গাজা সম্পূর্ণ দখলে নিতে চান নেতানিয়াহু; 'সিদ্ধান্ত ইসরায়েলের', বললেন ট্রাম্প
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার নিরাপত্তা মন্ত্রিসভায় গাজা উপত্যকা সম্পূর্ণভাবে পুনর্দখলের প্রস্তাব দিতে পারেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি গণমাধ্যম। খবর বিবিসির।
স্থানীয় সাংবাদিকদের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, 'সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েগেছে। আমরা সম্পূর্ণ গাজা উপত্যকার দখল ও হামাসকে পরাজিত করতে যাচ্ছি।'
এদিকে নেতানিয়াহুর এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি ইসরায়েলের গাজা দখলের সম্ভাব্য পরিকল্পনা বাধা দেবেন না।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মঙ্গলবার নেতানিয়াহুরে প্রস্তাবের বিষয়ে ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের কথা ট্রাম্পকে বলা হয়, তিনি উত্তরে জানান, তিনি গাজায় মানুষের খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাকে প্রধান গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, "বাকি বিষয়গুলো সম্পর্কে আমি সত্যিই কিছু বলতে পারি না। সেটি প্রায় পুরোপুরি ইসরায়েলের ওপর নির্ভর করবে।"
প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধানসহ শীর্ষ সামরিক নেতারা এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করছেন—এমন খবরে ওই কর্মকর্তা বলেন, 'প্রতিরক্ষা প্রধান যদি এটা মেনে নিতে না পারেন, তাহলে তার পদত্যাগ করা উচিত।'
তবে জিম্মিদের পরিবারগুলো আশঙ্কা করছে, এই ধরনের পরিকল্পনা তাদের প্রিয়জনদের জীবনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে জিম্মি ৫০ জনের মধ্যে এখনও ২০ জন জীবিত রয়েছেন।
এদিকে জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ইসরায়েলি নাগরিক যুদ্ধবিরতির পক্ষে, যাতে করে জিম্মিদের ফেরত আনার চুক্তি হতে পারে।
ইসরায়েলের অনেক ঘনিষ্ঠ মিত্রও গাজা পুনর্দখলের এমন উদ্যোগের নিন্দা করবে বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ তারা যুদ্ধের অবসান এবং চলমান মানবিক সংকট লাঘবের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণে জোর দিচ্ছে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও শত শত অবসরপ্রাপ্ত নিরাপত্তা কর্মকর্তা—যাদের মধ্যে সাবেক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরাও আছেন—সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে একটি যৌথ চিঠি পাঠিয়েছেন। এতে তারা নেতানিয়াহুর ওপর যুদ্ধ বন্ধে চাপ সৃষ্টি করার আহ্বান জানিয়েছেন।
চিঠির এক স্বাক্ষরকারী, ইসরায়েলের সাবেক অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা প্রধান আমি আয়ালোন বিবিসিকে বলেন, আরও সামরিক অভিযান চালানো অর্থহীন হবে।
একজন সাবেক ইসরায়েলি গোয়েন্দা প্রধান বলেন, 'সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে হামাস পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু আদর্শিক দিক থেকে এটি ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যে, আমাদের চারপাশের আরব বিশ্বে এবং ইসলামী দুনিয়ায় আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে।'
তাই তিনি বলেন, 'তাই হামাসের আদর্শকে পরাজিত করার একমাত্র উপায় হলো—একটি ভালো ভবিষ্যতের প্রস্তাব দেওয়া।'
এই মন্তব্য এসেছে এমন এক সময়, যখন হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তির জন্য চলা পরোক্ষ আলোচনা ভেস্তে গেছে এবং ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো তিনটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে দুই ইসরায়েলি জিম্মিকে দেখা গেছে, তারা দুর্বল ও অপুষ্টিতে ভুগছে।
ভিডিওতে যাদের দেখা গেছে, তারা হলেন রোম ব্লাসলাভস্কি ও এভিয়াতার ডেভিড—তাদের দু'জনকেই ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর নোভা মিউজিক ফেস্টিভ্যাল থেকে অপহরণ করা হয়েছিল।
ভিডিওতে ডেভিডকে একটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের মধ্যে নিজেই নিজের কবর খুঁড়তে দেখা গেছে, যা ইসরায়েলিদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও আতঙ্ক তৈরি করেছে।
সাম্প্রতিক যে বিবৃতিগুলো ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে, তা হামাসের ওপর চাপ সৃষ্টি করে একটি নতুন চুক্তিতে বাধ্য করার কৌশল হতে পারে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলছে, তারা ইতোমধ্যে গাজার ৭৫ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। তবে প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, তারা সম্পূর্ণ গাজা দখলে নিতে চায়—যেখানে দুই মিলিয়নেরও বেশি ফিলিস্তিনি এখন কেন্দ্রীভূত হয়ে আছেন।
এই পরিকল্পনার ফলে সাধারণ নাগরিকদের অবস্থা কী হবে, কিংবা জাতিসংঘ ও অন্যান্য ত্রাণ সংস্থার কার্যক্রম কিভাবে প্রভাবিত হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
