Skip to main content
  • অর্থনীতি
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলা
  • বিনোদন
  • ফিচার
  • ইজেল
  • মতামত
  • অফবিট
  • সারাদেশ
  • কর্পোরেট
  • চাকরি
  • প্রবাস
  • English
The Business Standard বাংলা

বঙ্গবাজার: আগুনে ফিকে হলো যে বাজারের গল্প

কোথাও রড বাঁধছেন, কোথাও ইট-বালু টেনে নিচ্ছেন শ্রমিকরা। রাস্তার একপাশে স্তূপ হয়ে আছে বালুর পাহাড়। তাতে অবশ্য ছুটে চলা আটকাচ্ছে না। মানুষ ছুটছে, যে যেমন পারছে ছুটছে। বাসের হর্ন, অটোরিকশার শব্দ, হকারের হাঁকডাক, মাইকে পণ্যের প্রচার, পথচারীদের ছোটাছুটি সব একযোগেই ছুটে চলেছে।  
বঙ্গবাজার: আগুনে ফিকে হলো যে বাজারের গল্প

ফিচার

আসমা সুলতানা প্রভা & রাফিয়া মাহমুদ
23 August, 2026, 10:45 pm
Last modified: 23 August, 2026, 10:46 pm

Related News

  • বঙ্গবাজার পোড়ানোর ঘটনায় সাবেক মেয়র তাপসসহ ৩০ জনের নামে মামলা
  • পুড়ে ছাই হওয়া বঙ্গবাজারের নতুন মার্কেট ঘিরে আশায় বুক বাঁধছেন দোকান মালিকরা
  • অগ্নিকাণ্ডের বছরঘুরে এলেও ঈদে ব্যবসা জমেনি বঙ্গবাজারে
  • মার্কেট নির্মাণের আগ পর্যন্ত তাঁবু টাঙিয়ে ব্যবসা করতে চান বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীরা
  • বঙ্গবাজার: ‘৭ লাখ টাকার ঋণ কীভাবে শোধ করবো, সংসার চালাবো কীভাবে?’

বঙ্গবাজার: আগুনে ফিকে হলো যে বাজারের গল্প

কোথাও রড বাঁধছেন, কোথাও ইট-বালু টেনে নিচ্ছেন শ্রমিকরা। রাস্তার একপাশে স্তূপ হয়ে আছে বালুর পাহাড়। তাতে অবশ্য ছুটে চলা আটকাচ্ছে না। মানুষ ছুটছে, যে যেমন পারছে ছুটছে। বাসের হর্ন, অটোরিকশার শব্দ, হকারের হাঁকডাক, মাইকে পণ্যের প্রচার, পথচারীদের ছোটাছুটি সব একযোগেই ছুটে চলেছে।  
আসমা সুলতানা প্রভা & রাফিয়া মাহমুদ
23 August, 2026, 10:45 pm
Last modified: 23 August, 2026, 10:46 pm
ফাইল ছবি: সংগৃহীত

বড় একটি সাইনবোর্ড। তার পেছনে বিশাল জায়গাজুড়ে চলছে ভবন নির্মাণের কাজ। তিন তলা সমান উঁচু হয়ে উঠেছে সে কাঠামো। কোথাও রড বাঁধছেন, কোথাও ইট-বালু টেনে নিচ্ছেন শ্রমিকরা। রাস্তার একপাশে স্তূপ হয়ে আছে বালুর পাহাড়। তাতে অবশ্য ছুটে চলা আটকাচ্ছে না। মানুষ ছুটছে, যে যেমন পারছে ছুটছে। বাসের হর্ন, অটোরিকশার শব্দ, হকারের হাঁকডাক, মাইকে পণ্যের প্রচার, পথচারীদের ছোটাছুটি সব একযোগেই ছুটে চলেছে।  

