Skip to main content
  • অর্থনীতি
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলা
  • বিনোদন
  • ফিচার
  • ইজেল
  • মতামত
  • অফবিট
  • সারাদেশ
  • কর্পোরেট
  • চাকরি
  • প্রবাস
  • English
The Business Standard বাংলা

ফরাশগঞ্জ: ঢাকার প্রথম ‘অফিস পাড়া’র খোঁজে

ঢাকা কেন্দ্রের বর্ণনা অনুযায়ী, ঢাকায় বসবাসকারী ফরাসিদের স্মৃতিচিহ্ন বহনকারী স্থানের নাম ফরাশগঞ্জ। ১৬৮২ সালে ফরাসি নৌবহর ঢাকায় আসে। পরে ঢাকায় ফরাসি বাণিজ্যকুঠি স্থাপিত হয়। নওয়াজিশ মোহাম্মদ খান (১৭৪০-১৭৫৪) ঢাকার নায়েব নাজিম থাকাকালে ১৭৪০ সালে তার অনুমতি নিয়ে বুড়িগঙ্গার তীরে তারা যে বাজার স্থাপন করেছিল, সেটিই বর্তমানের ফরাশগঞ্জ।
ফরাশগঞ্জ: ঢাকার প্রথম ‘অফিস পাড়া’র খোঁজে

ফিচার

সালেহ শফিক
19 July, 2026, 11:00 pm
Last modified: 19 July, 2026, 11:00 pm

Related News

  • ঢাকার ৪১৬ বছর উদযাপনে ব্যাংকগুলোর কাছে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত স্পন্সর চায় ডিএসসিসি
  • চালু হলো ‘হ্যালো ডিসি’ অ্যাপ, এক ক্লিকেই মিলবে জেলা প্রশাসনের সেবা
  • ঢাকা-সিলেট রুটে বিরতিহীন ‘টাঙ্গুয়ার এক্সপ্রেস’ ট্রেন চালুর অনুমোদন, ঢাকা-কুড়িগ্রাম রুটেও আসছে নতুন ট্রেন
  • মেট্রোরেলের নিরাপত্তা অডিটে কাঠামোগত ত্রুটি, অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি চিহ্নিত
  • ঢাকার কাছে ‘সেকেন্ডারি সিটি’ গড়ার লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করেছে সরকার: গৃহায়ণমন্ত্রী

ফরাশগঞ্জ: ঢাকার প্রথম ‘অফিস পাড়া’র খোঁজে

ঢাকা কেন্দ্রের বর্ণনা অনুযায়ী, ঢাকায় বসবাসকারী ফরাসিদের স্মৃতিচিহ্ন বহনকারী স্থানের নাম ফরাশগঞ্জ। ১৬৮২ সালে ফরাসি নৌবহর ঢাকায় আসে। পরে ঢাকায় ফরাসি বাণিজ্যকুঠি স্থাপিত হয়। নওয়াজিশ মোহাম্মদ খান (১৭৪০-১৭৫৪) ঢাকার নায়েব নাজিম থাকাকালে ১৭৪০ সালে তার অনুমতি নিয়ে বুড়িগঙ্গার তীরে তারা যে বাজার স্থাপন করেছিল, সেটিই বর্তমানের ফরাশগঞ্জ।
সালেহ শফিক
19 July, 2026, 11:00 pm
Last modified: 19 July, 2026, 11:00 pm

মতিঝিল হওয়ার আগে ঢাকার অফিস পাড়া কোনটি ছিল? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাই ঢাকার শেষ সর্দার মাওলা বখশের ছেলে আজিম বখশের কাছে। ১৯৪৭ সালে আজিম বখশের জন্ম, তাই পাকিস্তান আমলে ঢাকার বেড়ে ওঠা তিনি দেখেছেন। ঢাকার স্মৃতি ধরে রাখতে ১৯৯৭ সালে আজিম বখশ 'ঢাকা কেন্দ্র' প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকা কেন্দ্রের লাইব্রেরিতে ঢাকা বিষয়ক প্রায় সব বই রয়েছে। সংলগ্ন প্রদর্শনশালায় পুরোনো ঢাকার নিদর্শন রয়েছে সহস্রাধিক। তাই ঢাকার প্রথম অফিস পাড়া বিষয়ে জানতে আজিম বখশের কথাই মনে পড়ল বেশি।

