ট্রাম্পের সৌদি সফর: আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে বড় অন্তরায় গাজা যুদ্ধ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী মঙ্গলবার সৌদি আরব সফর করবেন। রিয়াদে পৌঁছালে তাঁকে স্বাগত জানানো হবে বিলাসবহুল আয়োজনে, সৌদি রাজপরিবারের বিলাসবহুল প্রাসাদে। এ সফরে তাঁর বড় প্রত্যাশা হচ্ছে সৌদি আরব থেকে ১ লাখ কোটি ডলারের বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। তবে দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্পের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ, যা অধরাই থাকতে পারে গাজা যুদ্ধের কারণে।
সূত্রমতে, মার্কিন কর্মকর্তারা চুপিসারে ইসরায়েলের ওপর গাজায় তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ প্রয়োগ করছেন। গাজা যুদ্ধ বন্ধ হওয়া সৌদি আরবের একটি প্রধান শর্ত, যার ওপর নির্ভর করছে তেল আবিবের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের আলোচনা ফের শুরু হওয়ার বিষয়টি।
তবু আশাবাদের কথাই বলেছেন, ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি জানান, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সম্প্রসারণে শিগগিরই অগ্রগতি প্রত্যাশা করছেন তারা। তাঁর ভাষায়, "আমরা শিগগিরই বেশ কিছু ঘোষণা আশা করছি, যেগুলো আগামী বছরে বাস্তব অগ্রগতি আনতে পারে।" তিনি ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য সফরে সঙ্গী হবেন বলেও জানা গেছে।
কিন্তু, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা যুদ্ধ স্থায়ীভাবে থামানো বা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে নন। এর ফলে রিয়াদের সঙ্গে স্বাভাবিকীকরণ আলোচনায় অগ্রগতি অসম্ভব বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সৌদি আরব এখনো ইসরায়েলকে বৈধ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দুই অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তির মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক স্বাভাবিকের পক্ষে থাকা ব্যক্তিরা মনে করেন, এটি অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি আনবে এবং ইরানের প্রভাব প্রতিরোধে সহায়ক হবে।
তবে ইসরায়েলের গাজা আগ্রাসনের পর— সৌদি আরবে বিষয়টি হয়ে উঠেছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যেটি ছিল দ্বিপাক্ষিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, এবার তা অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা আলোচনার পরিধি থেকে কার্যত বাদ পড়েছে বলে বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে ছয়টি নির্ভরযোগ্য সূত্র।
এদের মধ্যে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের (এমবিএস) ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, গাজা যুদ্ধ শেষ হওয়া এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের একটি বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা পাওয়ার আগ পর্যন্ত স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে তিনি (এমবিএস) আর কোনো উদ্যোগে যাবেন না।
এদিকে, ট্রাম্পের সফরের মূল মনোযোগ এখন অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং আঞ্চলিক অন্যান্য ইস্যুতে। সফরের আগে সৌদি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনায় এই কৌশল নির্ধারণ হয়েছে। জানা গেছে, ট্রাম্প এই সফরে ১ লাখ কোটি ডলারের সৌদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে চান।
সৌদি আরব, বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ, জানে কিভাবে উচ্চপর্যায়ের অতিথিদের মন জয় করতে হয়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সৌদি নেতৃত্ব চায় এই সফরে গাজা ইস্যুতে ট্রাম্পের কাছ থেকে কিছু ছাড় আদায় করতে।
ওয়াশিংটনের আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের গবেষক রবার্ট মগিয়েলনিকি বলেন, "ট্রাম্প প্রশাসন চায় সফরটি যেন বড় কিছু মনে হয়। অনেক চুক্তি, সহযোগিতার ঘোষণা থাকবে— যেগুলো আমেরিকার জন্য ইতিবাচক বলে তুলে ধরা যাবে।"