তবুও চারপাশে তাকালে গুলিস্তান ফুলবাড়িয়া মোড়ের চেনা ব্যস্ততার প্রায় সব ছবিই চোখে পড়ে; যেমন সারি সারি দোকানে ঝুলছে প্যান্ট, গেঞ্জি, শার্ট। ফুটপাতে ভ্যানে করে জামা-কাপড়ের পসরা সাজিয়ে বসেছেন কেউ কেউ। চলছে ক্রেতা-বিক্রেতার দর-কষাকষি। কেউ পণ্য কিনছেন, কেউ কাঁধে করে মাল নিয়ে ছুটছেন এদিক–সেদিক। তার ওপর মোবাইল মানিব্যগ চুরি যাবার ভয় তো আছেই।

বিচ্ছিন্ন দোকানপাট

এতকিছুর মাঝে খুঁজে পাওয়া যাবেনা কেবল বঙ্গবাজারকেই। যাবেনা লাল রঙের ওপর বাংলা ইংলিশে লেখা সেই সাদা রঙের 'বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স' নামের সাইনবোর্ডও। যার উপরের তলায় ছিল সারি সারি টিনের ছাপড়া দোকান। যে জায়গাটি একসময় হাজার হাজার ক্রেতার পদচারণায় মুখর থাকত, আজ সেখানে ক্রেতাদের দেখা মেলে কদাচিৎ। কমে গেছে দোকানিদের হাঁকডাকও। 

শুধু ফুটপাতের ওপর কিছু দোকানের দেখা পাওয়া গেল। তাদের কাছে বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীদের কথা জিজ্ঞেস করলে জানান, একসময় তাদেরই দোকান ছিল মার্কেটের ভেতরে। বাজারে আগুন লাগার পর তারাই এখন রাস্তার পাশে বসেন।  

তবে বেশিরভাগই চলে গেছে আশপাশের এনেক্সকো মার্কেট, সিটি প্লাজা, এস ইসলাম প্লাজা, নগর প্লাজা, ট্রেড সেন্টারসহ বিভিন্ন বিপণিবিতানে। কেউ চলে গেছেন মিরপুর, কেউ কেউ নিউ মার্কেট এলাকায়। আবার কেউ দোকান হারিয়ে অনলাইন ব্যবসায় ঝুঁকেছেন। কেউ বা দোকান ব্যবসা হারিয়ে চিরতরেই এখান থেকে বিদায় নিয়েছেন। ফলে ২১ হাজার ২৫০ বর্গফুট জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা সেই বঙ্গবাজার আজ যেন নিজের জায়গাতেই অদৃশ্য।

যদিও বাজারের কয়েক হাজার ব্যবসায়ী কোনো না কোনোভাবে আশপাশের মার্কেটগুলোতে জায়গা করে নিয়েছেন। কিন্তু এর ফলে হারিয়ে গেছে পুরোনো সেই ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক। 

এ প্রসঙ্গে কথা হয় ব্যবসায়ী মামুনের সঙ্গে। জানান, আগে যে ক্রেতারা নির্দিষ্ট দোকানে এসে পরিচিত বিক্রেতার কাছ থেকে পণ্য কিনতেন, এখন সেই দোকানটি কোথায়, তা-ই বের করা তাদের জন্য কঠিন কাজ হয়ে উঠেছে। 

বঙ্গবাজারে মো. মামুনের ব্যবসা ৩০ বছরের। ২০২৩ সালের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় তার দোকান। ঋণ করেও যখন আর ব্যবসার জন্য পুঁজি করতে পারলেন না, তখন নিরুপায় হয়েই ভাইয়ের দোকানে কাজ নিয়েছেন। ফলে বিগত তিন দশকে মামুনের চোখের সামনে বঙ্গবাজারের উত্থান যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে পতনও।

"মার্কেট পোড়ার পরে আগের মতো কিছু নাই। সবাই একেকদিকে চলে গেছে। কেউ কেউ নিঃস্ব হয়ে পথে বসে গেছেন," বলেন তিনি। 