সময়টা তিরিশের দশক

'দেশভাগের আগ পর্যন্ত ঢাকার বিস্তৃতি ঘটেছিল বুড়িগঙ্গা নদীর সমান্তরালে। পশ্চিমে হাজারীবাগ থেকে পূর্ব দিকে পোস্তগোলা। উত্তরে ঢাকার বিস্তৃতি ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশন পর্যন্ত ধরে নেওয়া গেলেও বসতি নিরবচ্ছিন্ন ছিল না। পশ্চিম দিকে চকবাজার, ইমামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, পোস্তা, লালবাগ জমে উঠেছিল মুঘল আমলে। পূর্ব দিকে বাদামতলী হয়ে নবাববাড়ি, ফরাশগঞ্জ, গেন্ডারিয়া, মিলব্যারাক জমে ওঠে ব্রিটিশ আমলে। ফরাশগঞ্জ ছিল শহরের মধ্যবর্তী স্থান। এর প্রধান সড়ক ফরাশগঞ্জ রোড ও বি কে দাশ রোড তিরিশের দশকে গড়ে উঠেছিল ঢাকার অফিস পাড়া হিসেবে।'—বলছিলেন আজিম বখশ।

তিনি যোগ করলেন, 'তিরিশের দশকের আগে আসলে অফিস ঘরের প্রয়োজন পড়েনি। কারণ হিসাবের খাতা খোলা, ফাইলে সেগুলো গুছিয়ে রাখার প্রয়োজন দেখা দেয় সে সময়। মার্কেটিং ডিপার্টমেন্ট, বিজ্ঞাপন সেকশন, প্রশাসনিক বিভাগেরও খোঁজ পড়ে; কারণ ফার্মাসিউটিক্যালস, গার্মেন্টস, তেল বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান আর কোল্ড স্টোরেজের মতো প্রতিষ্ঠান এ সময়ে বৃহদাকারে গড়ে উঠেছিল। এ সময়েই বিভিন্ন কাঁচামাল একসঙ্গে করে একটি নির্দিষ্ট পণ্য উৎপাদনের কারখানা গড়ে উঠতে দেখা যায়। একালের মতিঝিলের মতো তখনো কারখানা যেখানেই হোক, অফিস হতো ফরাশগঞ্জে।'

এ পর্যায়ে আজিম বখশের কাছে জানতে চাইলাম, 'ফরাশগঞ্জকে কি আমরা ঢাকার প্রথম অফিস পাড়া বলতে পারি?' তিনি উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ অবশ্যই। কারখানা ছিল ঢাকার আশপাশে, পাইকারি বাজার ছিল চকবাজার বা মৌলভীবাজার এবং ফরাশগঞ্জ হয়ে উঠেছিল অফিস পাড়া।'

আজকের ফরাশগঞ্জের সাথে একসময় ঢাকার শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির অফিস থাকা এলাকাটির সাদৃশ্য প্রায় নেই বললেই চলে। ছবি: সৈয়দ জাকির হোসেন

তিনি যোগ করলেন, 'তিরিশের দশক এমন একটি সময়, যখন স্বদেশি আন্দোলনের অনুষঙ্গ হিসেবে বেশ কিছু দেশি কল-কারখানা গড়ে উঠেছিল; জমিদার পরিণত হয়েছিলেন বণিকে, প্রতিষ্ঠা করেছিলেন স্কুল-কলেজ। তাই অফিসের জন্য প্রয়োজনীয় লোকবলও পাওয়া গিয়েছিল। নদী তীরবর্তী ও শহরের মধ্যবর্তী স্থান বলে ফরাশগঞ্জ অফিস পাড়া হিসেবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠেছিল। তার ওপর ছিল ইউরোপীয় ঐতিহ্য। তিরিশের দশকে সূচনা হলেও এর বিস্তৃতি ঘটেছিল মূলত দেশভাগের পর আর টিকে ছিল মতিঝিল গড়ে ওঠার আগ পর্যন্ত।'

