নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন এমন উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় আসছে নতুন ওষুধ
চিকিৎসকদের হাতে শিগগিরই উচ্চ রক্তচাপ চিকিৎসার নতুন উপায় আসতে পারে। বিশেষ করে যাদের উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে ও ওষুধ ভালোভাবে কাজ করেননা, তাদের জন্যও এ পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে।
অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোম্পানির তৈরি ওষুধ বাক্সড্রোস্ট্যাট এখনও পরীক্ষাধীন রয়েছে। সম্প্রতি এক গবেষণায় এটি অনিয়ন্ত্রিত বা অপ্রতিরোধী উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে। গবেষকদের মতে, যদি নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ এ ওষুধ অনুমোদন দেয়, তবে কয়েক দশকের মধ্যে এটি উচ্চ রক্তচাপ চিকিৎসায় প্রথম নতুন পদ্ধতিগুলোর একটি হবে।
শনিবার স্পেনের মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলজি কংগ্রেস ২০২৫-এ গবেষকরা বাক্সড্রোস্ট্যাটের পরীক্ষার ফলাফল উপস্থাপন করেন। একইসঙ্গে ফলাফল প্রকাশিত হয় নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ।
গবেষণার জন্য ৮০০ প্রাপ্তবয়স্ক রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যাদের অন্তত চার সপ্তাহ ধরে দুই বা তার বেশি ওষুধ সেবনের পরও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এই গবেষণায় অংশ নিতে হলে রোগীদের সিস্টোলিক রক্তচাপ ১৪০ থেকে ১৭০-এর মধ্যে হতে হয়েছে।
রক্তচাপ পরিমাপ করা হয় পারদের মিলিমিটারে, যাকে সংক্ষেপে মি.মি. এইচজি বলা হয়। রক্তচাপের দুটি সংখ্যা থাকে। একটি হলো সিস্টোলিক চাপ (উপরের সংখ্যা)। যখন হৃদপিন্ড রক্তকে ধমনীতে পাম্প করে তখন রক্তের প্রবাহের বলকে বলা হয় সিস্টোলিক চাপ। আরেকটি সংখ্যা হলো ডায়াস্টোলিক চাপ (নিচের সংখ্যা)। হৃদাপিন্ড যখন স্পন্দনের মধ্যে বিশ্রাম নেয় তখন তৈরি হওয়া চাপকে ডায়াস্টোলিক চাপ বলে।
স্বাভাবিক রক্তচাপ ১২০/৮০ মি.মি. এর নিচে থাকে এবং উচ্চ রক্তচাপ প্রাথমিক অবস্থায় ১২০–১২৯/৮০ মি.মি ধরা হয়। নতুন মার্কিন নির্দেশিকা অনুযায়ী, কারও রক্তচাপ ১৩০/৮০ মি.মি. এইজি বা তার বেশি হয় তাহলে প্রথমে থাকে জীবনধারার পরিবর্তন—যেমন স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, লবণ কমানো এবং বেশি ব্যায়াম করতে বলা হয়। তারপরও যদি তা না কমে তাহলে ডাক্তাররা রোগীর জন্য ওষুধ গ্রহণের পরামর্শ দেন।
নতুন গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের তিনটি গ্রুপে ভাগ করা হয়। এক গ্রুপ ১ মিগ্রাম বাক্সড্রোস্ট্যাট পেয়েছিল। অন্য গ্রুপ ২ মিগ্রাম বাক্সড্রোস্ট্যাট পেয়েছিল। তৃতীয় গ্রুপে প্লেসবো (কার্যকরী নয় এমন একটি ওষুধ) দেওয়া হয়েছিল। সব অংশগ্রহণকারী তাদের পূর্বে নেওয়া ওষুধের পাশাপাশি পরীক্ষার ওষুধও নিয়েছেন।
১২ সপ্তাহ পরে বাক্সড্রোস্ট্যাট নেওয়া ১০জনের মধ্যে প্রায় ৪ জনের রক্তচাপ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছে। অপরদিকে প্লেসবো গ্রুপের মধ্যে এটি হয়েছে ১০জনের মধ্যে ২ জনেরও কম।
বিশেষভাবে, যারা প্রতিদিন ১ বা ২ মিলিগ্রাম বাক্সড্রোস্ট্যাট নিয়েছেন, তাদের সিস্টোলিক রক্তচাপ (উপরের সংখ্যা) প্লেসবো গ্রুপের তুলনায় প্রায় ৯-১০ মিমি এইচজি বেশি কমেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই হ্রাস হৃদরোগ ও রক্তনালীর ঝুঁকি কমাতে যথেষ্ট।
উচ্চ রক্তচাপের সময় রক্তের প্রবাহ ধমনী প্রাচীরের উপর চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে হৃদপিন্ড কম কার্যকর হয়ে কাজ করে। কারণ এসময় ধমনী ও হৃদযপিন্ড দুটোকেই বেশি পরিশ্রম করতে হয় এবং রক্তকে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ও কোষে পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে যায়।
চিকিৎসা না করলে, উচ্চ রক্তচাপ ধমনীকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং হৃদরোগ, স্ট্রোক, কোরোনারি ডিজিজ, ভাস্কুলার ডিমেনশিয়া এবং স্মৃতিশক্তিজনিত নানা সমস্যার ঝুঁকি বাড়াবে।
বিশ্বে হৃদরোগই প্রধান মৃত্যুর কারণ। রক্তচাপ কমানো হলো এমন একটি প্রভাবশালী উপায় যা মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় অর্ধেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। প্রায় ১০ জনের মধ্যে ১ জনের হাইপারটেনশন রয়েছে। তারা তিন বা তার চেয়ে বেশি ওষুধ সেবন করেও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছেন না।
