পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষও দাঁড়াতে পারে শোভনের স্ট্যান্ডিং হুইলচেয়ারে
মীমের বয়স তখন পাঁচ কী ছয় বছর। সুস্থ স্বাভাবিক শিশুই ছিল সে। হঠাৎ একদিন রিকশা থেকে পড়ে মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায় তার। সেই থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানো কাকে বলে, তা ভুলে গেছে মীম।
এরপর শুরু হয় সীমিত চলাচল, অবলম্বন হয়ে ওঠে হুইলচেয়ার। সিআরপির সাভার কেন্দ্রটি বাড়ির কাছে হওয়ায় নিয়মিত থেরাপি চালিয়ে যাওয়া সহজ ছিল তার জন্য। একসময় সে স্কুলেও ভর্তি হয়। তখনো হুইলচেয়ারই সঙ্গী।
২০২৪ সালে মীম নবম শ্রেণির ছাত্রী। তখনই তার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসে স্ট্যান্ডিং হুইলচেয়ার। যার মাধ্যমে মীম ছোট বেলার মতো আবার দাঁড়ানোর সুযোগ পায়। দিনটি ছিল মীম ও তার বাবা-মায়ের জন্য ভীষণ আনন্দের।
জীবনের বাঁক বদলকারী এক ঘটনা
চেয়ারটি যে বাংলাদেশে আগে ব্যবহৃত হয়নি তা নয়, তবে সেগুলো ছিল আমদানিকৃত। নিজস্ব কারিগরি কৌশল ও সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে প্রথমবারের মতো দেশে চেয়ারটি তৈরি করেন শোভন পারভেজ। ২০২৩ সালে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় চেয়ারটি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি।
শোভনের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। বাবা-মা দুজনেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। স্কুলবেলা থেকেই ইলেকট্রনিক্স জিনিসপত্রের প্রতি ছিল শোভনের আগ্রহ। মোটর, রিসিভার নিয়ে এত বেশি সময় সে কাটাত যে, স্কুলের বই পড়ার সময় পেত না। ফলে রেজাল্ট খারাপ হতো আর শাস্তিও পেত। তবু তার আগ্রহ কমত না।
এইচএসসি শেষ করে ২০২০ সালে শোভন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন। আগ্রহের সঙ্গে পড়ার বিষয় মিলে যাওয়ায় পড়ালেখাও উপভোগ্য হয়ে ওঠে তার জন্য। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবটিক্স ক্লাবেও সদস্য হয়ে যান শোভন। পরে শেষ বর্ষে উঠে সেই ক্লাবেরই সভাপতিত্ব করেন তিনি।
এরপর আসে শোভনের জীবনের বাঁক বদলকারী একটি ঘটনা। রোবটিক্সে তার মনোযোগ ও আগ্রহ দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবোটিক্স ল্যাবের গবেষণা টিমে নিয়োগ দেওয়া হয় তাকে। উদ্ভাবনী ভাবনাকে বাস্তবায়িত করার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ কোথা থেকে ও কীভাবে সংগ্রহ করা যায়, কারা সহকারী হিসেবে ভালো, কীভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হয় ইত্যাদি তিনি রোবোটিকস ল্যাবে কাজ করতে করতেই শিখেছেন।