ফরাসি বাজার

ফরাশগঞ্জে আজিম বখশদের বাড়ি। তার আশি বছর বয়সের অধিকাংশ স্মৃতি ফরাশগঞ্জ ঘিরে। তাকে নিয়ে ঢাকার প্রথম অফিস পাড়াটি ঘুরে দেখার আগে স্থানটির অতীত ইতিহাস অল্প মনে করা যাক।

ফরাশগঞ্জ শব্দটির সঙ্গে ফরাসিদের যোগ রয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রের বর্ণনা অনুযায়ী, ঢাকায় বসবাসকারী ফরাসিদের স্মৃতিচিহ্ন বহনকারী স্থানের নাম ফরাশগঞ্জ। ১৬৮২ সালে ফরাসি নৌবহর ঢাকায় আসে। পরে ঢাকায় ফরাসি বাণিজ্যকুঠি স্থাপিত হয়। নওয়াজিশ মোহাম্মদ খান (১৭৪০-১৭৫৪) ঢাকার নায়েব নাজিম থাকাকালে ১৭৪০ সালে তার অনুমতি নিয়ে বুড়িগঙ্গার তীরে তারা যে বাজার স্থাপন করেছিল, সেটিই বর্তমানের ফরাশগঞ্জ। বাজারটি আর্মেনীয় ব্যবসায়ী পোগোজ সাহেব ইজারা নিয়েছিলেন। ফরাশগঞ্জে ফরাসি ব্যবসায়ীরা মসলার পাইকারি আড়ত গড়ে তোলে। তারা এখান থেকেই ঢাকার মসলিন বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করত।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফরাশগঞ্জের শান-শওকত ক্রমেই বেড়েছে। ফরাসিদের পাশাপাশি এখানে পর্তুগিজ, ইংরেজ ও আর্মেনীয়দের বসতি গড়ে উঠেছিল। সেকালে বুড়িগঙ্গার উত্তর তীরের আজকের বাদামতলী থেকে মিলব্যারাক পর্যন্ত ইউরোপীয়দের আনাগোনাই বেশি ছিল। তারপর উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে হিন্দু জমিদাররা এখানে বসতবাড়ি গড়ে তুলতে শুরু করেন। এগুলোর মধ্যে রূপলাল হাউজ সুবিখ্যাত। শুরুতে এটি পরিচিত ছিল আরাতুন হাউজ নামে। ১৮২৫ সালে আর্মেনীয় ব্যবসায়ী স্টিফেন আরাতুন এটি নির্মাণ করিয়েছিলেন। তারপর ১৮৪০ সালে ব্যবসায়ী রূপলাল ও তাঁর ভাই রঘুনাথ দাস বাড়িটি কিনে নিয়ে কলকাতার মার্টিন কোম্পানিকে দিয়ে পুনরায় নির্মাণ করান। ১৮৮৬ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের সম্মানে রূপলাল হাউজে বল নাচের আয়োজন করা হয়েছিল।

