যেভাবে হুমকির মুখে থাকা কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী চিনার গাছ সংরক্ষণের লড়াই চলছে

সম্প্রতি ভারত-শাসিত কাশ্মীরে শতাব্দীপ্রাচীন চিনার গাছ কাটার অভিযোগকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ছবি ও প্রমাণ দেখিয়ে দাবি করছেন যে গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি ছিল মাত্র নিয়মিত ছাঁটাই। এই বিতর্ক আবারও চিনার গাছের সংকট ও সংরক্ষণের প্রচেষ্টার ওপর আলোকপাত করেছে। খবর বিবিসি'র।
চিনার গাছ কাশ্মীর উপত্যকার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। শরৎকালে এর পাতা উজ্জ্বল লাল, কমলা ও গাঢ় বাদামি রঙ ধারণ করে, যা পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
মধ্য এশিয়ার দেশীয় প্রজাতির এই চিনার গাছ মুঘল সম্রাটরা কয়েক শতাব্দী আগে কাশ্মীরে নিয়ে আসেন। ধীরে ধীরে এটি কাশ্মীরি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
তবে দ্রুত নগরায়ন, অবৈধভাবে গাছ কাটা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চিনার গাছ আজ বিলুপ্তির পথে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন সংরক্ষণমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
জম্মু ও কাশ্মীর প্রশাসন চিনার গাছগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জিওট্যাগিং প্রকল্প চালু করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি গাছে কিউআর কোড প্লেট সংযুক্ত করা হচ্ছে, যেখানে গাছের অবস্থান, বয়স ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে।

প্রকল্প পরিচালক বিজ্ঞানী সৈয়দ তারিক বলেন, 'আমরা চিনার গাছকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করছি।' তিনি জানান, কিউআর কোড ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকরা সহজেই গাছ সম্পর্কে তথ্য জানতে পারবেন এবং এটি অবৈধভাবে গাছ কাটার বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
এখন পর্যন্ত প্রায় ২৯ হাজার চিনার গাছ জিওট্যাগের আওতায় আনা হয়েছে এবং প্রায় সাত হাজার গাছের ম্যাপিং এখনও বাকি রয়েছে।
তবে চিনার গাছের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী কাশ্মীরে ৪০ হাজার চিনার গাছ রয়েছে। তবে সৈয়দ তারিক মনে করেন, এই সংখ্যা নিশ্চিত নয় এবং গাছের প্রকৃত সংখ্যা কমে গেছে।
এটি উদ্বেগজনক, কারণ চিনার গাছ পরিণত হতে কমপক্ষে ৫০ বছর সময় নেয়। পরিবেশবিদদের মতে, কাশ্মীরে নতুন চিনার গাছ লাগানোর জন্য জায়গার অভাব দেখা দিচ্ছে। এছাড়া, চিনার গাছ ঠান্ডা জলবায়ুতে ভালোভাবে বেড়ে ওঠে, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাশ্মীরে গরমের মাত্রা বেড়েছে এবং শীতকালে তুষারপাত কমে গেছে।
তবে ইতিবাচক দিক হলো, চিনার গাছ শত শত বছর ধরে বেঁচে থাকতে পারে। উপত্যকার প্রাচীনতম চিনার গাছটির বয়স প্রায় ৭০০ বছর বলে মনে করা হয়। এখানকার বেশিরভাগ চিনার গাছ কয়েক শতাব্দী পুরনো এবং এদের বিশাল কাণ্ড ও প্রশস্ত ডালপালা রয়েছে।
মোগল আমলে (প্রায় ১৫০০ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত) চিনার গাছ ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। বর্তমানে কাশ্মীরে যে চিনার গাছগুলো টিকে আছে, তার বেশিরভাগই তখনকার সময়ের।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল শাসন করা মোগল সম্রাটরা শীতল আবহাওয়া ও মনোরম প্রকৃতির কারণে কাশ্মীরকে গ্রীষ্মকালীন অবকাশকেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁরা সেখানে 'শাহী উদ্যান' নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে চিনার গাছ সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য বিশেষভাবে রোপণ করা হতো। এসব বাগানের বেশ কয়েকটি এখনো সংরক্ষিত রয়েছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৬ শতকে সম্রাট আকবর বিখ্যাত ডাল লেকের কাছে একটি শাহী বাগানে প্রায় ১১০০ চিনার গাছ রোপণ করেন। তবে রাস্তা সম্প্রসারণ প্রকল্প ও কীটজনিত রোগের কারণে এদের মধ্যে প্রায় ৪০০ গাছ ধ্বংস হয়ে গেছে।
পরবর্তীতে, সম্রাট জাহাঙ্গীর ডাল লেকের একটি ক্ষুদ্র দ্বীপে চারটি চিনার গাছ রোপণ করেন। এই দ্বীপটি 'চার চিনার' নামে পরিচিত এবং বর্তমানে একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুটি গাছ বার্ধক্য ও রোগের কারণে মারা যায়। ২০২২ সালে সরকার সেখানে দুটি পরিপক্ক গাছ প্রতিস্থাপন করে।
১৯৬৯ সালের 'জম্মু ও কাশ্মীর নির্দিষ্ট গাছ সংরক্ষণ আইন'-এর অধীনে চিনার গাছকে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, গাছ কাটতে তো বটেই, এমনকি ছাঁটাই করতেও সরকারি অনুমতি প্রয়োজন। ২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্যের মর্যাদা বাতিল করা হলেও এই আইন এখনো বহাল রয়েছে।
তবে পরিবেশবিদ রাজা মুজাফফর ভাট অভিযোগ করেন যে প্রশাসন অনেক সময় আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে চিনার গাছ কাটার অনুমতি দিয়ে দেয়। তিনি বলেন, 'ছাঁটাইয়ের নামে পুরো গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে।' সম্প্রতি অনন্তনাগ জেলায় এমন একটি ঘটনার অভিযোগ উঠলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
তিনি আরও বলেন, 'একদিকে সরকার গাছের জিওট্যাগিং করছে, অন্যদিকে গাছ কেটে ফেলছে।' নগরায়নের জন্য প্রশাসন গাছ অপসারণ করছে, পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও অবৈধভাবে গাছ কাটছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

চিনার গাছের কাঠ অত্যন্ত শক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী। এটি খোদাই কাজ, আসবাবপত্র ও শিল্পকর্ম তৈরির জন্য ব্যবহৃত হয়। স্থানীয়রা এটিকে জ্বালানি কাঠ ও ভেষজ ওষুধ তৈরিতেও কাজে লাগান।
তবে সরকার পরিচালিত জিওট্যাগিং প্রকল্প মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়িয়েছে বলে মনে করেন ভাট। তিনি বলেন, 'কাশ্মীরিরা তাদের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে চিনার গাছের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। তাই এখন তারা এর ক্ষতি বা কাটার বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে।'
গত সপ্তাহে, অনন্তনাগে কাটা পড়া গাছের ছবি অনেকে এক্স (সাবেক টুইটার)-এ পোস্ট করেছেন। বিরোধী নেতারা সরকারের কাছে তদন্তের দাবি জানিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাজা মুজাফফর ভাট বলেন, 'সরকারকে শুধু আইন দিয়েই নয়, বাস্তবেও চিনার গাছ রক্ষা করতে হবে। কারণ চিনার গাছ ছাড়া কাশ্মীর আর আগের মতো থাকবে না।'