শোভন তার অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছেন, বাস্তবায়নের বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে অত্যন্ত চমকপ্রদ আইডিয়া অকালেই মারা যায়। আমাদের দেশে স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দারুণ সব ভাবনা নিয়ে সায়েন্স ও টেকনোলজি ফেস্টগুলোতে অংশ নেন। কিন্তু ভাবনাগুলো আলোর মুখ দেখে না প্রধানত কার্যকর করার উপায় না জানা থাকার কারণে। এটি সবসময় সহজও নয়। কারণ, একটি প্রকল্প কার্যকর জন্য স্থানীয় লেজার অপারেটর বা লেদ মিস্ত্রিদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। মিস্ত্রিরা মিলিমিটারের মাপ বুঝতে পারেন না, তারা সুতার মাপ বোঝেন। আবার ক্যাড ডিজাইন বোঝেন না, বলেন এঁকে দেন।'
'আমি মিস্ত্রিদের দোষ দিচ্ছি না, বরং আমাদের উচিত বেশি অ্যাম্বিশাস (উচ্চাকাঙ্ক্ষী) না হওয়া। বরং উপকরণের সহজলভ্যতা, মিস্ত্রিদের দক্ষতা ইত্যাদি মিলিয়ে প্রকল্পটি কার্যকর করা সম্ভব কি না, বরং তা বিবেচনা করে আইডিয়া তৈরি করা উচিত', যোগ করেন তিনি।
প্রতিটি মানুষের শারীরিক গড়ন অনুযায়ী এর নকশা হওয়া জরুরি
ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুলিয়া ক্যাম্পাসের পাশে খাগান এলাকায় থাকতেন শোভন। পড়াশোনা, ক্লাবিংয়ের অবসরে তিনি একটি হাইব্রিড কার (গাড়ি) বানানোর নকশা করছিলেন। এটি ছিল তার একটি ড্রিম প্রজেক্ট। নকশা করার পাশাপাশি নিজে নিজে একটি একটি করে পার্টসও বানাচ্ছিলেন। একটি করে পার্টস তৈরি হয়, আর তা নিজের লিংকডইনে পোস্ট দেন।
ড. মনজুরুল আলম একজন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড বায়োমেডিক্যাল গবেষক। শোভনের গাড়ির পোস্টগুলো দেখে একসময় ড. আলম নিজেই উদ্যোগী হয়ে যোগাযোগ করেন। তিনি বলেন, 'আগামী মাসে ঢাকায় আসছি, তখন কি আপনি (শোভন) আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবেন?'
নতুন কারো সঙ্গে পরিচিত হওয়ার, নতুন কিছু জানার আগ্রহ শোভনের বরাবরই আছে। তাই সাক্ষাৎ করতে সম্মত হলেন দ্রুতই। ড. আলম দিন নির্দিষ্ট করে শোভনকে সাভার সিআরপিতে আসতে বললেন। নির্দিষ্ট দিনে শোভন সিআরপিতে গেলে ড. আলম তাকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করিয়ে দেন। শেষে বলেন, 'আপনি যে গাড়িটি তৈরি করছেন, তা আমাকে আকৃষ্ট করেছে। তবে আমি বেশি খুশি হবো যদি আপনি এই রোগীদের জন্য আপনার মেধা ও দক্ষতা কাজে লাগান।' শোভনকে কথাগুলো খুব ভাবিত করে। তিনি ড. আলমের কাছে জানতে চান, তাকে কি করতে হবে?