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, "(সৌদি সরকারের জন্য) ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা লাল গালিচা পেতে অভ্যর্থনা জানানোর চেয়ে অনেক বেশি কঠিন কাজ।"
গাজা যুদ্ধ শুরুর আগে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পথে ছিল। চুক্তির অংশ হিসেবে সৌদি আরব ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে এমন পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলের ব্যাপক আগ্রাসনে পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
সূত্র জানায়, গাজায় প্রায় ৫২ হাজার মানুষের প্রাণহানী এবং ১৯ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার ফলে আলোচনায় বড়সড় বিরতি পড়ে। মোহাম্মদ বিন সালমান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগও তোলেন।
ট্রাম্প এ সফরে ১৮ মাস ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধে একটি মার্কিন শান্তি পরিকল্পনা উন্মোচন করতে পারেন বলে জানায় উপসাগরীয় দেশগুলোর দুই সূত্র। এতে গাজায় একটি অন্তর্বর্তী সরকার ও নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের কথা বলা হতে পারে।
ইতিমধ্যে ইসরায়েলের কৌশলগত বিষয়ক মন্ত্রী রন ডারমারের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক হয়েছে, যেখানে গাজা যুদ্ধ এবং ইরান ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে বলে জানায় মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস।
অবশ্য এবার ট্রাম্প তাঁর সফরে ইসরায়েল যাওয়ার কোনো ঘোষণা দেননি। দুই কূটনীতিক জানিয়েছেন, ট্রাম্প তাঁর বিতর্কিত "গাজা রিভিয়েরা" পরিকল্পনার ব্যাপারে সম্প্রতি নীরব রয়েছেন। সেই পরিকল্পনায় গাজাবাসীদের পুরোপুরি পুনর্বাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রস্তাব ছিল, যা আরব বিশ্বের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল।
সফরের আগেই ওয়াশিংটন সৌদি আরবের জন্য ইতিবাচক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের ওপর মার্কিন বোমাবর্ষণ বন্ধে যে চুক্তি হয়েছে, তা সৌদি অস্ত্রবিরতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এছাড়া, বেসামরিক পারমাণবিক আলোচনা থেকে স্বাভাবিকীকরণ প্রশ্ন আলাদা করে দেখা হচ্ছে।
বাইডেন প্রশাসনের শেষ দিকে যেভাবে সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা চুক্তি পুনরুজ্জীবিত হয়, ট্রাম্প প্রশাসন এখন তা সামনে এগিয়ে নিচ্ছে। তবে পুরো চুক্তির শর্ত নির্ধারণে সময় লাগবে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
চীনা প্রভাব ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল
ট্রাম্পের এ সফর তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর এবং দ্বিতীয় বিদেশ সফর (পোপের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশগ্রহণের পর)। সফরে তিনি কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও যাবেন।
কূটনীতিকদের মতে, এই সফরের জমকালো আয়োজনের আড়ালে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলগত প্রচেষ্টা— মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রভাব মোকাবেলা করে অর্থনৈতিক মিত্রতা নতুন করে সাজানো।
ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদেও সৌদি সফর দিয়ে বিদেশযাত্রা শুরু করেছিলেন এবং তখনই ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের সৌদি বিনিয়োগ লাভের ঘোষণা দেন। সেই সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে সৌদি নেতৃত্বের আস্থাও রয়েছে তাঁর ওপর।
এবারের সফরে সৌদি আরব ও তাদের উপসাগরীয় মিত্ররা ট্রাম্পের কাছে আবেদন জানাতে পারেন, যাতে তিনি বিদেশি বিনিয়োগে মার্কিন বিধিনিষেধ শিথিল করেন। বিশেষ করে "গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো" খাতে যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলো তুলে নিতে তাঁরা আহ্বান জানাবেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব রোধ করা ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম লক্ষ্য হলেও সৌদি আরবে তা সহজ হবে না। কারণ 'সৌদি ভিশন-২০৩০' বাস্তবায়নে চীন এখন অবিচ্ছেদ্য অংশ— জ্বালানি, অবকাঠামো থেকে নবায়নযোগ্য শক্তি পর্যন্ত প্রতিটি খাতে তাদের দৃঢ় উপস্থিতি রয়েছে।