গাজার ২১ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, অনেকেই একাধিকবার এবং তারা অত্যন্ত সংকটপূর্ণ ও গাদাগাদি অবস্থায় বসবাস করছেন।
মানবিক সহায়তাদানকারী সংস্থাগুলো এবং জাতিসংঘের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েল জরুরি ত্রাণ পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে, যার ফলে অনেক মানুষ অনাহারে ভুগছেন।
গাজার পরিস্থিতি কিছুটা সহজ করতে ইসরায়েল ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা এখন স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে কিছু পণ্য প্রবেশের অনুমতি দেবে। অনুমোদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে শিশু খাদ্য, ফলমূল, শাকসবজি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সামগ্রী।
এর আগে এই ধরনের ব্যক্তিগত আমদানি বন্ধ ছিল, কারণ অভিযোগ ছিল যে হামাস এসব আমদানির মাধ্যমে লাভবান হচ্ছিল।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এর আগে গাজার কিছু এলাকায়—বিশেষ করে মধ্যাঞ্চলে—পূর্ব থেকে অভিযান চালানো থেকে বিরত ছিল, কারণ ধারণা ছিল যে সেখানে জীবিত জিম্মিরা থাকতে পারে। গত বছর, গ্রাউন্ড ফোর্স অভিযান চালানোর পর ছয়জন ইসরায়েলি জিম্মিকে তাদের অপহরণকারীরা হত্যা করে।
এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া না এলেও, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ—যারা পশ্চিম তীরের কিছু অংশ শাসন করে—ইসরায়েলের এই প্রস্তাবের নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নতুন করে সামরিক দখল ঠেকাতে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।
ফিলিস্তিনিরা বলছেন, ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে গাজা সম্পূর্ণ দখল ও সংযুক্ত করার পক্ষে মত দিচ্ছেন, এবং তাদের লক্ষ্য হলো সেখানে নতুন ইহুদি বসতি গড়ে তোলা।
তারা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, ২০০৫ সালে ইসরায়েল গাজা উপত্যকা থেকে তার সব বসতি গুঁড়িয়ে দেয় এবং সেনা প্রত্যাহার করে নেয়।
তবে এর পর থেকে ইসরায়েল ও মিশর একসঙ্গে গাজার প্রবেশ ও চলাচলের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
এই নতুন দখল পরিকল্পনা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক মহল আবারও দুই-রাষ্ট্র ভিত্তিক সমাধানকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিচ্ছে—যা দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট সমাধানের আন্তর্জাতিক ফর্মুলা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
এই পরিকল্পনায় পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকাকে নিয়ে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছে, যার রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম।
গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্য ও কানাডা, ফ্রান্সের সঙ্গে একত্রে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য শর্তসাপেক্ষ পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছে। এটি ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শীঘ্রই শীর্ষ মন্ত্রী ও সামরিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন, যাতে গাজা নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা যায়। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর রেডিও জানায়, এই বৈঠকে কেন্দ্রীয় শরণার্থী ক্যাম্পগুলো ঘিরে ফেলা এবং বিমান হামলা ও স্থল অভিযান চালানোর প্রাথমিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে।
নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, এই সপ্তাহেই তিনি পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকবেন।
তবে ইসরায়েলি মিডিয়া বিশ্লেষকেরা এই পরিকল্পনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। ইয়েদিওথ আহরনোথ পত্রিকায় কলাম লেখক নাহুম বারনিয়া লিখেছেন, 'নেতানিয়াহু আগে কখনো এমন ঝুঁকি নেননি।'
তিনি উল্লেখ করেন, নেতানিয়াহু বারবার তার সব যুদ্ধলক্ষ্য পূরণের অঙ্গীকার করছেন,
'কিন্তু ২২ মাস ধরে রক্তাক্ত সংঘাত চলার পর এমন প্রতিশ্রুতি আর বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। মনে হচ্ছে নেতানিয়াহুর একমাত্র উদ্দেশ্য হলো এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা।'
ইসরায়েল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলার প্রতিক্রিয়ায় গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে। সেই হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে গাজায় অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়।
তারপর থেকে, হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে কমপক্ষে ৬১ হাজার ২০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