এই ছড়িয়ে পড়ার মধ্যেই তিনি দেখেছেন আরেকটি বৈপরীত্য। গত ১৫ বছরে বঙ্গবাজারের অনেক ব্যবসায়ী নিজেদের অবস্থার উন্নতি করেছেন। কেউ বড় মার্কেটে দোকান নিয়েছেন, কেউ গুলশান বা মিরপুরে গেছেন। কারও ব্যবসা বড় হয়েছে, কারও ব্যবসা শেষ হয়েছে একই বাজারের গল্পে।

বঙ্গবাজার নির্মাণাধীন ভবন

বিদেশি ক্রেতাদের ভিড়

অথচ একসময় বঙ্গবাজার শুধু ঢাকার মানুষের কেনাকাটার জায়গা ছিল না। বিদেশি ক্রেতাদের কাছেও এটি ছিল পরিচিত নাম। ব্যবসায়ী আব্দুল মালেকের সঙ্গে বঙ্গবাজারের স্মৃতিও প্রায় তিন দশকের বেশি। ২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল আগুন লাগার ঘটনায় তার একমাত্র জিন্সের দোকানটিও পুড়ে যায়। তার স্মৃতিতে এখনও ভাসে সেই সময়ের বঙ্গবাজার। দোকানে আসতেন বিভিন্ন দেশের মানুষ। অনেকেই সঙ্গে করে আনতেন দোভাষী।

"নাইজেরিয়ান, সুদানি, আফ্রিকার অনেক মানুষ লটে করে এক্সপোর্টের মাল কিনতো। ভালা মালগুলো বাইছা নিতো। যে প্যান্ট আমরা ২০০ টাকায় বিক্রি করতাম, তারা ৩০০-৪০০ টাকাতেও নিতো," বলেন মালেক।

দোভাষীরা ছিলেন এই লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিদেশি ক্রেতাকে দোকানে নিয়ে আসা, দরদাম করা, পছন্দের পণ্য খুঁজে দেওয়া, বিক্রেতার পক্ষে ভালো দামে পণ্য বিক্রি করে দেওয়া, সবই করতেন তারা। বিনিময়ে পেতেন কমিশন। মালেক জানান, অনেক দোভাষী প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বেশি পড়াশোনা না করেও একাধিক ভাষায় কথা বলতে পারতেন। আরবি, ফারসি, ফরাসি, ইংরেজি, রুশ, হিন্দিসহ নানা ভাষায় তাদের দক্ষতা ছিল।

মূলত এই বিদেশিদের আসার পেছনেও ছিল বঙ্গবাজারের সুনাম। ঢাকার শেরাটন হোটেল, (বর্তমান ইন্টারকন্টিনেন্টাল), এবং প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ের মতো হোটেলগুলো কাছাকাছি হওয়ায় বিদেশি অতিথিদের অনেকেই বঙ্গবাজারের খোঁজ পেতেন হোটেল থেকেই। 

মামুনের ভাষ্যে, একসময় দিনে দেড়শোর মতো বিদেশি ক্রেতাকেও দেখা যেত বাজারে। ভুটান, নেপাল, ভারত, সৌদি আরব, ওমান, বাহরাইন, কাতার, ফিলিপাইন, সুদান, নাইজেরিয়া, ইরানসহ বিভিন্ন দেশের মানুষ আসতেন। কেউ নিজের জন্য কিনতেন, কেউ আবার দেশে নিয়ে ব্যবসা করতেন।

বিভিন্ন দেশের এয়ারলাইনসের বিমান বালাদের কাছেও বঙ্গবাজার ছিল পরিচিত জায়গা। বিদেশি খেলোয়াড়, ব্যবসায়ীরা আসতেন পোশাক কিনতে। মামুন বলেন, "ওরা ৫০০ টাকার জিনিস এখান থেকে কিনে নিজের দেশে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারত। এই জন্য বিদেশিরা লটে করে মাল কিনত।"