তখন ড. আলম স্ট্যান্ডিং হুইলচেয়ার বিষয়ে জানান শোভনকে। বলেন, 'মনে হতে পারে এটি সামান্য উদ্ভাবনা। তবে এর ফলাফল হতে পারে অসামান্য। পক্ষাঘাতগ্রস্ত একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে এই ডিভাইস। এটি তাকে সম্মানজনক জীবন দিতে পারে।'
ড. আলম আরো বলেন, 'হুইলচেয়ার কেনা-বেচা হয় বাজারের আর ১০টি পণ্যের মতোই। অথচ এটি একটি হেলথ ডিভাইস। প্রতিটি মানুষের শারীরিক গড়ন অনুযায়ী এর নকশা হওয়া জরুরি। আর যেহেতু আমদাদি করা হুইলচেয়ারের দাম অনেক বেশি, তাই খুব কম জনই এটি ব্যবহার করার সামর্থ্য রাখে। এখন আপনি যদি সাশ্রয়ী মূল্যের একটি স্ট্যান্ডিং হুইল চেয়ার তৈরি করতে পারেন, তবে অনেক মানুষ উপকৃত হবে।'
খোঁজখবর করে শোভন আরো জানতে পারলেন, বসে থাকতে থাকতে একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীর লোয়ার পার্টের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো কার্যক্ষমতা হারাতে থাকে, প্রেশার সোর (ত্বকের ও টিস্যুর ক্ষতি, যা দীর্ঘক্ষণ একইভাবে শুয়ে বা বসে থাকার কারণে ত্বকে রক্ত চলাচল কমে যাওয়ায় সৃষ্টি হয়) তৈরি করে মৃত্যুর দিকেও তাকে ঠেলে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে স্ট্যান্ডিং হুইলচেয়ার তাকে প্রয়োজনীয় কাজ যেমন, রান্নাঘরের ওপরের তাক থেকে হাড়ি পাতিল নামানো বা মশারি টাঙানোয় সাহায্য করবে, আবার তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো সচল ও স্বাভাবিক রাখবে। সামাজিকভাবেও তাকে শক্তিশালী করবে।
'তৈরি করতে আমার সময় লেগে গেছে দেড় বছর'
এরপর শোভন আর কালক্ষেপণ করলেন না। তিনি একটি স্ট্যান্ডিং হুইল চেয়ার তৈরির উপায় খুঁজতে থাকলেন। ইন্টারনেটে তিনি বিদেশি কিছু নমুনা দেখলেন। তারপর বাজারে সহজলভ্য উপকরণ খুঁজে নকশা করতে বসলেন। তহবিল জোগান দিলেন ড. আলম। খাগানের যে বাসায় শোভন থাকতেন, তার পুরো ফ্লোরজুড়ে একটি ল্যাবও গড়ে দিলেন। শোভন বেশি মনোযোগী হলেন চেয়ারটির ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ সহজ করার দিকে।
শোভন বললেন, 'আমাদের মিস্ত্রিরা বিদেদি যন্ত্রে সাধারণত হাত দিতে চান না। কারণ, এর যন্ত্রাংশ তাদের কাছে অচেনা, আর পার্টসও সহজে পাওয়া যায় না। তাই ফার্স্ট প্রোটোটাইপ (প্রথম পরীক্ষামূলক সংস্করণ) তৈরি করতে আমার সময় লেগে গেছে দেড় বছর। এই দেড় বছরের অধিকাংশই ব্যয় হয়েছে চেয়ারটি দেশীয়করণ করতে।'
শোভনের চেয়ার প্রকল্পের সঙ্গে শুরু থেকেই ছিলেন ক্লিনিক্যাল ফিজিও কনসালট্যান্ট ফারজানা তৌহিদা চাঁদনি। সিআরপির হিউম্যান রিসার্চ এথিকস কমিটির অনুমোদন নিয়ে তিনি মীমকে চেয়ারটির প্রথম ব্যবহারকারী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন।
এর আগে ফিজিওথেরাপিস্ট ও অকুপেশনাল থেরাপিস্ট সঙ্গে নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠিত হয়েছিল। যারা একটি অ্যাসেসমেন্ট ফরম পূরণ করেছিলেন মীমের গড়ন, উচ্চতা, ওজন ও সামাজিক প্রয়োজনের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে। মীম যেহেতু ছাত্রী, তাই তার জন্য একটি ছোট টেবিলও যোগ করা হয়েছিল চেয়ারটিতে।