ফরাশগঞ্জের নামকরা স্থাপনা

ফরাশগঞ্জের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নর্থব্রুক হল। ১৮৭২ থেকে ১৮৭৬ সাল পর্যন্ত ভারতের ভাইসরয় ছিলেন লর্ড নর্থব্রুক। তার ঢাকায় আগমনকে স্মরণীয় করে রাখতে ঢাকার জমিদার ও স্বচ্ছল ব্যক্তিরা ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা অনুদান দিয়ে একটি টাউন হল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার নাম রাখা হয় নর্থব্রুক হল। ১৮৮০ সালে এর দ্বার উন্মোচন করা হয়। ১৮৮২ সালে হলটির দক্ষিণ-পূর্ব কোণে নর্থব্রুক পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে ত্রিপুরার মহারাজা ১০০০ টাকা, বালিয়াটির জমিদার ব্রজেন্দ্র কুমার ১০০০ টাকা এবং রানি স্বর্ণময়ী ৭০০ টাকা অনুদান দিয়েছিলেন। এক হাজার বই নিয়ে লাইব্রেরিটির দ্বার উন্মোচিত হয় ১৮৮৭ সালে। স্থাপনাটি লাল রঙের হওয়ায় সাধারণ্যে এটি 'লালকুঠি' নামে পরিচিত।

ফরাশগঞ্জের আরও সব স্থাপনার মধ্যে মঙ্গলালয়, বড় বাড়ি, বসন্ত ভিলা ও বিবি কা রওজা উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে বিবি কা রওজা দেশের সবচেয়ে পুরোনো ইমামবাড়া। এর প্রতিষ্ঠা সতেরো শতকের গোড়ার দিকে। যদিও এটি আর আগের চেহারায় নেই, তবে এখনো মহররমে এখানে হাজারো লোক ভিড় করেন এবং বর্ণাঢ্য তাজিয়া মিছিল নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করেন।

বি কে দাশ রোডের ৪৭ নম্বর বাড়িটির নাম লক্ষ্মীভিলা। যার নামে রাস্তাটির নাম, সেই বসন্তকুমারের বাড়ি এটি। ১৯১৮ সালে বাড়িটি নির্মিত হয়। বসন্ত কুমার ছিলেন বরিশালের লোক। তিনি যৌবনে ঢাকায় আসেন এবং ভবন নির্মাণ উপকরণের ব্যবসা করে প্রচুর ধনসম্পত্তির মালিক হন।

জমিদার আশুতোষ দাশের মঙ্গলালয়ও ফরাশগঞ্জের একটি উল্লেখযোগ্য বাড়ি। এর সামনের দিকের সমৃদ্ধ কারুকাজ দর্শককে আকৃষ্ট করে। বাড়িটি নির্মিত হয় ১৯১৫ সালে।

লালকুঠিতে ছিল রাজস্ব অফিস, পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফ অফিস ইত্যাদি। ছবি: সৈয়দ জাকির হোসেন

নর্থব্রুক হলে রাজস্ব অফিস

আজিম বখশ স্মৃতির পাতা খুলে যাত্রা শুরু করলেন নর্থব্রুক হল থেকে। 'মজার ব্যাপার হলো, নর্থব্রুক যে গেট দিয়ে ঢুকেছিলেন সেটি নর্থব্রুক রোডে পড়েছে, আর পুব দিকের দ্বিতীয় গেটটি থেকে শুরু হয় ফরাশগঞ্জ রোড। দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গে সরকারি অফিস করার মতো স্থাপনা বেশি ছিল না। লালকুঠিতে তাই রাজস্ব অফিস হলো। পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফ অফিসও হয়েছিল এখানে। সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজও ছিল। তবে কোনোটিই হলঘরে নয়। হলঘরের সামনে ও দুই ধারে ছিল বড় বড় বাগান। পরে সেখানে টিনশেড দিয়ে বিভিন্ন অফিস হয়েছে'—বলছিলেন আজিম বখশ।

নর্থব্রুক হলের দক্ষিণ দিকের জনসন ক্লাবে বিলিয়ার্ড বোর্ড ছিল। হিন্দু অভিজাতরা সেখানে বিলিয়ার্ড খেলতেন। শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়ের শ্বশুরকে এখানে বিলিয়ার্ড খেলতে দেখেছেন আজিম বখশ। নর্থব্রুক হলের লাইব্রেরিতে অমূল্য সব বইয়ের সংগ্রহ ছিল। ১৯২৬ সালে নর্থব্রুক হলে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

