'প্রতিটি মুহূর্ত বিপদসঙ্কুল': গাজার সাংবাদিকরা লড়ছে ডেডলাইন আর মৃত্যুর বিরুদ্ধে
গত ১০ দিন ধরে বিরতিহীনভাবে গাজায় বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল; যেখানে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ২৮০০ এরও বেশি ফিলিস্তিনি, যারমধ্যে এক চতুর্থাংশ শিশু। এ পরিস্থিতিতে গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনি সাংবাদিকরা প্রতিকূলতা ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে লড়াই করে এ যুদ্ধের ভয়াবহতা বিশ্ব অঙ্গনে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন প্রতিনিয়ত।
ইসয়ারেলের হামলায় জর্জরিত গাজায় একটি ক্যাফে থেকে কাজ করেন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক রাকান আবদেলরহমান। 'প্রেস' লেখা একটি ভেস্ট পরে থাকতে হয় তাকে সর্বক্ষণ। যেকোনো মুহূর্তে বেরিয়ে পড়তে হয় ইসরায়েলের বোমা হামলার রিপোর্ট করতে।
মিডল ইস্ট আই এবং দ্য ন্যাশনাল-এর মতো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে আবদেলরহমানের কাজ। তার মতো গাজা উপত্যকার অন্যান্য ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদেরও সারাক্ষণ মৃত্যুর আশঙ্কা মাথায় নিয়েই চলতে হচ্ছে।
গাজার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার জানিয়েছে, ইসরায়েলের বিমান হামলায় এখন পর্যন্ত ১০,৮৫৯ জন আহত হয়েছে। তারা আরও জানায়, ১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মৃতদেহ বোমায় ধ্বংস হওয়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছে।
গত সপ্তাহে ইসরায়েল অবরুদ্ধ গাজা অঞ্চলের যোগাযোগ টাওয়ারে বোমা হামলা করে; গাজা স্ট্রিপের একমাত্র বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেয় তারা।
গাজা উপত্যকার বাইরে ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি এবং এর আশেপাশের শহর ও বসতিগুলোতে গত ৭ অক্টোবর আকস্মিক আক্রমণ চালায় হামাস। এ হামলায় অন্তত ১,৪০০ ইসরায়েলি নিহত হয়। এরপরই শুরু হয় ইসরায়েলের পাল্টা আক্রমণ।
বোমা হামলা এবং অবরোধের কারণে গাজা উপত্যকায় ঠিকঠাক মিলছে না ইন্টারনেট বা বিদ্যুৎ। এতে সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা সাংবাদিকদের কাজ আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে।
"বাজে ইন্টারনেট সংযোগ এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে আমরা তৎক্ষণাৎ রিপোর্ট করতে পারি না। এমনকি কাজ করার জন্য কোনো উপযুক্ত জায়গাও নেই," আল জাজিরাকে বলেন আবদেলরহমান। তিনি আরও জানান, স্পষ্টভাবে 'প্রেস' লেখা ভেস্ট ও হেলমেট পরিহিত সাংবাদিকদের টার্গেট করা হচ্ছে।
কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) অনুসারে, ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত গাজা উপত্যকায় অন্তত ১৫ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।
আবদেলরহমান বলেছেন, "বোমা হামলায় বিধ্বস্ত জায়গাটি সরাসরি কভার করতে যেতে পারি না আমরা, এই ভয়ে যে ওই জায়গায় হয়তো আবারও হামলা হবে। প্রতি সেকেন্ডে আপনি বিপদে আছেন। আমাদের সহকর্মী সাইদ আল-তাওয়েল, মোহাম্মদ সুব এবং হিশাম আলনওয়াজা খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে নিজেদের জীবন দিয়েছেন।
গত ১০ অক্টোবর বোমা বিস্ফোরণের চিত্র ধারণের জন্য গাজা শহরের একটি ভবন থেকে নিরাপদ দূরত্বেই দাঁড়িয়ে ছিলেন তারা। কিন্তু মূল লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা না করে, সাংবাদিকদের কাছাকাছি আরেকটি ভবনে হামলা করা হয়। এ ঘটনায় মৃত্যু হয় এ তিন সাংবাদিকের।
২.৩ মিলিয়ন লোকের বসতির গাজা স্ট্রিপে মোট বাসিন্দার অর্ধেকেরও বেশি ১৮ বছরের কম বয়সী। গাজার অধিবাসীদের মতে, এবারের যুদ্ধটি গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। এবার অন্তত ১০ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
আবদেলরহমান বলছেন, তিনি রিপোর্ট করার সময় তার নিজের জীবনের পাশাপাশি, তার পরিবার ও চার সন্তানের জন্যও উদ্বিগ্ন থাকেন।
"আমি তাদের মানসিক অবস্থার কথা চিন্তা করি। এর আগের ইসরায়েলি যুদ্ধের সময় তাদের বয়স কম ছিল। বেশি কিছু মনে রাখতে পারতো না। কিন্তু এখন তারা বড় হয়েছে," বলেন তিনি।
ইন্টারনেট ও বিদ্যুতের অভাবে বেশিরভাগ সাংবাদিকই তাদের মিডিয়া অফিস থেকে কাজ করছেন না। বরং কোনো ক্যাফে খোলা পেলে সেখান থেকেই কাজ করতে হচ্ছে তাদেরকে।
গাজা শহরের শিফা হাসপাতালও সাংবাদিক ও প্রতিবেদকদের কাজ করার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। হাসপাতালে জেনারেটর থাকায় নিজেদের ফোন চার্জ করার সুযোগ পাচ্ছেন তারা।
এছাড়া, ইসরায়েলের বোমা হামলায় যেসব নিহত ও আহত ব্যক্তিদের এ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়, তা থেকেও খবর কভার করতে পারেন তারা; যা অন্যথায় সম্ভব হতো না।
সিরিয়া টিভির সংবাদদাতা শোরুক শাহীন বলেন, "আমরা এখনও খবর কভার করছি কিন্তু আমাদের কভারেজ সীমিত হয়ে গেছে। হামলায় নিহত ও আহতদেরকে হাসপাতালে নিয়ে আসলে আমরা জানতে পারি। কিন্তু হামলাস্থলে গিয়ে প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করতে পারিনা আমরা।"
জর্ডানের আল-রোয়া টিভি চ্যানেলের সংবাদদাতা গাজী আল-আলউল বলেন, সাংবাদিকরা তাদের জীবনের ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত। "এমনও হতে পারে যে খবর কভার করতে যেয়ে আমরাই পত্রিকার খবর হয়ে যেতে পারি," বলেন তিনি।
তবে, সহকর্মীদের মৃত্যু তাদেরকে নিজ দায়িত্ব পালনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
"সাংবাদিক হিসেবে আমরা সবসময় প্রমাণ করেছি যে আমরা কাজ করতে প্রস্তুত। ইসরায়েল আমাদের বিরুদ্ধে যে নৃশংসতা চালাচ্ছে তা সত্ত্বেও আমরা অনড়," বলেন আল-আলউল।
