়ে আরও স্পষ্ট হয়ে ফিরে আসে এবং ইমপ্লান্ট ও অপটিক নার্ভের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। এভাবে রোগীরা আংশিক দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান।
এই ছবিগুলো বুঝতে রোগীদের মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে।
লন্ডনের মুরফিল্ডস আই হাসপাতালের চক্ষু সার্জন ও যুক্তরাজ্যের এই গবেষণার নেতৃত্বদানকারী ডা. মাহি মোকিত বিবিসিকে বলেন, এটি 'অগ্রণী ও জীবন পরিবর্তনকারী প্রযুক্তি'।
তিনি বলেন, 'এটি প্রথম ইমপ্লান্ট যেটি প্রমাণ করতে পেরেছে যে এটি রোগীদের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগার মতো অর্থবহ দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে পারে—যেমন পড়া ও লেখা। আমি মনে করি এটি একটি বড় অগ্রগতি।'
উইল্টশায়ারের বাসিন্দা শীলার ক্ষেত্রে অগ্রগতি আরও চমকপ্রদ। ইমপ্লান্ট ছাড়া তিনি কিছুই পড়তে পারতেন না। কিন্তু মুরফিল্ডস হাসপাতালে চোখের চার্ট পড়ার সময় তিনি একটিও ভুল করেননি।
শেষ করে তিনি উল্লাস করেন।
'আমি এখন অনেক আনন্দিত এক মানুষ'
রেটিনার কোষ হারানোর ফলে শীলা প্রায় ৩০ বছর আগে তার কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তি হারাতে শুরু করেন।
তিনি বলেন, তার মনে হতো প্রতি চোখে দুটি করে কালো চাকতি রয়েছে।
শীলা এখন একটি সাদা ছড়ির সাহায্যে চলাফেরা করেন। রাস্তায় বিশাল বিশাল বড় সাইনবোর্ডও তিনি পড়তে পারেন না। ড্রাইভিং লাইসেন্স হারাতে বাধ্য হলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন বলে জানান।
তবে তিন বছর আগে ইমপ্লান্ট বসানোর পর থেকে তার উন্নতি নিয়ে তিনি এবং চিকিৎসক দল অত্যন্ত আনন্দিত।
শীলা বলেন, 'আমি এখন আমার চিঠিপত্র ও বই পড়তে পারি। এমনকি ক্রসওয়ার্ড আর সুডোকুও করতে পারি।'
আবার কখনো পড়তে পারবেন বলে ভেবেছিলেন কি না- এই প্রশ্নের জবাবে শীলা বলেন, 'একদম আশা করিনি!'
তিনি বলেন, 'এটি অসাধারণ অনুভূতি। আমি এখন খুব খুশি একজন মানুষ।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রযুক্তি এত দ্রুত এগোচ্ছে! দারুণ ব্যাপার যে আমি এর অংশ হতে পারছি।'
সাধারণত বাইরে যাওয়ার সময় শীলা যন্ত্রটি পরেন না। এটি ব্যবহারে তাকে অনেক মনোযোগ দিতে হয়, পড়ার সময় মাথা একদম স্থির রাখতে হয়। এছাড়াও তিনি যন্ত্রটির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হতে চান না।
তিনি বলেন, প্রতিদিন ঘরের কাজগুলো তাড়াতাড়ি শেষ করে তিনি বসে যান এবং বিশেষ চশমাটি পরেন।
প্রাইমা ইমপ্লান্টটি এখনও লাইসেন্সপ্রাপ্ত নয়, তাই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বাইরে এটি পাওয়া যাচ্ছে না। ভবিষ্যতে এর দাম কত হতে পারে, তাও এখনও স্পষ্ট নয়।
তবে মাহি মোকিত আশা প্রকাশ করেছেন, এটি 'কয়েক বছরের মধ্যেই এনএইচএস-এর মাধ্যমে কিছু রোগীর কাজে আসতে পারে।'
এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে অন্যান্য চোখের রোগেও ব্যবহৃত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ম্যাকুলার সোসাইটির গবেষণা পরিচালক ডা. পিটার ব্লুমফিল্ড এই ফলাফলকে 'উৎসাহব্যঞ্জক' এবং এমন রোগীদের জন্য 'অসাধারণ খবর' বলে উল্লেখ করেছেন, যাদের জন্য বর্তমানে কোনো চিকিৎসা নেই।
তিনি বলেন, 'কৃত্রিম দৃষ্টিশক্তি অনেকের জন্য আশার আলো হতে পারে, বিশেষ করে ড্রাই এএমডি চিকিৎসায় আগের হতাশার পর। আমরা এখন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি প্রাইমা ইমপ্লান্টটি যুক্তরাজ্যে অনুমোদন পায় কি না এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, এটি এনএইচএস-এর মাধ্যমে রোগীদের দেওয়া সম্ভব কিনা।'
তবে এই ট্রায়ালগুলো সেইসব রোগীর ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না, যাদের অপটিক নার্ভ, যেটি রেটিনা থেকে মস্তিষ্কে সিগনাল পাঠায়, কাজ করছে না।