মামুনের ভাষ্যে তাদের কেনাকাটার তালিকায় থাকতো মানকি ক্যাপ, ওভার জ্যাকেট, সোয়েটার, ট্র্যাকস্যুট, গেঞ্জি, জিন্সের প্যান্টসহ নানা ধরণের শীতের পোশাক। নারীরাও আসতেন দলবেঁধে। বিশেষ করে নেপালি ও ভুটানি নারী ক্রেতাদের দেখা যেত বেশি। 

এমনকি সে সময়ে এই বিদেশি ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে নতুন করে কিছু রেস্টুরেন্টও চালু হয়। 'ওয়ান স্টার' তার মধ্যে অন্যতম। বিদেশিদের পছন্দের সব খাবার বিক্রি হতো সেখানে। এছাড়া পানকৌড়ি নামের আরেকটি জনপ্রিয় রেস্তোরাঁও গড়ে ওঠে বাজারের আশেপাশে। কেউ কেউ কেনাকাটা সারার পরে চলে যেতেন 'কস্তুরী'তে (বর্তমান নাম কস্তুরী কিচেন)। 

 'এক্সপোর্ট সারপ্লাস' হলো আকর্ষণের কেন্দ্র

বঙ্গবাজারের জনপ্রিয়তার বড় কারণ হলো গার্মেন্টসের 'এক্সপোর্ট সারপ্লাস' বা 'রপ্তানির জন্য তৈরি হলেও বিদেশি ক্রেতার কাছে বিক্রি না হওয়া' পণ্য। আরেকটু খুলে এভাবে বলা যায়, এগুলো হলো সেইসব অতিরিক্ত পণ্য, যেগুলো আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য কোনো কারখানায় তৈরি করা হলেও বিদেশে পাঠানো হয়নি। অনেক সময় মূল অর্ডারের চেয়ে কিছুটা বেশি তৈরি করা হলে অথবা ক্রেতা প্রতিষ্ঠান অর্ডার বাতিল করলে বা সামান্য ত্রুটির কারণে কিছু পণ্য রিজেক্ট হলে এই উদ্বৃত্ত পণ্যগুলো থেকে যায়।

ব্যবসায়ী মো. সজীব ২০০০ সাল থেকে এই বাজারে ব্যবসা করছেন। ২৫ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন, কেন মানুষ বারবার বঙ্গবাজারে ফিরত।

"গার্মেন্টসের অনেক ভালো মালও বাইয়াররা নিত না। হয়তো সামান্য একটা স্পট আছে, একটু সুতা বের হয়ে আছে, কিংবা ডিজাইনে সামান্য সমস্যা। ওই মালগুলো আমরা কম দামে কিনে আনতাম। কাপড়, মেকিং, কোয়ালিটি সবই ভালো থাকত বলে এগুলার চাহিদা ছিল প্রচুর," বলেন তিনি।

সজীবসহ বাকি ব্যবসায়ীদের মতে, এই পণ্যই ছিল বঙ্গবাজারের বিশেষ আকর্ষণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী মানুষ, সবাই কম দামে ভালো পোশাকের খোঁজে এখানে আসতো। একসময় ৭০-৮০ টাকায় শার্ট, ১২০-১৫০ টাকায় প্যান্ট পাওয়া যেত। ১০-১৫ বছর আগেও ২০০-২৫০ টাকার মধ্যে এক্সপোর্টের জিন্স কিনেছে ক্রেতারা। 

কথা হলো এমনই এক ক্রেতা মেহেদি হাসান এর সাথে। দুপুরের কড়া রোদ মাথায় নিয়ে তিনি এসেছেন কেনাকাটারর উদ্দেশ্যে। তবে আগের দোকানগুলো এক জায়গায় না পেয়ে হতাশ তিনিও।  বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন প্রায়ই এখানে আসা হতো তার। বিশেষ করে তার আকর্ষণের জায়গা ছিল জিন্সের প্যান্ট। 

