'দ্য ডেডলি ডোজ': ভারতে কাশির সিরাপের প্রতি যেভাবে আসক্তি তৈরি হলো
আবারও সেই একই ঘটনা। সেপ্টেম্বরের শুরুতে মধ্যপ্রদেশে কয়েকটি শিশুর রহস্যজনক মৃত্যুতে স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ছোটাছুটি শুরু হয়ে যায়। এক থেকে ছয় বছর বয়সী অন্তত ১৯ জন শিশু একটি সাধারণ কাশির সিরাপ খাওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কিডনি বিকল হয়ে মারা যায়। পরে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়, সিরাপে ৪৮.৬% ডাইইথিলিন গ্লাইকোল ছিল—শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত এক মারাত্মক বিষ। এই ভয়াবহতা শুধু মধ্যপ্রদেশেই থেমে থাকেনি, প্রতিবেশী রাজস্থানেও একই ধরনের সিরাপ খেয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়।
ভারতের জন্য এটি এক চেনা ঘটনা। এর আগেও গাম্বিয়া, উজবেকিস্তান এবং জম্মুতে ভারতীয় সিরাপে এই বিষাক্ত রাসায়নিকের কারণে বহু শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবারই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও, দূষিত সিরাপ আবারও বাজারে ফিরে আসে। সমালোচকদের মতে, এর কারণ দেশের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যা অসংখ্য ছোট নির্মাতার তৈরি সস্তা ও অনুমোদনহীন সিরাপের ওপর নজর রাখতে ব্যর্থ হয়।
শিশুমৃত্যুর এই ঘটনার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সতর্কতার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু আসল সমস্যা আরও গভীরে। ভারতে কাশির সিরাপের প্রতি এক ধরনের আসক্তির দেখা মেলে, যার বাজার ২০৩৫ সালের মধ্যে ৭৪৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। দশকের পর দশক ধরে ডাক্তাররা কাশির সিরাপ রোগীদের দিচ্ছেন এবং রোগীরাও খাচ্ছেন, যদিও বেশিরভাগেরই তেমন কোনো কার্যকারিতা নেই, বরং মারাত্মক ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে।
এই মিষ্টি সিরাপগুলো দ্রুত আরামের প্রতিশ্রুতি দিলেও, বেশিরভাগ কাশিই কয়েকদিনের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর রাজারাম ডি খারে-এর মতে, দূষিত শহরগুলোতে শিশুদের বেশিরভাগ কাশির কারণ সংক্রমণ নয়, বরং অ্যালার্জি। এর জন্য সিরাপের চেয়ে ইনহেলার অনেক বেশি কার্যকর। তিনি বলেন, সিরাপ বড়জোর সাময়িক আরাম দেয়, কিন্তু এর সাথে আসক্তি, বিষক্রিয়া এবং ওভারডোজের ঝুঁকি থাকে।
তাহলে এই সিরাপ এত জনপ্রিয় কেন?
এর প্রধান কারণ ভারতের দুর্বল প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, বিশেষ করে ছোট শহর ও গ্রামীণ এলাকায়, যেখানে প্রায় ৭৫% চিকিৎসা দেন কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণহীন হাতুড়ে ডাক্তাররা। সিরাপই তাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। রোগীরাও প্রায়শই অযোগ্য কেমিস্ট বা দোকানদারের পরামর্শের ওপর নির্ভর করেন।
এর সাথে যুক্ত হয় উদ্বিগ্ন বাবা-মায়ের চাপ এবং কিছু চিকিৎসকের জ্ঞানের অভাব। ডক্টর কফিল খান বলেন, "আমি এমডি করা শিশুরোগ বিশেষজ্ঞকেও এমন সিরাপ প্রেসক্রাইব করতে দেখেছি যা ছোট শিশুদের জন্য বিপজ্জনক এবং নিউমোনিয়ার কারণ হতে পারে।"
ভারতের এখন কাশির সিরাপ নিয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতি এবং দেশব্যাপী সচেতনতা প্রয়োজন। সমস্যার গভীরতা বোঝা যায় সাম্প্রতিক শিশুমৃত্যুর সাথে জড়িত ডাক্তারের কথায়, যিনি ১৫ বছর ধরে এই কাশির সিরাপটি রোগীদের দিয়ে আসছেন বলে জানা যায়।