শোভন বললেন, স্লাইডার ক্র্যাংক মেকানিজমে চেয়ারটি তৈরি করা হয়েছে। এটি একটি সরল যান্ত্রিক প্রকৌশল পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে ঘূর্ণন গতি সরল রৈখিক গতিতে রূপান্তরিত হয়। মীমের মাধ্যমে আমরা চেয়ারটির কার্যকারিতার পরীক্ষা নিতে থাকি। সপ্তাহে সপ্তাহে তার স্কুলের অভিজ্ঞতা, বাসার কাজের অভিজ্ঞতা শুনি এবং সীমাবদ্ধতাগুলোর নোট নিতে থাকি। ল্যাবে ফিরে সেগুলো আবার সংশোধনের চেষ্টা করি। এভাবে 'ট্রায়াল অ্যান্ড এরর' পদ্ধতি এগিয়ে চলে। একদিন এমনকি আমরা মীমকে না জানিয়ে তার স্কুলে হাজির হই। আমরা দেখলাম শিক্ষক ক্লাসে প্রবেশ করলেন। অন্য ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে মীমও চেয়ারটি স্লাইড করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে শিক্ষককে সম্মান জানালেন। এটি দেখে খুব ভালো লেগেছিল। এভাবে ছয় মাস পরে আমরা লাস্ট প্রোটোটাইপটি তৈরি করতে সক্ষম হই।'
তিনি স্ত্রীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে একটি ছবি তোলেন
আরেকটি ঘটনা শোভনকে অনুপ্রাণিত করেছিল। ঘটনাটি ইউসুফ আলী বেগের। তিনি ২৩ বছর ধরে হুইলচেয়ার ব্যবহার করছেন। দাঁড়িয়ে ছবি তোলার কথা কখনো ভাবেননি। স্ট্যান্ডিং হুইলচেয়ার পেয়ে তার মধ্যে সেই আগ্রহ তৈরি হয়। তিনি স্ত্রীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে একটি ছবি তোলেন এবং খুব খুশি হয়ে ফেসবুকে পোস্ট (ইংরেজিতে) দেন- 'সিআরপি'র রিহ্যাবিলিটেশন ইঞ্জিনিয়ার শোভনের তৈরি পাওয়ার স্ট্যান্ডিং হুইলচেয়ার ব্যবহার করে, ২৩ বছরের হুইলচেয়ার-নির্ভর জীবনে আমি তৃতীয়বারের মতো দাঁড়াতে পারলাম।'
'শুরুতে আমি কিছুটা নার্ভাস ছিলাম। কিন্তু শোভন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আমাকে আশ্বস্ত করেছিল যে, সবকিছু ঠিকঠাক হবে এবং সত্যি-ই তাই হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ ডিভাইসকে কীভাবে আরও স্মার্ট, আধুনিক এবং ব্যবহারকারীবান্ধব করা যায়, সেই বিষয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনাও হয়েছে। আশা করছি, ভবিষ্যতে তার সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাব।'
'এই জীবনযাত্রার মধ্য দিয়ে যিনি গেছেন, তিনিই কেবল বুঝতে পারবে একজন ব্যবহারকারীর জন্য একটি বহুমুখী হুইলচেয়ার সত্যিকার অর্থে ঠিক কতটা জরুরি। আমি মন থেকে তরুণ প্রকৌশলী শোভনের এই অনুপ্রেরণাদায়ী কাজের ধারাবাহিক সাফল্য ও সমৃদ্ধি কামনা করি।'
প্রথমবারের মতো দেশে চেয়ারটি তৈরি করেন
শোভন বললেন, 'চেয়ারটির বড় বৈশিষ্ট্য এর সাশ্রয়ী মূল্য এবং সহজ রক্ষণাবেক্ষণ। আমদানি করা একটি হুইল চেয়ারের দাম হয় সাড়ে ৩ লাখ টাকা। সেখানে আমাদের চেয়ারটির দাম ৩৫-৪০ হাজার টাকা। এর কারিগরি কৌশলও 'ওপেন সোর্স' (উন্মুক্ত করা আছে), যেন অন্য দরিদ্র দেশও প্রয়োজনে এটি তৈরি করতে পারে। বিদেশ থেকে আমদানি করা চেয়ারগুলোর প্রযুক্তি হাইড (লুকানো) করা থাকে। আর যন্ত্রাংশগুলোও কেবল প্রস্তুতকারী দেশেই পাওয়া যায়। অন্যদিকে আমাদের উদ্ভাবিত চেয়ারের যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য, তৈরি করেও নেওয়া যায় অথবা রিপ্লেসও (বদলানো) করা যায়।'
