নেতাশূন্য হিজবুল্লাহ স্থলযুদ্ধের জন্য এখন নতুন কমান্ড তৈরি করেছে

ইসরায়েলের হামলায় শীর্ষ নেতারা নিহত হওয়ার পর দক্ষিণ লেবাননে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে হিজবুল্লাহ। নতুন সামরিক কমান্ড এখন হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও স্থলযুদ্ধ পরিচালনা করছে বলে দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে।
ইসরায়েলের তিন সপ্তাহের ভয়াবহ হামলায় হিজবুল্লাহ অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে—বিশেষ করে সংগঠনটির প্রধান সৈয়দ হাসান নাসরুল্লাহ নিহত হওয়ার পর। এখন সংগঠনটি লেবাননে প্রবেশ করা ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে কীভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, সেদিকেই নজর মিত্র ও শত্রুদের।
চারটি সূত্র জানিয়েছে, ইসরায়েলের একের পর এক বিমান হামলার পরও ইরান-সমর্থিত এ দলের কাছে এখনও প্রচুর অস্ত্র মজুত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হচ্ছে নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র। অস্ত্রটি তারা এখনও ব্যবহার করেনি।
২৭ সেপ্টেম্বর নাসরুল্লাহ নিহত হওয়ার পর প্রথম কয়েকদিন হিজবুল্লাহর কমান্ড ব্যাহত হয়েছিল। এর ৭২ ঘণ্টা পর হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা 'অপারেশন রুম' স্থাপন করে বলে সংগঠনটির একজন ফিল্ড কমান্ডার ও দলটির ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন।
বৈরুতে ইসরায়েলের বোমা হামলায় নাসরুল্লাহ ও অন্যান্য হিজবুল্লাহ নেতাদের পাশাপাশি একজন ইরানি কমান্ডার নিহত হন।
নাম না প্রকাশের শর্তে আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, ইসরায়েলের উপর্যুপরি হামলার পরও হিজবুল্লাহর নতুন কমান্ড সেন্টারটি কার্যকর রয়েছে। এর অর্থ, দক্ষিণাঞ্চলের যোদ্ধারা কেন্দ্রীয়ভাবে দেওয়া আদেশ অনুযায়ী ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে ও লড়াই অব্যাহত রাখতে পারছেন।
এদিকে হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, দলটি এখন দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের (প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তোলার) কৌশল নিয়েছে।
ইসরায়েলি বিশ্লেষক আব্রাহাম লেভিন বলেন, হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি সেনাদের জন্য 'ভালমতোই প্রস্তুত এবং অপেক্ষায় আছে' এবং দলটি সহজ টার্গেট নয়—এমনটাই ধরে নেওয়া উচিত।
হিজবুল্লাহর একজন ফিল্ড কমান্ডার বলেছেন, নতুন সামরিক কমান্ড সরাসরি মাঠপর্যায়ের যোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
তিনি বলেন, নতুন কমান্ড পরিপূর্ণ গোপনীয়তার মধ্যে কাজ করছে। নাসরুল্লাহর সম্ভাব্য উত্তরসূরিও নিহত হওয়ার পর এখনও এখনও নতুন নেতা বাছাই করেনি হিজবুল্লাহ।
হিজবুল্লাহর কার্যক্রম সম্পর্কে জানে, এমন আরেকটি সূত্র বলেছে, ইসরায়েলের হামলার পরও দলটির 'অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ' ডেডিকেটেড, ফিক্সড-লাইন ফোন নেটওয়ার্ক টিকে আছে।
চলতি সপ্তাহে 'অপারেশনস রুম অভ ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স'-এর পক্ষ থেকে স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যোদ্ধারা আক্রমণ প্রতিরোধ করছেন। এছাড়া ইসরায়েলি বাহিনীর কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারিও চালাচ্ছেন।
এ প্রতিবেদন প্রকাশের আগে মন্তব্যের জন্য রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও হিজবুল্লাহর মিডিয়া অফিস সাড়া দেয়নি। তবে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর হিজবুল্লাহর মিডিয়া অফিস একটি লিখিত বিবৃতিতে বলেছে, রয়টার্সের সংবাদে হিজবুল্লাহর ফিল্ড কমান্ডারের বরাতে যেসব অংশ লেখা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং 'হিজবুল্লাহর কোনো সূত্র নেই'।
লেবাননের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) আগের প্রকাশিত বিবৃতি দেখে নিতে পরামর্শ দিয়েছে।
সুড়ঙ্গ যুদ্ধ
ইসরায়েল ১ অক্টোবর ঘোষণা দেয়, তাদের স্থলবাহিনী দক্ষিণ লেবাননে প্রবেশ করেছে। মঙ্গলবার সেনাবাহিনী জানায়, লেবাননের মাটিতে চারটি ডিভিশন মোতায়েন করা হয়েছে।
স্থল হামলায় কতজন সৈন্য আছে, তা জানায়নি ইসরায়েল। তবে একটি ইসরায়েলি ডিভিশনে সাধারণত ১ হাজারের বেশি যোদ্ধা থাকে।
ইসরায়েল জানিয়েছে, তাদের সেনাদের সঙ্গে হিজবুল্লাহ ইউনিটের প্রায় মুখোমুখি লড়াই চলছে। দক্ষিণ লেবাননে অভিযান শুরুর পর থেকে ১২ জন ইসরায়েলি সৈন্য নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েল।
দক্ষিণ লেবানে একটি বিস্তৃত সুরঙ্গ নেটওয়ার্ক রয়েছে হিজবুল্লাহর। ২০০৬ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে হিজবুল্লাহর যুদ্ধের পর সুড়ঙ্গগুলো আরও বাড়ানো হয় বলে ইসরায়েলি একটি থিঙ্কট্যাঙ্কের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েলের ধারণা, হিজবুল্লাহর সুড়ঙ্গগুলো কয়েকশো কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।
