‘বিকল্প মালদ্বীপ’ লাক্ষাদ্বীপ কি ভারতের বিশাল পর্যটনের চাহিদা পূরণ করতে পারবে?
এই মাসের শুরুতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ লাক্ষাদ্বীপ সফর একটি অপ্রত্যাশিত দ্বন্দ্বের সূত্রপাত করেছিল যা প্রতিবেশী মালদ্বীপের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। এটি এই ছোট দ্বীপপুঞ্জের প্রতি পর্যটকদের আগ্রহ বৃদ্ধি করেছে যা পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং অনেক স্থানীয়কে উদ্বিগ্ন করেছে।
লাক্ষাদ্বীপ মালদ্বীপের উত্তরে আরব সাগরে অবস্থিত একটি ফেডারেল শাসিত অঞ্চল। তার সফরে নরেন্দ্র মোদি এই দ্বীপপুঞ্জকে ঘিরে বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প শুরু করার ঘোষণা দেন। তিনি সৈকতে স্নরকেল (পানিতে নিশ্বাস নেওয়ার ছোট যন্ত্র) পরে সাঁতরে বেড়ানো এবং সমুদ্রতীরে বসে সময় কাটানোর কিছু ছবি শেয়ার করেছিলেন।
মালদ্বীপের তিনজন মন্ত্রী তার সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন যা ভারতীয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। পাশাপাশি লাক্ষাদ্বীপকে বিকল্প পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে অনেককেই প্ররোচিত করছে।
এর ফলে গুগলে লাক্ষাদ্বীপের জন্য অনুসন্ধান গত সপ্তাহে সর্বোচ্চতে পৌঁছেছে। ভারতের বৃহত্তম অনলাইন ভ্রমণ সংস্থা মেকমাইট্রিপ বলেছে, মোদির সফরের পরে তাদের প্ল্যাটফর্মে লাক্ষাদ্বীপের জন্য অনুসন্ধানে ৩৪০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই অঞ্চলের সরকারি প্রশাসক প্রফুল প্যাটেলের বিতর্কিত নীতির জন্য কয়েক বছর আগে লাক্ষাদ্বীপের স্থানীয়দের মধ্যে "অভূতপূর্ব প্রতিবাদ" শুরু হয়েছিল। তিনি এই দ্বীপপুঞ্জের প্রতি মানুষের নতুন আগ্রহকে স্বাগত জানিয়েছেন।
তিনি সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে বলেন, "লাক্ষাদ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটন ক্ষেত্রের উন্নয়নের জন্য অপার সম্ভাবনা বহন করে। প্রশাসন আবাসনের আরো সুযোগ যুক্ত করা সহ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে।"
২০২৬ সালের মধ্যে এই দ্বীপপুঞ্জের দুটি দ্বীপে (দ্বীপপুঞ্জটিতে মোট ৩৬টি দ্বীপ রয়েছে) বিশ্বমানের দুটি রিসোর্ট খোলার ঘোষণা দিয়েছে টাটা গ্রুপ। একমাত্র এয়ারলাইন যা বর্তমানে লাক্ষাদ্বীপে উড়ে যায় অতিরিক্ত ফ্লাইট চালু করেছে এবং শীঘ্রই একটি নতুন পরিষেবা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, লাক্ষাদ্বীপ যেটি মনোরম রূপালী সৈকত, স্ফটিক নীল জল এবং প্রবাল দ্বীপের জন্য বিখ্যাত সেটিকে মালদ্বীপের মতো একটি বিশাল পর্যটন গন্তব্য বানানো যাবেনা কারণ এই দ্বীপপুঞ্জ আকারে ছোট এবং এর বাস্তুসংস্থান অনেক সংবেদনশীল। অনেক স্থানীয়রাও বলেছেন, তারা দায়িত্বশীল পর্যটন চান যার দেখভাল তারাই করবেন। তারা এমন কোনো বড় আকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা চায় না যেটি তাদের জীবনযাত্রাকে পাল্টে দেবে।
একটি সরকারি ওয়েবসাইট যেটি লাক্ষাদ্বীপে পর্যটনকে 'উদীয়মান শিল্প' বলেছে সেটির ভাষ্যমতে, "এই স্থানের মানুষের প্রধান পেশা হল মাছ ধরা, নারকেল চাষ এবং নারকেলের ছোবড়া থেকে দড়ি পাকানো।"
