রোবট ঘোড়া আনল কাওয়াসাকি, চড়া যাবে ঠিক বাইকের মতো!
এটা হতেই হতো—একদিন মানুষ নিজেরাই বানাবে ঘোড়া। না হয় অন্তত এমন এক মেশিন, যেটা ঘোড়ার মতোই দৌড়াবে, আবার বাইকের মতো চড়াও যাবে। এবার সেই চেষ্টাকে বাস্তবে রূপ দিল মোটরসাইকেল জায়ান্ট কাওয়াসাকি। তারা উন্মোচন করেছে 'করলিও'—একটা চার পায়ের রোবট, যার মাঝে আছে ঘোড়ার পা আর বাইকের মতো গতিময়তা।
প্রশ্ন উঠতেই পারে—আপনি কি কিনবেন এমন এক রোবট, যা দেখতে ঘোড়ার মতো কিন্তু একেবারে যন্ত্রচালিত? কাওয়াসাকি কিন্তু মনে করছে, ভবিষ্যতে এরই কদর বাড়বে। আর তাই দশকের শেষ নাগাদ শোরুমে আসতে পারে এই চমকপ্রদ বাহন।
ঘটনার শুরু গবেষণাগারে। কাওয়াসাকির গবেষণা ও উন্নয়ন টিমে কেউ একজন হঠাৎ বলে বসেন, "একটি বাহনে যদি পা লাগিয়ে দিই?" ব্যাস, এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। চেনা সীমানার বাইরে গিয়ে তারা বানিয়েছেন করলিও—একটি এমন যান, যা ২০৫০ সালের চলাচলের কল্পনা একেবারে আজকের দিনে এনে ফেলেছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষায়, এটি এমন এক ভবিষ্যৎ বাহন, যেখানে মানুষ, প্রযুক্তি আর প্রকৃতি এক ছন্দে চলবে।
চার পায়ের চালকবাহী রোবট করলিও
জাপানের ওসাকায় এক্সপো ২০২৫-এ প্রথম উন্মোচিত হয়েছে কাওয়াসাকির এই নতুন চমক 'করলিও'। এটি একেবারে ভিন্নধরনের যান—চার পায়ের একটি চালকবাহী রোবট, যা চলে অফ-রোডে, চালিত হয় হাইড্রোজেন জ্বালানিতে।
রোবটটির বাস্তব সংস্করণ প্রদর্শিত হলেও, মূল উত্তেজনা তৈরি করেছে কাওয়াসাকির তৈরি একটি কম্পিউটার-জেনারেটেড ভিডিও। সেই ভিডিওতে করলিওকে দেখা গেছে রীতিমতো দুর্দান্তভাবে ছুটে চলতে। ঘন জঙ্গল পেরিয়ে দৌড়, খোলা মাঠে খেলাধুলা, ছোট গিরিখাতের ওপর লাফ, বরফে ঢাকা পাহাড়ি পথ পেরোনো—সব মিলিয়ে যেন এক ঝলক 'লর্ড অফ দি রিংস'-এর দৃশ্যপট!
অনেকেই বলছেন, এটি যেন বস্টন ডায়নামিক্সের বিখ্যাত কুকুর রোবট স্পট-এর ভবিষ্যত সংস্করণ, আর লুক স্কাইওয়াকার-এর স্পিডার বাইকের মতো মজার রাইড মিলিয়ে এক নতুন রোবটিক প্রাণী।
এই ভিডিও ইতোমধ্যেই অনলাইনে ১১ লাখেরও বেশি বার দেখা হয়েছে, আর করলিও হয়ে উঠেছে ভবিষ্যতের চলাচলের কল্পনা নিয়ে তৈরি সবচেয়ে আকর্ষণীয় নতুন যান।
চালানোর দিক থেকে করলিও দেখতে যেমন অভিনব, চালাতে গিয়েও ঠিক তেমনই আলাদা। কাওয়াসাকি জানিয়েছে, এটি মোটরসাইকেল বা অল-টেরেইন ভেহিকেলের মতোই সাড়া দেয় চালকের ইশারায়। তবে চাকার বদলে এতে রয়েছে চারটি স্বাধীনভাবে নড়াচড়া করা পা, যেগুলোর সুইং আর্ম যেকোনো অসমান জমিনে ধাক্কা বা কাঁপুনি সহজেই সামলে নিতে পারে।
প্রতিটি পায়ে লাগানো আছে রাবারের তৈরি বিশেষ খুর, যেগুলো পিচ্ছিল না এবং বাঁদিক-ডানদিকে ভাগ করা—যাতে ঘাস, নুড়ি বা পাথুরে জমিনেও ভালোভাবে টিকতে পারে। এই চার পা চালকের শরীরকে সোজা ও সামনের দিকে রাখে, এমনকি সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময়ও ভারসাম্য ঠিক রাখে।
করলিওতে কিছু দারুণ ডিজাইন ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন—স্বাধীনভাবে চলার মতো পা, হাইড্রোজেন ইঞ্জিন, আর চালকের শরীরের ভরের পরিবর্তনের সঙ্গে মিল রেখে রোবটকে চালানোর সেন্সর। স্টিরআপ (পায়ের রেস্ট) ও হ্যান্ডেলে বসানো এই সেন্সরগুলো গতি ও দিক ঠিক করে।
পিছনের পা সামনের পা থেকে আলাদা হয়ে ওপর-নিচে নড়তে পারে, ফলে হাঁটা বা দৌড়ের সময় ধাক্কা সহজে শোষণ করতে পারে।
এর শক্তি জোগায় একটি ১৫০ সিসি হাইড্রোজেন ইঞ্জিন, যা ইলেকট্রিসিটি তৈরি করে পায়ে বসানো ড্রাইভ ইউনিটগুলো চালায়। পেছনে লাগানো হাইড্রোজেন ক্যানিস্টার থেকে জ্বালানি সরবরাহ হয়, যার ফলে পরিবেশবান্ধব, নীরব ও স্মুথ অপারেশন নিশ্চিত হয়।
আর চালকের জন্য রয়েছে জিপিএস স্ক্রিন—যা পাহাড়ি পথ বা ঢালু এলাকা চিনে রাস্তা নির্দেশ করে, সঙ্গে শরীরের ভারসাম্য আর জ্বালানি কতটুকু আছে তাও জানায়।
কাওয়াসাকি বলেছে, "চালানোর আনন্দ বজায় রেখেই যন্ত্রটি চালকের নড়াচড়া নজরে রাখে, যাতে মানুষ আর যন্ত্রের মধ্যে বোঝাপড়া ঠিক থাকে।"
অনুবাদ: নাফিসা ইসলাম মেঘা