নর্থব্রুক হলের উল্টোদিকের বাড়িটি ছিল বিশ্বখ্যাত সাঁতারু ব্রজেন দাশদের। তাদের ছিল চুন-সিমেন্টের ব্যবসা। নাম ছিল 'পাকিস্তান সিমেন্ট অ্যান্ড লাইম কোম্পানি'।

রূপলাল হাউজে টার্নার গ্রাহাম, জেমস ফিনলে

রূপলাল হাউজের আগের বাড়িটিতে ছিল তেল বিক্রেতা এসো (Esso) কোম্পানির অফিস। তারা মূলত পেট্রোলিয়াম বিক্রি করত। রূপলাল হাউজে কয়েকটি অফিস ছিল। তার মধ্যে টার্নার গ্রাহাম কোম্পানি, ইন্ডিয়ান ইনসিওরেন্স ও জেমস ফিনলের কথা মনে পড়ল আজিম বখশের। তিনি বললেন, বাড়িটি হাতবদল হয় দেশভাগের অনেক পরে। রূপলালের প্রতিনিধিরা থাকতেন বাড়িটিতে। তাদের নায়েবের এক ছেলে আমাদের সমবয়সী ছিল, জুবিলী স্কুলে পড়ত। জুবিলী স্কুলের পেছনে আগাখানীদের জামায়াতখানা ছিল। তাদের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল ছিল রূপলাল হাউজে। প্রিন্স করিম আগা খান দুই-তিন বছর পর পর জামায়াতখানায় আসতেন এবং স্কুল পরিদর্শন করতেন।

রূপলাল হাউজের উল্টোদিকে ছিল একটি আস্তাবল। সম্ভবত সেটি ছিল রূপলালদেরই। পরে সেখানে নিলামঘর হয়। এটি শুরু করেছিলেন কোনো এক ব্রিটিশ, পরে তার মালিকানা নেন এক অবাঙালি। বিচিত্র ও দুষ্প্রাপ্য সব অ্যান্টিক নিলাম হতো এখানে। নিলামঘরের পাশ দিয়ে চামারটুলির দিকে চলে গেছে মাওলা বখশ সর্দার রোড। ঢোকার মুখে ঢাকা হিন্দু এতিমখানা। এটি আগে ছিল ঢাকেশ্বরী মন্দিরের কাছের অরফানেজ রোডে। কিন্তু প্রায়ই সেখানে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা বাঁধত, তাই ফরাশগঞ্জের সম্ভ্রান্ত বণিক রেবতী মোহন দাশ নবাব সলিমুল্লাহকে অনুরোধ করে এতিমখানাটি সরিয়ে এনেছিলেন।

অ্যালবার্ট ডেভিড, পাক বে ও প্যারাডাইস বুক ডিপো

রূপলাল হাউজের উল্টোদিকে ওষুধ কোম্পানি অ্যালবার্ট ডেভিডের অফিসও ছিল। তাদের কারখানা ছিল গেন্ডারিয়ায়; এখনো ওষুধ কোম্পানিটি তার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তেজগাঁও শিল্প এলাকায় এখন তাদের কারখানা ও অফিস। ফরাশগঞ্জে অ্যালবার্ট ডেভিড কোম্পানির পাশের ভবনে ছিল পাক বে-র অফিস। তারা স্পিডবোট ও ইঞ্জিন আমদানি করত। এরপরের ভবনটি তারা বিল্ডিং নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গের এক চামড়া ব্যবসায়ীর অফিস ছিল তারা বিল্ডিংয়ে। তারপর ছিল একটি ইংরেজি বইয়ের লাইব্রেরি, যার নাম প্যারাডাইস বুক ডিপো। সুন্দর বাঁধাই করা ঝকঝকে ছাপার উঁচু মানের সব বই পাওয়া যেত এখানে। তারপর ছিল একটি কেরোসিন ডিপো; নওয়াব নামের এক অবাঙালি ছিলেন এর মালিক।