মেহেদি বলেন, "১০ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম। ওই সময় ৫০০ টাকায় কিছু কেনা মানে অনেক খরচ। কিছু না ভেবে সোজা এখানে আসতাম, ২০০ টাকায় প্যান্ট নিতাম। যদিও প্রচুর দামাদামি করার পর হতো সেটা। দামাদামি করতে পারলে কম দামে ভালো কোয়ালিটির জিনিস পাওয়া যেতো।"

এখন একই ধরনের পণ্যের দাম ৪০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। তবে দাম বাড়ার চেয়েও বড় পরিবর্তন এসেছে বাজারের অস্তিত্বেই।

দুই বন্ধু রাকিব এবং আবদূর রহমান এসেছেন 'অরিজিনাল' ক্লাব জার্সির খোঁজে। তারা অবশ্য এই বাজারের নতুন ক্রেতা। অন্য বন্ধুদের পরামর্শেই এখানে আসা। "শুনসি এখানে অন্য মার্কেটের চেয়ে কম দামে জার্সি পাওয়া যায়। এখন দোকানে দোকানে সেটাই খুঁজতেছি," বললেন আবদূর রহমান।

ছিল তরুণদের ফ্যাশনেরও বড় ঠিকানা

শুধু ব্যবসা নয়, একসময় এই বাজার ছিল তরুণদের ফ্যাশনেরও বড় ঠিকানা। মাইকেল জ্যাকসন, টম ক্রুজ, উইল স্মিথ কিংবা আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের পোশাক দেখে তরুণদের মধ্যে তৈরি হতো নতুন ধরনের ফ্যাশন-আগ্রহ। সেই চাহিদার বড় অংশ মেটাত বঙ্গবাজার। 

গলির ভেতর গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরেও ক্লান্ত হতেন না তরুণেরা। কারণ এক দোকানে না মিললেও অন্য দোকানে পছন্দের পোশাক যে মিলবে তা নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন তারা। পুরোনো ফ্যাশন, নতুন ডিজাইন সবকিছুই পাওয়া যেতো এই এক বাজারে।

স্টেশন থেকে বিপণীকেন্দ্র

বঙ্গবাজারের শুরু অবশ্য পোশাক দিয়ে নয়। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। ঢাকার ফুলবাড়িয়া স্টেশনের পাশ ঘিরে গড়ে উঠতে থাকে একটি অস্থায়ী বাজার। সেখানে হকাররা মুখরোচক খাবার, পানীয়, শোপিস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্য বিক্রি করতেন। স্টেশনে যাত্রীদের আনাগোনা থাকায় হকারদের জন্য জায়গাটি ছিল ব্যবসার উপযুক্ত। 

তবে পরে ফুলবাড়িয়া স্টেশন সরে গেলেও জায়গাটির গুরুত্ব থেকে যায় আগের মতই। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের সংযোগস্থল হওয়ায় ব্যবসায়ীরাও থেকে যান। অনেকেই অস্থায়ী টিনশেড তুলে স্থায়ীভাবে দোকান বসিয়ে দেন। বৈধ কিংবা অবৈধ, সেই টিনশেড ছাপড়া দোকানগুলোই ধীরে ধীরে বাড়তে  থাকে। একসময় ক্রেতাদের কাছেও জায়গাটি হয়ে ওঠে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

১৯৭৫ সাল। অস্থায়ী ও টিনশেড কাঠামো সরিয়ে একটি পাকা বাজার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয় ঢাকা পৌরসভা। সে সময়ে জায়গার মালিকানা নিয়ে রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পৌরসভার জটিলতাও ছিল। পরে অবশ্য ইজারার ভিত্তিতে ব্যবসায়ীরা দোকান পরিচালনার সুযোগ পান। 

১৯৮৫ সালে জায়গাটির মালিকানা পায় সিটি কর্পোরেশন। পরে তাদের হাত ধরেই পরিকল্পিত বিপণীকেন্দ্র নির্মাণের পথ তৈরি হয়।