হিজবুল্লাহর ওই ফিল্ড কমান্ডার বলেন, সুড়ঙ্গগুলো 'এই যুদ্ধের ভিত্তি'। তিনি আরও বলেন, হিজবুল্লাহ বছরের পর বছর ধরে এসব সুড়ঙ্গ তৈরি করেছে। 'এখন সময় এসেছে' এগুলো কাজে লাগানোর।
গভীর সুড়ঙ্গ দখলের কয়েকটি ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। ৫ অক্টোবর প্রকাশিত এক ভিডিওতে একটি ভূগর্ভস্থ কক্ষ দেখা যায়। ওই কক্ষে ফিক্সড-লাইন টেলিফোন রয়েছে। রয়টার্স অবশ্য ওই ফুটেজের তারিখ বা অবস্থান যাচাই করতে পারেনি।
হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, ইসরায়েল যেসব সুরঙ্গের খোঁজ পেয়েছে, সেগুলো মূলত সংগঠনটির রাদওয়ান স্পেশাল ফোর্স ইউনিটের জন্য তৈরি হয়েছিল—যাত তারা ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চল গ্যালিলিতে প্রবেশ করতে পারে। ইসরায়েল সুড়ঙ্গগুলোর সম্পূর্ণ বিস্তৃতি সম্পর্কে জানে না বলে জানিয়েছে ওই সূত্র।
দুর্বল হলেও ধ্বংস হয়নি
কিংস কলেজ লন্ডনের স্কুল অভ সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, হিজবুল্লাহর সক্ষমতা কমেছে। তবে তারা এখনও ইসরায়েলে তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে সক্ষম। এছাড়া শেষ অস্ত্র হিসেবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রেখেছে।
হিজবুল্লাহ বলেছে, গত কয়েকদিনে তারা হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছে।
ইউএস সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির তথ্যমতে, সর্বশেষ সংঘাতের আগে হিজবুল্লাহর কাছে ১ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট ছিল।
দুটি সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য কিছু অস্ত্র মজুত রাখতে হিজবুল্লাহ তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া বৈরুত বিমানবন্দর, সড়ক ও সেতুর মতো অবকাঠামোগুলোকে ইসরায়েলের হামলা থেকে রক্ষা করাও এসব অস্ত্র মজুত রাখার কারণ।
তৃতীয় আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের আবিবের মতো শহরগুলোতে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র দিয়ে হামলা করেনি। কারণ সেটি করলে ইসরায়েল আরও কঠোর হামলার অজুহাত পেয়ে যেত।
ইসরায়েল হিজবুল্লাহর ব্যাপক ক্ষতি করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সেপ্টেম্বরে কয়েক হাজার হিজবুল্লাহর সদস্যদের ব্যবহার করা যোগাযোগ যন্ত্রে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। যদিও ইসরায়েল এই হামলার দায় স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটিই করেনি।
২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ইসরায়েল বিমান হামলার মাত্রা ব্যাপক বাড়িয়েছে। হিজবুল্লাহর হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে বলে দাবি করেছে আইডিএফ।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলেছেন, হিজবুল্লাহ প্রতিদিন গড়ে ১০০-২০০ ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট নিক্ষেপ করছে। তারা আশা করেছিলেন হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হবে।
হিজবুল্লাহর ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে একেকজন একেক রকম ধারণা দিচ্ছেন। একজন পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, হিজবুল্লাহর প্রায় ২৫ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কমেছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, তারা কয়েকশো হিজবুল্লাহ যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। নিহতদের মধ্যে রাদওয়ান স্পেশাল ফোর্সের বেশিরভাগ সিনিয়র কমান্ডার রয়েছেন।
গেরিলা কৌশল
হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা স্থল যুদ্ধে ইসরায়েলের মোকাবিলা করার জন্য গেরিলা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন।
হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, গত সপ্তাহে এক গ্রামে অগ্রসর হওয়ার সময় ইসরায়েলি সৈন্যদের আক্রমণ করেন লুকিয়ে থাকা যোদ্ধারা।
ওই হামলায় হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা মাইন ও রাশিয়ায় তৈরি কর্নেট অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। ২০০৬ সালেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে এসব অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীও জানিয়েছে, ২ অক্টোবর এক বন্দুকযুদ্ধে তাদের কমান্ডো ইউনিটের পাঁচজন সেনা নিহত ও পাঁচজন সেনা গুরুতর আহত হয়েছেন।
একই দিনে পৃথক দুটি ঘটনায় আরও দুইজন সৈন্য নিহত হয়েছেন বলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়।
লেবানন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
দক্ষিণ লেবানন হিজবুল্লাহর জন্য বিশেষ প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে।
আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, 'ইসরায়েলের সাথে স্থলযুদ্ধ হিজবুল্লাহর জন্য নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এর জন্যই তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আর তাদের বেশিরভাগ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোও এ উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছে।'