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনলজি ইনফরমেশনের ওয়েবসাইট পাবমেডে (এনসিবিআই) শোভন উদ্ভাবিত হুইলচেয়ারটি নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে। তাতে ফারজানা তাওহিদ, সোহরাব হোসেন, মনজুরুল আলম, ভ্যালেরি অ্যান টেইলর প্রমুখ লিখেছেন, স্ট্যান্ডিং হুইলচেয়ার একটি উপকারী ডিভাইস। কিন্তু দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। তাই স্বল্প মূল্যের হস্ত চালিত (ম্যানুয়াল) একটি চেয়ার আমরা উদ্ভাবন করি এবং এর নির্মাণ কৌশল সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেই। ৩০জন পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যবহারকারীকে আমরা ৯ মাস ধরে পর্যবেক্ষণ করি, যাদের মধ্যে ২৬জন পুরুষ এবং চারজন নারী। তাদের গড় বয়স ২০ থেকে ৪০ এর মধ্যে। ওজন ৫০ থেকে ৬০ কেজি। সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যাচ্ছে, ব্যবহারকারীরা এটি ব্যবহারে নিরাপদ অনুভব করেন এবং এটি চালাতে তাদের কম বেগ পেতে হয়। উঠে দাঁড়িয়ে লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে পারায় তাদের আত্মবিশ্বাসও বৃদ্ধি পায় এবং তারা সুখ অনুভব করেন। ব্যবহারকারীরা জানিয়েছেন, হুইলচেয়ারটি তাদের সাংসারিক ও সামাজিক কাজকর্মেও অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করেছে।
আশঙ্কা, দেশে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পাবেন না
শোভন ফুট কন্ট্রোলড হুইলচেয়ার নিয়েও কাজ করছেন। সিআরপির প্রতিষ্ঠাতা ভ্যালেরি অ্যান টেইলরের ছোট কন্যা পপি টেইলরের হাত-পা অবিরাম খিচুনি রোগে আক্রান্ত। তার লোয়ার লিম্বের কেবল ডান পায়ের বুড়ো আঙুল স্থিতিশীল। এই একটি আঙুল দিয়েই কীভাবে পপি হুইলচেয়ার অপারেট করতে পারেন, তা নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন শোভন। ইতোমধ্যে চেয়ারটির তৃতীয় মডিউল তৈরি করেছেন। এটি এখনো ডেভেলপমেন্ট ফেইজে আছে এবং দিনে দিনে পপির চলাচল বৃদ্ধি পাচ্ছে। চেয়ারটি তৈরি শেষ হলে পপির মতো আরো অনেকের মুভমেন্ট বৃদ্ধি পাবে।
শোভন নি (হাটু) জয়েন্ট, অ্যাকসেসিবল ভেহিকল হুইলচেয়ার, অটোমেটিক থেরাপি বেড নিয়েও কাজ করছেন। তিনি সিআরপির রিহ্যাবিলিটেশন ইঞ্জিনিয়ার। শ্রীপুরের গণকবাড়িতে সিআরপির অ্যাসিস্টিভ ডিভাইস ফ্যাব্রিকেশন ওয়ার্কশপের ইনচার্জ তিনি।
শোভন এখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স করছেন। রিহ্যাবিলিটেশন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে মানবসেবায় কাজ করতে পেরে তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন। মানুষের জন্য কাজ করতে পারায় তৃপ্তিবোধ অনেক। তার উদ্ভাবিত ডিভাইস ব্যবহার করে কেউ উঠে দাঁড়ালে বা কারোর চলাচল সহজ হলে শোভন তাই আনন্দিত হন, সার্থক মনে হয় নিজেকে। তবে তার আশঙ্কা, দেশে হয়ত কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা তিনি পাবেন না, তখন হয়তো বিদেশেই কাজ খুঁজতে হবে তাকে।
ছবি সৌজন্য : শোভন পারভেজ