উচ্চ রক্তচাপ থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে, চিকিৎসকরা প্রায়ই বিভিন্ন ওষুধ পরীক্ষা করেন কোনটি সবচেয়ে কার্যকর হবে তা বোঝার জন্য।
বাক্সড্রোস্ট্যাটকে চিকিৎসার তালিকায় যুক্ত করা রোগীদের জন্য বড় সাহায্য হতে পারে, বলেন ড. স্টেসি ই. রোজেন। তিনি আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং নিউ ইয়র্ক সিটির নর্থওয়েল হেলথের ক্যাটজ ইনস্টিটিউট ফর উইমেন্স হেলথ-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও নির্বাহী পরিচালকও।
ড. রোজেন বলেন, বাক্সড্রোস্ট্যাট সাধারণত ব্যবহৃত উচ্চ রক্তচাপের ওষুধগুলোর সঙ্গে ভালোভাবে কাজ করতে পারে।
বর্তমানে বাজারে থাকা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধগুলো বিভিন্নভাবে কাজ করে। ভ্যাসোডাইলেটর: ধমনী ও শিরাকে শিথিল ও প্রশস্ত করে রক্তের প্রবাহ সহজ করে এবং রক্ত চলাচল বাড়ায়। ডায়ুরেটিক: প্রস্রাব বাড়িয়ে শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি ও লবণ বের করে দেয়। সেন্ট্রালি অ্যাক্টিং আলফা অ্যাগোনিস্ট: নার্ভাস সিস্টেমকে স্ট্রেসের প্রতিক্রিয়া দেওয়া থেকে রোধ করে। এসি ই ইনহিবিটর: অ্যানজিওটেনসিন II হরমোন উৎপাদন আটকায়, যা রক্তনালী সংকুচিত করে। এআরবি বা অ্যানজিওটেনসিন II রিসেপ্টর ব্লকার: অ্যালডোস্টেরোন উৎপাদন কমায়, যা লবণ ও পানি ধরে রাখে। ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার: হৃদপিন্ড ও ধমনীর কোষে ক্যালসিয়াম প্রবেশ কমিয়ে ওষুধের কাজের চাপ কমায়।
বিভিন্ন উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে, যেমন মাথা ঘোরা, হার্টের গতি দ্রুত বা ধীর হওয়া, ক্লান্তি, পেটের অসুবিধা এবং পা ফুলে যাওয়া।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাক্সড্রোস্ট্যাটের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাধারণত হালকা। সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা ছিল পটাশিয়াম ও সোডিয়ামের স্তরে অস্বাভাবিকতা, তবে এটি দুর্লভ।
বাক্সড্রোস্ট্যাট উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করে। এটি অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি দ্বারা তৈরি অ্যালডোস্টেরোন হরমোনকে ব্লক করে। অ্যালডোস্টেরোন কিডনিকে লবণ নিয়ন্ত্রণ ও শরীরের পানির ভারসাম্য রাখার কাজে সাহায্য করে। কিছু মানুষের শরীরে অতিরিক্ত অ্যালডোস্টেরোন উৎপন্ন হয়, যা অতিরিক্ত পানি ও লবণ ধরে রাখে এবং রক্তচাপ বাড়ায়।
গবেষণার মূল গবেষক ও প্রকাশিত প্রবন্ধের সহলেখক ড. জেনিফার ব্রাউন বলেন, "আমরা অনেকদিন ধরেই জানি যে অধিকাংশ মানুষ অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ করে, যা রক্তচাপ বাড়ায়। কিন্তু আমরা আরও বেশি করে বুঝতে পারছি যে অ্যালডোস্টেরোন সরাসরি রক্তনালী, হৃদপিন্ড ও কিডনিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।"
ড. ব্রাউন বলেন, তিনি ব্রিগহ্যাম অ্যান্ড উইমেন্সে কার্ডিওলজি রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ হৃদরোগে আক্রান্ত। তাই তিনি তাদের রক্তচাপ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে তৎপর হতে বলেন, যাতে হৃদরোগ আটকানো যায়।
তিনি বলেন, কিছু রোগী অন্যান্য উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সহ্য করতে পারেন না, আবার কারও ক্ষেত্রে সাধারণ ওষুধ কার্যকর হয় না। তাদের জন্য বাক্সড্রোস্ট্যাট বিদ্যমান চিকিৎসার সাথে একটি কার্যকর সংযোজন হতে পারে।
ড. ব্রাউন বলেন, "আমরা বহু বছর ধরে চিকিৎসক হিসেবে একই ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করে আসছি। এমন একটি বিকল্প পেলে আমি উচ্ছ্বসিত হতাম।"
প্রকাশিত গবেষণার সাথে সংযুক্ত ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবার্গের কার্ডিওভাসকুলার গবেষক ড. তোমাস গুজিক এবং ইউনিভার্সিটি অফ ম্যানচেস্টারের কার্ডিওভাসকুলার বিশেষজ্ঞ ড. ম্যাসিয়েজ তোমাশেভস্কি লিখেছেন, পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত যে রোগীরা নতুন ওষুধের প্রতি সবচেয়ে ভালো প্রতিক্রিয়া দেখাবে তাদের শনাক্ত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংগ্রহ করা।
তারা আরও লিখেছেন, যদি ওষুধটি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হয়, তবে এটি কঠিন নিয়ন্ত্রণযোগ্য উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় এটি মূল ওষুধ হয়ে উঠতে পারে।
অ্যাস্ট্রাজেনেকা বলেছে, তারা ২০২৫-এর শেষের আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে তথ্য জমা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
