চার্লি কার্ক হত্যাকাণ্ড: অনলাইনে ‘উদযাপন’ করে চাকরিচ্যুতি, বাড়ছে হয়রানি-ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস
চার্লি কার্কের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মৃত্যুকে 'উদযাপন' করে দেওয়া পোস্টগুলোর বিরুদ্ধে কট্টর ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো অনলাইনে এক জোরালো প্রচারাভিযান শুরু করেছে।
এর জেরে শিক্ষক, সাংবাদিক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীসহ বহু মানুষ চাকরি হারাচ্ছেন, পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এই ঘটনা অনলাইনে বাকস্বাধীনতা ও এর অপব্যবহার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উস্কে দিয়েছে।
বুধবার চার্লি কার্ক নিহত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মৃত্যু নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ কেউ শোক প্রকাশ করলেও, অনেকে তার মৃত্যুকে 'উদযাপন' করে পোস্ট দেন। এসব পোস্টের বিরুদ্ধে ও পোস্টকারীদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করতে রক্ষণশীল কর্মী, রিপাবলিকান রাজনীতিবিদ ও একটি 'ডক্সিং' ওয়েবসাইট মিলে এক অনলাইন অভিযান শুরু করেছে।
কট্টর ডানপন্থী প্রভাবশালী লরা লুমার, একজন মার্কিন সিনেটর এবং 'এক্সপোজ চার্লিস মার্ডারারস' নামের একটি ওয়েবসাইট এই প্রচারাভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছে। লুমার এক্স-এ (সাবেক টুইটার) হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যারা কার্কের মৃত্যু উদযাপন করছেন, তিনি তাদের 'বিখ্যাত' করে তুলবেন, 'প্রস্তুত থাকুন, যদি আপনারা এতটাই অসুস্থ যে চার্লির মৃত্যুকেও উদযাপন করছেন, তবে আপনাদের সমস্ত ভবিষ্যৎ পেশাগত আকাঙ্ক্ষা নষ্ট হতে চলেছে,' লেখেন তিনি।
এই অনলাইন অভিযানের ফলস্বরূপ অনেকে চাকরিও হারাচ্ছেন। 'বিন্দুমাত্র সহানুভূতি নেই' লেখার দায়ে রিপাবলিকান সিনেটর মার্শা ব্ল্যাকবার্ন টেনেসির মিডল টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটির এক কর্মচারীর চাকরিচ্যুতির দাবি জানান, পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত করে।
দক্ষিণ ক্যারোলিনার রিপাবলিকান প্রতিনিধি ন্যান্সি মেস-এর দাবি অনুযায়ী, একজন সরকারি স্কুলের শিক্ষককেও বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া, 'ফ্রেডি'স ফ্রোজেন কাস্টার্ড অ্যান্ড স্টেকবার্গার্স' এবং 'ক্যারোলিনা প্যান্থার্সের' মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও কার্ক সংক্রান্ত সামাজিক মাধ্যমের পোস্টের জন্য কর্মচারীদের চাকরিচ্যুত করেছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা হলো, ডিসি কমিকস তাদের সদ্য প্রকাশিত 'রেড হুড' কমিক বই সিরিজ বাতিল করেছে, কারণ এর লেখক গ্রেচেন ফেলকার-মার্টিন কার্কের মৃত্যু নিয়ে 'আশা করি বুলেট ঠিক আছে' (Hope the bullet's OK) বলে মন্তব্য করেছিলেন। ডিসি কমিকস জানিয়েছে, সহিংসতা উস্কে দেয় এমন মন্তব্য তাদের নীতিমালার পরিপন্থী।
এমএসএনবিসি-এর সিনিয়র রাজনৈতিক বিশ্লেষক ম্যাথিউ ডাউডকেও বরখাস্ত করা হয়েছে, কারণ তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে কার্কের বাগাড়ম্বর হয়তো তার হত্যাকাণ্ডে অবদান রেখেছে।
এই অভিযানের শিকার হচ্ছেন অনেক সাধারণ মানুষও। কানাডীয় স্বাধীন সাংবাদিক রেচেল গিলমোর জানিয়েছেন, তিনি কার্কের 'কট্টর ডানপন্থী ভক্তদের' কাছ থেকে প্রতিশোধের ভয়ে 'আতঙ্কিত'। তার পোস্টটিকে বেনামী ওয়েবসাইটে প্রথম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তার জীবনের গত ৪৮ ঘণ্টাকে 'জীবন্ত নরক' বলে উল্লেখ করে গিলমোর বলেন, তিনি একধরণের 'হুমকির সুনামির' মুখোমুখি হয়েছেন।
ফ্লোরিডার সাবেক করোনাভাইরাস ডেটা বিজ্ঞানী রেবেকা জোনস, যিনি মৃত্যু হুমকির জন্য দুবার পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তার পোস্টও এই সাইটে ব্যক্তিগত তথ্যসহ পুনরায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি এই সাইটটিকে 'হিট লিস্ট' বলে অভিহিত করেছেন।
নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লরা এডেলসন এই পুরো বিষয়টিকে 'সুপরিকল্পিত হয়রানি অভিযান' হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যার উদ্দেশ্যই নির্বাচিত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে হয়রানি করা।
যুক্তরাষ্ট্রের চলমান তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা মানুষের আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া বাড়িয়ে তুলছে। ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনের অধ্যাপক হুইটনি ফিলিপস বলেন, 'বামপন্থীদের' ওপর ঢালাও দোষ চাপানো এবং কার্কের মৃত্যুকে ঘিরে সমালোচনাকারীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা এক 'মিথ্যা সংস্কৃতি যুদ্ধের' জন্ম দিচ্ছে, যা রক্ষণশীলদের কাছে এসব বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীকে 'আমেরিকার এক আধ্যাত্মিক শত্রু' হিসেবে তুলে ধরছে।