ফরাশগঞ্জ রোডের দুই পাশের ভবনগুলোতে ছিল টার্নার গ্রাহাম, জেমস ফিনলে, পাক বে, অ্যালবার্ট ডেভিড, স্পেন্সার অ্যান্ড কোম্পানির অফিস। ছবি: সৈয়দ জাকির হোসেন

নায়ক হারুনদের স্টিলমিলের অফিস

রূপলাল হাউজের গা ঘেঁষে রূপলালের ভাই রঘুনাথের বাড়িটি দেশভাগের পর নূরজাহান হাউজ নামে পরিচিতি লাভ করে। দেশভাগের আগে কলকাতায় এল মল্লিক অ্যান্ড সন্স নামে মুসলমান মালিকানার একটি দোকান ছিল। রেডিমেড গার্মেন্টসের জন্য দোকানটি বিখ্যাত। দেশভাগের পর এল মল্লিক পরিবার ঢাকায় চলে আসে এবং রঘুনাথ হাউজে বসতি গড়ে। গুলিস্তান সিনেমা হলের আগের ভবনটিতে (এখন ১ নম্বর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ) তারা নতুন করে ব্যবসা শুরু করে। মল্লিক পরিবারের বড় ছেলের স্ত্রীর নাম ছিল নূরজাহান, তার নামেই বাড়িটির নাম নতুন করে নূরজাহান হাউজ রাখা হয়। আজিম বখশ নূরজাহান বেগমকে দেখেছেন। তিনি অভিজাত, সুন্দরী ও সুবেশী ছিলেন। ঢাকা ক্লাবের সদস্য ছিলেন তিনি।

পাকিস্তান আমলের বিখ্যাত নায়ক হারুনদের বাড়ি ছিল নূরজাহান হাউজের উল্টোদিকে। তাদের স্টিলের ব্যবসা ছিল। তাদের কারখানা ছিল কাঁচপুরে, অফিস ছিল ফরাশগঞ্জের বাড়িতে। ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের চাঁদা তুলতে গিয়ে আজিম বখশ নায়ক হারুনকে কয়েকবার দেখেছেন।

রঘুনাথ হাউজের পরে ছিল জমিদার ব্রজগোপালের বাড়ি। ঝাঁকড়া চুলের মানুষটির জমিদারি ঠাট ছিল। তিনি সংস্কৃতিমনা ছিলেন। মঞ্চনাটক লিখতেন ও তাতে অভিনয় করতেন। তার লেখা 'মানুষ ও মেশিন' নাটকটি জনপ্রিয় হয়েছিল। মঞ্চস্থ করেছিলেন নিজের বাড়িতেই। ব্রজগোপালের বাড়ি ছাড়ালে পরে পাওয়া যায় নিত্যপণ্যের বাজার, যা শ্যামবাজার নামে পরিচিত। এখান থেকেই ফরাশগঞ্জ রোডের নামকরণ হয় বি কে দাশ রোড।

চিত্তরঞ্জন কটন মিলের অফিস

শ্যামবাজার গেটের উল্টোদিকে একটি গলি উত্তর দিকে চলে গেছে। গলিটির নাম মোহিনী মোহন দাস লেন। লেনের এক নম্বর বাড়িটিই ছিল জমিদার ও ব্যবসায়ী মোহিনী মোহনের। এ বাড়িতে স্বামী বিবেকানন্দ ১৯ দিন ছিলেন। পাকিস্তান আমলে এখানে চিত্তরঞ্জন কটন মিলের প্রধান কার্যালয় ছিল। পিতার কর্মস্থল সূত্রে ষাটের দশকে এ বাড়িতে কৈশোর কাটিয়েছেন আজিম বখশের সুহৃদ অমিতাভ চক্রবর্তী। স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছেন, 'আমার বাবার অফিসে অফিসার্স রিক্রেয়েশন ক্লাব ছিল এবং সেখানে প্রচুর ভালো বই ছিল। ক্লাবে তাস, ক্যারম, দাবা, ব্যাডমিন্টন ইত্যাদি খেলাধুলার ব্যবস্থা ছিল। অফিসের সামনে খোলা জায়গায় ব্যাডমিন্টনের কোর্ট কাটা ছিল। আমরা ছোটরা দিনে আর বড়রা রাতে খেলতেন। বাবার একজন সহকর্মী শ্যামবাবুদের আত্মীয় ছিলেন নৃত্যশিল্পী গওহর জামিল (গণেশ)। তিনি প্রায়ই এসে ব্যাডমিন্টন খেলতেন। বাবার অফিসে বেশ কয়েকজন নেপালি কর্মচারী ছিলেন। তারা মূলত ছিলেন গাড়িচালক, দারোয়ান, পিয়ন ইত্যাদি। খুবই বিশ্বস্ত ও কর্মদক্ষ লোক ছিলেন তারা।' দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ বাড়িতে গড়ে উঠেছিল প্রকাশনা সংস্থা পুঁথিঘর ও মুক্তধারার কার্যালয়।

