গাজায় কেঁদে শোক করার মতোও কেউ নেই! ইসরায়েলের বোমায় চারিদিকে মৃত্যুর মিছিল
ইসরায়েলের ক্রমাগত বিমান হামলায় গাজা উপত্যকা যেন পরিণত হয়েছে এক মৃত্যু উপত্যকায়। যেখানে প্রতিটি ফোনকলেই শোনা যাচ্ছে মৃত্যুর সংবাদ। প্রায় প্রতিটি মেসেজেই পাওয়া যাচ্ছে ঘনিষ্ঠ কোনো এক বন্ধুর বাড়ি ধ্বংসের খবর। প্রতিটি বিমান হামলায় যেন গাজাবাসীর হৃদয়ে ধরছে ভয়ের কাঁপুনি।
গাজায় বসতবাড়ি যেন আর বসবাস ও বিশ্রামের জন্য নিরাপদ জায়গা নয়। বরং এটি এমন একটি অনিশ্চিত জায়গা যেটি কোনো রকম সতর্কতা ছাড়াই আকস্মিক বোমার আঘাতে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
বর্তমানে অঞ্চলটিতে পরিবারের সকলকে নিয়ে বেঁচে থাকতে পারাটাই যেন সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আর কেউবা হয়তো প্রিয়জন হারানোর গভীর ক্ষত নিয়ে নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন।
গাজায় এমন বাড়িও রয়েছে যেখানে বিমান হামলায় হয়তো পরিবারের সবাই নিহত হয়েছে। সকলের এই দুঃখজনক পরিণতিতে যেন কেঁদে শোক করার মতোও কেউ নেই! ইসরায়েলের বোমায় চারিদিকে যেন মৃত্যুর মিছিল।
কিছু বাসিন্দা হয়তো হাসপাতাল কিংবা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়ে সাময়িকভাবে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। তবুও তাতে কোনো নিশ্চয়তা নেই। গাজার প্রতিটি জায়গায়ই এখন অনিরাপদ। যেকোনো মুহূর্তে সেখানেও হতে পারে বোমা হামলা।
এদিকে বিশ্বের বহু নেতা গাজায় যুদ্ধ থামানোর প্রচেষ্টার দিকে মনোনিবেশ না করে বরং ত্রাণ সহায়তা প্রদানের উপর জোর দিচ্ছেন। তবে অঞ্চলটির বাসিন্দাদের খাদ্য, পানি কিংবা অন্যান্য ত্রাণ সহায়তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন সহিংসতা, রক্তপাত ও ধ্বংসযজ্ঞের অবসান।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধের দীর্ঘ ১৮ দিনে গড়িয়েছে। গত তিনদিন যাবত অঞ্চলটি থেকে ইন্টারনেটও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। দিনের পর দিন গড়ালেও পরস্থিতি উন্নতি হওয়ার তেমন কোনো সম্ভবনা নেই। গাজা যেন মৃত্যু এবং ধ্বংসের পুনরাবৃত্তিমূলক চক্রে আটকা পড়ে আছে।
গতকাল আরেকটি হৃদয়বিদারক খবর জানতে পারি। ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাংবাদিক রোশদি সররাজ নিহত হয়েছেন। তাকে হারানোর বেদনা মেনে নেওয়া বেশ কঠিন। বিশেষ করে তার স্ত্রী, বন্ধুবান্ধব ও এক বছরের কন্যা দানিয়ার উপর এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে।
গত পরশু যেন এরচেয়েও ভয়ানক খবর শুনে ঘুম ভাঙে। এক পরিচিত বন্ধুর পরিবারের নয়জন সদস্য বোমা হামলায় নিহত হয়েছে। পরিবারের মা, মেয়ে, ছেলে সকলেই মারা গেছেন। একমাত্র নূর নামের কাতার প্রবাসী মেয়ে এই ট্র্যাজেডি থেকে সৌভাগ্যবশত বেঁচে গিয়েছেন।
অন্যদিকে গণমাধ্যমগুলোতে নজর দিলে দেখা যায়, প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হচ্ছে একের পর এক প্রিয়জনকে হারানোর যন্ত্রণার সংবাদ। এক্ষেত্রে কারও প্রতি যথাযথভাবে শোক জানানোর আগেই এসে হাজির হয় নতুন কোনো মৃত্যুর ঘটনা।
নিজের পরিবারের সকলের মৃত্যুর খবর শুনে শোকে আছন্ন হয়ে আছেন নূর। টেলিফোনের মাধ্যমে সকলের কাছে অনুরোধ করছেন, যাতে শেষবারের মতো মরদেহগুলোর একটা ছবি তুলে রাখা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার পরিবারের মরদেহগুলো ইতিমধ্যেই চুপচাপ দাফন করা হয়েছে। সুতরাং শেষবারের মতো প্রিয়জনকে না দেখার কষ্ট সারাটা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে তাকে।
মৃত্যুর এমন নির্মম গল্পগুলো যেন ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশের কথাগুলোই স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি বলেছিলেন, "মৃত্যু মৃত মানুষকে কষ্ট দিতে পারে না। বরং শুধু জীবিত মানুষদেরই কষ্ট দেয়।"