অতিরিক্ত ফ্লাইট চালু না হওয়ার আগ পর্যন্ত দ্বীপপুঞ্জটিতে যাওয়ার জন্য শুধু দুটি মাধ্যম ছিল। প্রথমটি ছিল অ্যালায়েন্স এয়ার দ্বারা পরিচালিত একটি ৭২ আসনের বিমান যা কেরালা রাজ্যের কোচি থেকে লাক্ষাদ্বীপের একমাত্র বিমানবন্দর যেটি অগাত্তি দ্বীপে অবস্থিত, সেই পর্যন্ত চলাচল করতো। এবং অন্য মাধ্যম ছিল মূল ভূখণ্ড থেকে আসা জাহাজগুলো যা দ্বীপপুঞ্জতে প্রতি চার দিন পর আসতো।
লাক্ষাদ্বীপে প্রবেশের জন্য প্রশাসন কর্তৃক জারি করা পারমিটও সীমিত ছিল।
জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টির মোহাম্মদ ফয়জল বলেছেন, "পরিবহণ, বাসস্থান এবং জমি-ভিত্তিক অবকাঠামো দ্বীপগুলোকে উন্নত করার জন্য সব থেকে বড় প্রতিবন্ধকতা।" তিনি লাক্ষাদ্বীপের প্রায় ৭০,০০০ জন লোকের প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র এমপি।
তিনি বলেন, "প্রধানমন্ত্রী মোদী বাঙ্গারাম নামে যে দ্বীপটিতে ছিলেন সেখানে পর্যটকদের জন্য মাত্র ৩৬টি কক্ষ আছে।"
সুতরাং এই অঞ্চলের বর্তমান পর্যটনের বেশিরভাগই ক্রুজের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। জাহাজে আসা দর্শনার্থীরা দিনের বেলা দ্বীপপুঞ্জে ভ্রমণ করে এবং রাত কাটানোর জন্য জাহাজে ফিরে যায়।
তার বিপরীতে মালদ্বীপে পর্যটকদের থাকার জন্য রিসোর্ট, হোটেল এবং গেস্টহাউস সহ শত শত বিকল্প রয়েছে।
ফয়জল বলেন, "মালদ্বীপে যা আছে তা লাক্ষাদ্বীপের সমুদ্র সৈকত এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হয়ত পূরণ করতে পারে, কিন্তু অবকাঠামোগত দিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে।"
তিনি যোগ করেন, যেকোনো উন্নয়ন করতে হলে প্রশাসন এবং দ্বীপবাসীদের মধ্যে মতের পার্থক্য নিষ্পত্তি করতে হবে।
লাক্ষাদ্বীপের জনসংখ্যার ৯৬ শতাংশ মুসলিম। ২০২১ সালে প্রফুল প্যাটেলকে এর প্রশাসক নিযুক্ত করার পরে দ্বীপপুঞ্জটিতে উত্তেজনা দেখা দেয় কারণ তিনি মোদীর হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির প্রাক্তন নেতা।
এরপর থেকে তিনি স্কুলের খাবারের মেনু থেকে মাংস অপসারণ করা সহ একটি খসড়া আইন করে প্রশাসনকে জমি দখলের ব্যাপক ক্ষমতা দিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেন।
বিবিসি প্যাটেলের অফিস, লাক্ষাদ্বীপের কালেক্টর এবং এর পর্যটন ও তথ্য বিভাগকে ফোন এবং ই-মেইল করে বিভিন্ন প্রশ্ন করলেও কোন উত্তর পায়নি।
সাক্ষাৎকারে প্যাটেল তার প্রশাসনের নীতিগুলি রক্ষা করে বলেছেন, তাঁর একমাত্র অ্যাজেন্ডা ছিল "লাক্ষাদ্বীপের উন্নয়ন"।
আলতাফ হুসেন যিনি আগাত্তি দ্বীপে একটি ট্রাভেল এজেন্সি চালান বলেছেন, মোদির সফরের পর থেকে সম্ভাব্য পর্যটকদের কাছ থেকে অনুসন্ধান ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
যদিও তিনি আরও পর্যটকদের স্বাগত জানাবেন, হুসেন যিনি ভবিষ্যতে আগাত্তিতে নিজের রিসোর্ট স্থাপনের আশা করছেন বলেছেন, সুযোগগুলো স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কাছে যাওয়া উচিত। শুধু বড় ব্যবসায়ীদের কাছে নয়।
তিনি বলেন, "এই প্রকল্পগুলি আসায় আমরা ছোটখাটো চাকরি পেতে পারি কিন্তু আমরা আসলে তা চাই না। আমরা এই প্রকল্পগুলিতে মালিকানা পেতে চাই, শুধু শ্রম দিতে চাই না।"
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লাক্ষাদ্বীপের যেকোনো উন্নয়নকে জলবায়ু পরিবর্তনের আশঙ্কার সাথে জীবিকার ভারসাম্যকেও বজায় রাখতে হবে।