তারপর ছিল এস কে দাস অ্যান্ড সন্সের মনোহারি দোকান। এরপরে ছিল কসমেটিকসের একটি গদিঘর, যার ক্যাশবাক্সে লেখা ছিল 'রূপায়নে তুহিন'। তারা কলকাতার কোনো কসমেটিকস কোম্পানির এজেন্ট ছিল। আরও এগিয়ে গিয়ে মঙ্গলালয়। তার আগের বাড়িটিতে ছবি বাঁধাইয়ের দোকান ছিল। আশুতোষ দাসের বাড়ি ছিল মঙ্গলালয়। রেবতী মোহন দাসের আত্মীয় ছিলেন তিনি। রেবতী মোহন ইট, সুরকি, বালি ও চুনের ব্যবসা করতেন। তার ব্রিক ফিল্ড ছিল। ইটের গায়ে 'আরএমডি' লেখা থাকত। সেকালে ইটের ব্যবসা ছিল খুবই লাভজনক আর সম্মানজনক। সিলেট থেকে বড় বড় নৌকায় চুন আনাতেন রেবতী মোহন। নৌকাগুলোতে টিকিধারী অবাঙালিরা মাঝি-মাল্লার কাজ করতেন।

স্পেন্সার অ্যান্ড কোম্পানি, বার্মা ইস্টার্ন, ইস্পাহানি

এরপর পাওয়া যেত এভারিডে ব্যাটারির অফিস, যার পাশে চারতলা ভবনের পুরোটায় ছিল মডার্ন ফার্নিশার্সের শোরুম। এই প্রতিষ্ঠান সরকারি দপ্তরেও আসবাব সরবরাহ করত। শোরুমটির উল্টোদিকে ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধা আজাদের (মাগফার আহমেদ চৌধুরী) বাড়ি। তিনি গেরিলা দল ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য ছিলেন। রমনা এলাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে গেরিলা দলটি বিস্ফোরণ ঘটানোর পর ২৯ আগস্ট ১৯৭১ সালে আজাদকে পাকবাহিনী গ্রেপ্তার করে এবং নৃশংসভাবে হত্যা করে। কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক তাকে প্রধান চরিত্র করে 'মা' নামের উপন্যাস লিখেছেন। এরপর ছিল স্পেন্সার অ্যান্ড কোম্পানির অফিস, যার উল্টোদিকে বার্মা ইস্টার্ন কোম্পানির অফিস ছিল। বিবি কা রওজার উল্টোদিকে ছিল ইস্পাহানি গ্রুপের গোডাউন। ব্রিটিশ আমলে এটি ছিল চুনের গুদাম। তারপর ছিল ল্যামারাস ফার্নিশার্সের শোরুম।

ফরাশগঞ্জকে ঢাকার ব্যবসায়িক প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা ভবনগুলোর মধ্যে রূপলাল ছিল হাউস অন্যতম। ছবি: সংগৃহীত