এরপর আশির দশকের শেষ দিকে পাকা মার্কেট গড়ে ওঠে। নব্বইয়ের দশকে বঙ্গবাজার পরিণত হয় তৈরি পোশাকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আশপাশের আরও কয়েকটি মার্কেট।

বর্তমানে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে নূরজাহান মার্কেট 

মামুন বলেন, "আগে রমজানে এক দিনে দেড় লাখ টাকার মতো কেনাবেচা হতো। রোজার ঈদ, কোরবানির ঈদ ও শীতের মৌসুমে বিক্রি বাড়ত কয়েকগুণ। তখন মার্কেটের ভেতর হাঁটার জায়গাও পাওয়া যেত না।"

এখন সেই ভিড় নেই। বিদেশি ক্রেতাদেরও আগের মতো দেখা যায় না। এক দুজন এসে পরিচিত দোকানের ঠিকানা না পেয়ে ফিরে যান। "এখন তো মার্কেটই নাই। একজন-দুইজন আসে, পরিচিত দোকান বাইর করে। অনেকেই না পাইয়া চইলা যায়," বলেন আব্দুল মালেক।

তবে বঙ্গবাজারের বিকল্প হিসেবে তরুণদের কাছে জায়গা করে নিয়েছে নিউমার্কেট সংলগ্ন নূরজাহান মার্কেট। এমনটাই জানালেন, শাকিল হোসেন। তিনি যখন মেডিকেলের ছাত্র ছিলেন তখন বঙ্গবাজার থেকেই সারতেন যাবতীয় কেনাকাটা। কিন্তু এখন আর যাননা ওদিকে। বলেলন, "এখন তো নূরজাহান মার্কেটেই সব পাওয়া যায়, তাহলে এত দূরে কেন যাব?"

পশ্চিমা ধাঁচের পোশাকের জন্য বর্তমানে সারাদেশেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে নূরজাহান সুপার মার্কেটের নাম। এমনকি দেশের বাইরে থেকে আসা পর্যটকদের পছন্দের কেনাকাটার জন্যও অন্যতম আকর্ষণ এখন এই মার্কেট। কাজের সূত্রে বা ঘুরতে আসা ভিনদেশি নাগরিকেরা নূরজাহান মার্কেট থেকে খুঁজে নেন তাদের পছন্দসই পোশাক। কেউ কেউ আবার নিজের দেশের হোলসেল মার্কেটের জন্য পাইকারি দরেও কিনে নিয়ে যান এখানকার পণ্য। বঙ্গবাজারের মতো দোভাষীদের সাহায্যে এখানেও বেচাকেনা চলে।  

প্রায় ১৫ বছর যাবত এই মার্কেটে গার্মেন্টসের কাপড়ের ব্যবসা করছেন সেন্টু। আগে বঙ্গবাজার মার্কেটে কাজ করতেন দোভাষী হিসেবে। বঙ্গবাজার যখন রমরমা চলছে, তখন দোভাষীদের আয় ছিল ভালো। পাঁচটি ভাষায় দক্ষতা থাকায় বিদেশিদের কাছে সেন্টুর চাহিদাও ছিল ভালো। ফলে দৈনিক আয়ও ভালো আসত। সেই পুঁজি থেকেই নিজে ব্যবসা খোলেন নূরজাহান মার্কেটে। 

তিনি বলেন, "আসলে আগে যা বঙ্গবাজারে দেখতাম, এখন এখানে তা-ই হয়। বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশি এক্সপোর্ট মালের চাহিদা এখনও আছে। শুধু জায়গা বদলেছে। পরপর আগুন এবং বঙ্গবাজারের নির্মাণ কাজ চালায় ক্রেতারা ওদিকমুখী হতে চায়না। এখানে আসে। আমরা বরং ওদের থেকেই বেশিরভাগ মাল নিয়ে এসে এখানে বিক্রি করি।"

