সংরক্ষিত দ্বীপে প্রবেশ, বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করায় মার্কিন পর্যটক গ্রেপ্তার

নির্জন দ্বীপের আদিবাসীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালীরা 'নতুন ও ক্রমবর্ধমান হুমকি' হয়ে উঠছে বলে সতর্ক করেছে একটি দাতব্য সংস্থা। সম্প্রতি এক মার্কিন পর্যটকের গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি সামনে আসে। তিনি একটি সংরক্ষিত দ্বীপে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন। খবর বিবিসি'র।
যুক্তরাষ্ট্রের ২৪ বছর বয়সী মিখাইলো ভিক্টোরোভিচ পলিয়াকভ সম্প্রতি এমন অভিযোগের মুখে পড়েছেন। তিনি আন্দামান সাগরের নর্থ সেন্টিনেল দ্বীপে নেমে বিচ্ছিন্ন সেন্টিনেলিজ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তিনি ভিডিও ধারণ করেন এবং সৈকতে একটি কোকের ক্যান ও একটি নারকেল রেখে আসেন।
আদিবাসী জনগণের অধিকার রক্ষায় কাজ করা সংস্থা সার্ভাইবাল ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, পলিয়াকভের কর্মকাণ্ড কেবল তার নিজের জীবনকেই নয়, সেন্টিনেলিজ জনগণের জীবনকেও বিপদের মুখে ফেলেছে। সংস্থাটি ঘটনাটিকে 'গভীরভাবে উদ্বেগজনক' বলে আখ্যায়িত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত এবং 'পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে'।
আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের পুলিশ প্রধান এইচজিএস ঢালিওয়াল বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, পলিয়াকভকে স্থানীয় আদালতে হাজির করা হয়েছে এবং তাকে 'আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য' তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের বরাতে জানা গেছে, পলিয়াকভ প্রায় এক ঘণ্টা ধরে দ্বীপের উপকূলে বাঁশি বাজিয়ে সেন্টিনেলিজদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। এরপর তিনি প্রায় পাঁচ মিনিটের জন্য দ্বীপে নামেন, কিছু নমুনা সংগ্রহ করেন এবং ভিডিও ধারণ করেন। পুলিশপ্রধান জানান, 'তার গোপ্রো ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তিনি সংরক্ষিত নর্থ সেন্টিনেল দ্বীপে প্রবেশ করেছিলেন।'
উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপের বাসিন্দাদের সুরক্ষার স্বার্থে এই দ্বীপের পাঁচ কিলোমিটার সীমার ভেতরে প্রবেশ আইনত নিষিদ্ধ।
পুলিশ জানিয়েছে, পলিয়াকভ এর আগেও দুইবার এই অঞ্চলটি ভ্রমণ করেছেন, এবং গত বছর অক্টোবরে তিনি একটি ফোলানো কায়াক ব্যবহার করে দ্বীপের দিকে রওনা হন। তবে হোটেলের কর্মীরা তাকে বাধা দেন।
ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারের পর পলিয়াকভ পুলিশকে জানিয়েছেন, তিনি 'রোমাঞ্চপ্রিয়' একজন মানুষ।
সার্ভাইবাল ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, বহু বছর ধরে সেন্টিনেলিজ জনগোষ্ঠী স্পষ্টভাবে জানিয়েছে তারা বহিরাগতদের কাছাকাছি যেতে চায় না। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, এইভাবে আগন্তুকদের দ্বীপে প্রবেশ তাদের জন্য বড় ধরনের হুমকি, কারণ তাদের বাইরের কোনো রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা নেই।
সংস্থাটির মুখপাত্র জোনাথন ম্যাজোয়ার বিবিসিকে বলেন, তারা আশঙ্কা করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যোগাযোগহীন আদিবাসীদের জন্য হুমকির তালিকায় নতুন মাত্রা যোগ করছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে পলিয়াকভকে একটি ইউটিউব অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে তার আফগানিস্তান সফরের ভিডিও রয়েছে।
ম্যাজোয়ার বলেন, 'এই ধরনের আদিবাসীদের জন্য আগে থেকেই কিছু হুমকি ছিল—যেমন আমাজনে বন উজাড় ও খননের কাজ, যেখানে অনেক যোগাযোগহীন জনগণ থাকে। এখন এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন এক ঝুঁকি—কিছু প্রভাবশালী মানুষ (ইনফ্লুয়েন্সার), যারা শুধু অনুসারী বাড়ানোর জন্য এই ধরনের কাজ করছে।'
তিনি আরও বলেন, 'সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের মোহ তৈরি হয়েছে, যা ক্রমেই বাড়ছে।'
সেন্টিনেলিজ জনগোষ্ঠীকে 'বিশ্বের সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন আদিবাসী জনগণ' হিসেবে বর্ণনা করেছে সার্ভাইবাল ইন্টারন্যাশনাল। তারা যেই দ্বীপে বসবাস করছে সেটির আয়তন প্রায় ম্যানহাটনের সমান।
ম্যাজোয়ার বিবিসিকে জানান, এই জনগণের সদস্য সংখ্যা আনুমানিক ২০০ জন। তবে প্রকৃত সংখ্যা জানা 'অসম্ভব'।
তিনি বলেন, এই জনগণ সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না, তবে তারা শিকার ও সংগ্রহ করে জীবিকা চালায়, ছোট ছোট বসতিতে বসবাস করে এবং 'অত্যন্ত সুস্থ'।
ম্যাজোয়ার আরও বলেন, এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়—সেন্টিনেলিজদের মতো জনগণের জন্য সরকারের সুরক্ষা ব্যবস্থা কতটা জরুরি।
জাতিসংঘের আদিবাসী ও উপজাতীয় জনগণের সনদ অনুযায়ী, আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় সরকারগুলোর কিছু দায়িত্ব রয়েছে। ভারতের সরকারের একটি উদ্যোগ রয়েছে, যা আদিবাসী কল্যাণে কাজ করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি জমি থেকে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সুরক্ষা না দেওয়ার অভিযোগে সমালোচনার মুখে পড়েছে।
এটি প্রথমবার নয়, যখন কোনো বহিরাগত সেন্টিনেলিজ জনগণের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে জন অ্যালেন চাও নামের আরেক মার্কিন নাগরিক ওই দ্বীপে গিয়ে সেন্টিনেলিজদের হাতে নিহত হন।
স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, ২৭ বছর বয়সী চাও একজন খ্রিস্টান মিশনারি ছিলেন। তিনি দ্বীপে নামার পর তীর-ধনুকের আঘাতে নিহত হন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তিনি কিছু জেলেকে ঘুষ দিয়ে দ্বীপে নিয়ে যেতে রাজি করিয়েছিলেন।