১০০টিরও বেশি দেশে নিষিদ্ধ ক্লাস্টার বোমা কেন ইউক্রেনে পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?
রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে বিতর্কিত ক্লাস্টার (গুচ্ছ) বোমা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের প্রায় ১০০টিরও বেশি দেশ এই বোমার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপে ইতোমধ্যেই সমালোচনার ঝড় উঠেছে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে। বিবিসি অবলম্বনে।
ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র কী?
ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র হল রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র বা আর্টিলারি শেল থেকে প্রচুর পরিমাণে ছোট ছোট বোমা নিক্ষেপের একটি পদ্ধতি। এর মাধ্যমে একটি বিস্তৃত এলাকায় ছোট ছোট বোমা ছড়িয়ে দেওয়া যায়।
এভাবে বোমা ছড়িয়ে উদ্দেশ্য হলো বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ধ্বংস করা। তবে এরমধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রাথমিকভাবে বিস্ফোরিত হয় না, যে অংশটিকে বলা হয় 'ডাডস'। বিশেষ করে, ভেজা বা নরম মাটিতে যেসব বোমা ছড়ায়, সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বিস্ফোরিত না হয়ে পরে বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে করে ভুক্তভোগী পঙ্গু হওয়াসহ মারাত্মভাবে আহত হতে পারেন, অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুও হতে পারে।
সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ক্লাস্টার বোমা মাটির নিচে পুঁতে ফাঁদ তৈরি করা হলে, তখন তা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্করভাবে কার্যকর হয়। সাবধানে এগোনোর পাশাপাশি বোমাগুলো সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় চলাচল করা মারাত্মক বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
কেন নিষিদ্ধ এই অস্ত্র?
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং জার্মানিসহ ১০০ টিরও বেশি দেশ ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। চুক্তি অনুযায়ী, বেসামরিক জনগণের ওপর নির্বিচারে মারাত্মক প্রভাব রাখার কারণে ক্লাস্টার অস্ত্রের ব্যবহার ও মজুদকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে।
বিশেষ করে, শিশুদের এই অস্ত্রের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কারণ এই বোমাগুলো আবাসিক বা কৃষি এলাকার আশেপাশে পড়ে থাকতে দেখা যায়, অনেক সময় বোমাগুলোকে ছোট খেলনার মতো দেখায়; ফলে কৌতূহলবশত শিশুরা এগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়।
বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো ক্লাস্টার অস্ত্রের ব্যবহারকে 'ঘৃণ্য' এবং এমনকি যুদ্ধাপরাধ হিসেবেও বর্ণনা করেছে।
কারা এখনোও এই অস্ত্র ব্যবহার করছে?
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে রাশিয়া এবং ইউক্রেন উভয়ই ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করে আসছে।
তাদের কেউই এই অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। যুক্তরাষ্ট্রও করেনি। তবে পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ শুরু পর থেকে রাশিয়ার ক্লাস্টার বোমা ব্যবহারের সমালোচনা করে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। অথচ এখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রই ইউক্রেনকে এই অস্ত্র সরবরাহের ঘোষণা দিয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার ক্লাস্টার বোমার 'ডাড রেট' ৪০ শতাংশ; অর্থাৎ নিক্ষেপিত বোমার একটি বড় অংশই মাটিতে বিপদজ্জনক অবস্থায় থেকে যায়। যেখানে ক্লাস্টারের গড় ডাড রেট সাধারণত ২০ শতাংশের কাছাকাছি হয়ে থাকে বলে মনে করা হয়।
পেন্টাগনের তথ্য মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাস্টার বোমার ডাড রেট ৩ শতাংশেরও কম।
যুক্তরাষ্ট্র কেন এটি ইউক্রেনে পাঠাবে?
প্রায় দেড় বছর ধরে চলতে থাকা যুদ্ধে সমরাস্ত্রের দিক দিয়ে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। তাই রুশ বাহিনীর সঙ্গে অস্ত্রে ও শক্তিতে পেরে ওঠা কঠিন হয়ে উঠেছে তাদের জন্য। এদিকে, প্রয়োজনের তুলনায় দ্রুত এবং যথেষ্ট পরিমাণ সামরিক সহায়তাও ইউক্রেনকে দিতে পারছে না তার পশ্চিমা মিত্ররা।
পর্যাপ্ত গোলাবারুদের অভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ক্লাস্টার বোমা চেয়েছে ইউক্রেন। রুশ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতেই এই অস্ত্রের সরবরাহের অনুরোধ জানায় দেশটি।
যদিও ইউক্রেনের অনুরোধ রাখা সম্ভব হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ ছিল না। অনেক ডেমোক্র্যাট এবং দেশটির মানবাধিকার সংস্থাগুলো এর বিরোধিতা করে আসছে। গত ছয় মাস ধরে চলছে বিতর্ক।