বঙ্গবাজারে প্রথম আগুন লাগে ১৯৯৫ সালে। আর নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতেই বঙ্গবাজার থেকে ব্যবসায়ীরা এসে নূরজাহান মার্কেটে কয়েকটা দোকান দেয়। ধীরে ধীরে ভালো কোয়ালিটির এক্সপোর্ট আইটেমও আসতে শুরু করে। বর্তমানে স্থানীয় কারখানায় বানানো পোশাক বা 'ফ্রেশ অর্ডার' এর আধিপত্যও আছে মার্কেটজুড়ে। এগুলো মূলত সংগ্রহ করা হয় বঙ্গবাজার থেকেই। 

বঙ্গবাজারের মতোই কম দামে ভালো পণ্য পাওয়ায় ক্রেতাদেরও ভরসা বাড়তে থাকে। এভাবেই নূরজাহান মার্কেটের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। বর্তমানে চারতলা ভবনের প্রথম, দ্বিতীয় আর তৃতীয় তলায় দোকান আছে প্রায় ৫৬০টি।

চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে

সম্প্রতি ২০২৩ সালে আগুনে বঙ্গবাজার পুড়ে যাওয়ার পর সবচেয়ে বাজে প্রভাব পড়ে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর। এদের অনেকের পক্ষে অন্য কোনো মার্কেটের বেশি ভাড়ায় দোকান চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। আগে ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে দোকান ভাড়া পাওয়া গেলেও অন্য মার্কেটগুলোয় সেটি বেড়ে হয় ২০, ৪০ ৬০ হাজারে। ফলে কেউ কেউ ব্যবসা ধরে রাখতে বেছে নিয়েছেন অনলাইন মাধ্যম। 

ফেসবুকে পেইজ খুলে, অনলাইন অর্ডার আর বাসা থেকে পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন তারা। সজীব বলেন, "আগুনের পর আমাদের এভাবে আলাদা হয়ে যাওয়া–এইটা একটা বড় লস।" 

অথচ একসময় বরিশাল, ভালুকা, ময়মনসিংহ থেকে দল বেঁধে তরুণ ছেলেরা বঙ্গবাজারে আসতেন। ৮-১০ জনের দল করে এসে কম দামে পোশাক কিনে নিয়ে যেতেন। এখন সেটিও দেখা যায় না বলে জানালেন সজীব।

২০২৩ সালের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে ১০৬ কাঠা জমির ওপর নির্মিত হচ্ছে ১০ তলা ভবনের নতুন মার্কেট। যার নাম রাখা হয়েছে 'বঙ্গবাজার পাইকারি নগর বিপণীবিতান'। 

সজীব বলেন, আগে ১০-১৫ হাজার টাকার মধ্যে দোকান ভাড়া দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের ছিল। নতুন ভবনে সেই ভাড়া কত দাঁড়াবে, সেটিও এখন ভাববার বিষয়। আবার যারা আগুনে পুঁজি হারিয়ে ধার করে ব্যবসায় ফিরতে চাইছেন, তাদের জন্য বাড়তি ভাড়া কতটা সামলানো সম্ভব হবে, সেটি নিয়েও উদ্বেগ আছে অনেক ব্যবসায়ীর। 

এছাড়া বলা হচ্ছে, ১.৭৯ একর জায়গার ওপর নির্মিত হতে যাওয়া বহুতল ভবনে থাকবে তিন হাজার ৪২টি দোকান। প্রতিটি দোকানের আয়তন হবে ৮০-১০০ স্কয়ার ফুট। ভবনটিতে থাকবে আটটি লিফট, এর মধ্যে চারটি থাকবে ক্রেতা-বিক্রেতাদের জন্য। আর বাকি চারটি কার্গো লিফট থাকবে মালামাল ওঠা-নামানোর জন্য। 

ইতোমধ্যে মার্কেটের ২ হাজার ৯৬১ জন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে দোকান বরাদ্দ পেয়েছেন। তবে বরাদ্দের টাকা কিস্তিতে শোধ করতে গিয়েও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। 