১৯৯৬ সাল থেকে দ্বীপগুলি নিয়ে গবেষণা করা সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী এবং পরিবেশবিদ রোহান আর্থার বলেন, "লাক্ষাদ্বীপের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা তার প্রবাল প্রাচীর, উপহ্রদ এবং সমুদ্র সৈকতের পরিবেশগত অখণ্ডতার উপর নির্ভর করে। এগুলি গুরুত্বপূর্ণ 'বাস্তুসংস্থানিক' অবকাঠামো' যা প্রবালপ্রাচীরকে একসাথে ধরে রাখে।"
কিন্তু তিনি বলেছেন যে বিগত কয়েক দশক ধরে ভারত মহাসাগরের এই অংশে এল নিনো সাউদার্ন অসিলেশন আবহাওয়ার (সংক্ষেপে এনসো যা সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সম্পর্কিত) সাথে যুক্ত একাধিক বিপর্যয়কর তাপপ্রবাহের ঘটনা ঘটেছে যা প্রবাল প্রাচীরের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করেছে।
যেহেতু এই বছরে আরও বড় একটি এনসো প্রত্যাশিত, তিনি "লাক্ষাদ্বীপের প্রবাল প্রাচীরগুলির কী করবে তা ভাবতে" ভয় পাচ্ছেন৷
তিনি যোগ করেন, অপরিকল্পিত বা টুকরো টুকরো উন্নয়ন যা জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতার জন্য দায়ী নয়, তা কেবল লাক্ষাদ্বীপে গজিয়ে ওঠা বাসযোগ্যতা সংকটকে বাড়িয়ে তুলবে।
টেকসই পর্যটন এখানে কেমন হবে?
বিশেষজ্ঞরা এবং স্থানীয়দের মতে, বিলাসবহুল পর্যটনের পরিবর্তে (যা কার্বন বৃদ্ধির কারণ) দ্বীপপুঞ্জের এমন একটি মডেলের প্রয়োজন যা এর সংবেদনশীল বাস্তুসংস্থান এবং অধিবাসীদের চাহিদাকে গুরুত্ব দিবে।
ফয়জল বলেন, দ্বীপগুলোতে ইতোমধ্যেই সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত বিচারপতি রবীন্দ্রন কমিশনের "উন্নয়নের একটি পরিকল্পনা" রয়েছে। এটি ২০১৫ সালে ফেডারেল পরিবেশ মন্ত্রণালয় দ্বারা অনুমোদিত হয়েছিল।
প্যাটেল বলছেন যে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হয়েছে কিন্তু ফয়জল এই ব্যাপারে একমত নন। তিনি দাবি করেন, প্রশাসন আদালতের নির্ধারিত নির্দেশনাগুলো খুব কমই অনুসরণ করে।
সমন্বিত দ্বীপ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা সংস্থার সাথে নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের সাথে পরামর্শ করে দ্বীপগুলোতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সুপারিশ করে। পাশাপাশি উপহ্রদ, প্রবাল এবং অন্যান্য বাস্তুসংস্থান রক্ষার জন্য ড্রেজিং এবং বালি উত্তোলনের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। পাশাপাশি শুধু জনবসতিহীন দ্বীপগুলিতে পর্যটন প্রকল্প গড়ে তোলার নির্দেশ দেয়।
পর্যটকদেরও আরো দায়িত্বশীল মানসিকতার সাথে ভ্রমণ করতে হবে।
আর্থার একটি দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছেন, যেখানে লাক্ষাদ্বীপে ভ্রমণকারী পর্যটকদের এর গভীর সাংস্কৃতিক ইতিহাস বোঝা, স্থানীয় রেসিপি দিয়ে রান্না করা খাবার খাওয়া, স্থানীয় গাইড এবং ডুবুরিদের সাথে প্রবাল প্রাচীরটি ঘুরে দেখা এবং এদের রক্ষায় কাজ করার ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদি আগ্রহ থাকতে হবে।
তিনি বলেন, "এখানে এমন একটি পর্যটন কল্পনা করা যেতে পারে যা স্থানীয় অর্থনীতিকে সাহায্য করবে এবং পর্যটকরা স্থানীয়দের সাথে মিশে যেতে পারবে।"