বঙ্গবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মালিক সমিতির সাথে কথা বলতে চাইলেও অপরপক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবুও সিটি কর্পোরেশনের অধীনে গড়ে ওঠা নতুন ভবন ঘিরে আশার আলো দেখছেন অনেকে। নির্মাণাধীন ভবনটি শেষ হলে সেখানে আবার ব্যবসা শুরু করার স্বপ্ন দেখছেন পুরোনো ব্যবসায়ীরা।


ছবি: মেহেদি হাসান 

 

Related Topics

টপ নিউজ

বঙ্গবাজার / বঙ্গবাজার অগ্নিকাণ্ড / বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স

Comments

While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.

MOST VIEWED

  • ছবি: রয়টার্স
    অতীত অভিজ্ঞতা ভালো নয়: বিদেশি উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান নেপালের, চায় অর্থ সহায়তা
  • বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  ছবি: এএফপি
    তারেক রহমানকে কেন দিল্লিতে চায় ভারত
  • মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
    আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ ট্রাম্প প্রশাসনের
  • ছবি: রয়টার্স
    তিব্বত সীমান্তে কৃত্রিম হ্রদের বাঁধ ভেঙে দ্বিতীয় দফা বন্যা, নেপাল ও চীনে উদ্ধার অভিযান স্থগিত
  • কানাডার মন্ট্রিয়লের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ জন গবেষক যোগ দিয়েছেন। ছবি: নাসুনা স্টুয়ার্ট-উলিন/দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
    যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮ শীর্ষ গবেষক পাড়ি জমালেন কানাডায়
  • ছবি: টিবিএস
    ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে এক বছরে ৪,০০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য সরকারের

Related News

  • বঙ্গবাজার পোড়ানোর ঘটনায় সাবেক মেয়র তাপসসহ ৩০ জনের নামে মামলা
  • পুড়ে ছাই হওয়া বঙ্গবাজারের নতুন মার্কেট ঘিরে আশায় বুক বাঁধছেন দোকান মালিকরা
  • অগ্নিকাণ্ডের বছরঘুরে এলেও ঈদে ব্যবসা জমেনি বঙ্গবাজারে
  • মার্কেট নির্মাণের আগ পর্যন্ত তাঁবু টাঙিয়ে ব্যবসা করতে চান বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীরা
  • বঙ্গবাজার: ‘৭ লাখ টাকার ঋণ কীভাবে শোধ করবো, সংসার চালাবো কীভাবে?’

Most Read

1
ছবি: রয়টার্স
আন্তর্জাতিক

অতীত অভিজ্ঞতা ভালো নয়: বিদেশি উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান নেপালের, চায় অর্থ সহায়তা

2
বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  ছবি: এএফপি
বাংলাদেশ

তারেক রহমানকে কেন দিল্লিতে চায় ভারত

3
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ ট্রাম্প প্রশাসনের

4
ছবি: রয়টার্স
আন্তর্জাতিক

তিব্বত সীমান্তে কৃত্রিম হ্রদের বাঁধ ভেঙে দ্বিতীয় দফা বন্যা, নেপাল ও চীনে উদ্ধার অভিযান স্থগিত

5
কানাডার মন্ট্রিয়লের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ জন গবেষক যোগ দিয়েছেন। ছবি: নাসুনা স্টুয়ার্ট-উলিন/দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮ শীর্ষ গবেষক পাড়ি জমালেন কানাডায়

6
ছবি: টিবিএস
বাংলাদেশ

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে এক বছরে ৪,০০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য সরকারের

The Business Standard
Top

Contact Us

The Business Standard

Main Office -4/A, Eskaton Garden, Dhaka- 1000

Phone: +8801847 416158 - 59

Send Opinion articles to - oped.tbs@gmail.com

For advertisement- sales@tbsnews.net

Copyright © 2022 THE BUSINESS STANDARD All rights reserved. Technical Partner: RSI Lab