লক্ষ্মীভিলার মালিক বি কে দাসের ইটের ব্যবসা ছিল। তার ভাই যতীন দাসের মালিকানায় ছিল পুরো উল্টিনগঞ্জ। বড় বড় গোডাউন ছিল সেখানে। এরপরই বিহারিলাল জিউর মন্দির। শেষ হয় বি কে দাশ রোড তথা ঢাকার প্রথম অফিস পাড়া। আজিম বখশ বলছিলেন, 'ষাটের দশকে মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা গড়ে উঠতে থাকে। একটা করে নতুন ভবন হয় আর ফরাশগঞ্জ থেকে একটা করে অফিস সেখানে স্থানান্তর হয়। অফিস পাড়া উঠে গেলে ফরাশগঞ্জের খালি ভবনগুলোতে ফার্নিচারের শোরুম হয়। আদা-রসুন-হলুদের যেসব বড় বড় আড়ত এখন দেখা যায়, সেগুলোর প্রতিষ্ঠা দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে।'

নেই সেই ফরাশগঞ্জ

বিবি কা রওজার প্রতিষ্ঠা হিসাব করলে বোঝা যায়, ফরাশগঞ্জ এলাকার বয়স কমপক্ষে চারশ বছর। সতেরো শতকে মুর্শিদ কুলি খাঁ রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করলে ঢাকা জৌলুস হারায়; ফরাশগঞ্জ বরং ইউরোপীয়দের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। বুড়িগঙ্গা ফরাশগঞ্জকে সর্বদা প্রাণচঞ্চল রেখেছে। বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে ফরাশগঞ্জ গভীর রাতেও জেগে থাকত। এখন সেই বুড়িগঙ্গা নেই, ফরাশগঞ্জের সেই চাঞ্চল্যও হারিয়ে যেতে বসেছে। অফিস পাড়া হিসেবে মতিঝিলও আজ বিগতযৌবনা। এখনকার ফরাশগঞ্জ দেখে নতুন প্রজন্ম ভাবতেও পারবে না—এটাই ছিল ঢাকার প্রথম অফিস পাড়া।

Related Topics

টপ নিউজ

ফরাশগঞ্জ / ঢাকা / পুরান ঢাকা / বাণিজ্য / রুপলাল হাউস / অফিস / ইংরেজ / ফরাসি

Comments

While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.

MOST VIEWED

  • মাদ্রিদে স্পেনের উন্মুক্ত ছাদের বাসে বিজয় শোভাযাত্রার সময় আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে খোঁচা দিয়ে একটি প্ল্যাকার্ড হাতে লামিনে ইয়ামাল (ডানে)। ছবি: ইএসপিএন
    স্পেনের বিশ্বকাপজয় উদ্‌যাপনে আর্জেন্টিনাকে কটাক্ষ লামিনে ইয়ামালের
  • ছবি: সংগৃহীত
    জামায়াত এমপির অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ভাইরাল; এমপি বললেন ওই নারী দ্বিতীয় স্ত্রী
  • সংগৃহীত ছবি
    চালু হলো ‘হ্যালো ডিসি’ অ্যাপ, এক ক্লিকেই মিলবে জেলা প্রশাসনের সেবা
  • 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি)-র জনসমাগম। ছবি: এএনআই
    ভারতে প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদ করার পর শত শত তরুণের হোয়াটসঅ্যাপে পুলিশের নোটিশ
  • ইনফোগ্রাফিক: টিবিএস
    ১৭ অগ্রাধিকার প্রকল্পে ৩৯০ কোটি ডলার বৈদেশিক অর্থায়ন সংগ্রহের পরিকল্পনা সরকারের
  • স্পেনের ট্রফি উঁচিয়ে ধরার সময়ও মঞ্চে অবস্থান করতে চান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: হেক্টর ভিভাস
    স্পেনের বিশ্বকাপ উদ্‌যাপনের ছবি থেকে ট্রাম্পকে 'ক্রপ' করে বাদ দিয়েছে ফিফা

Related News

  • ঢাকার ৪১৬ বছর উদযাপনে ব্যাংকগুলোর কাছে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত স্পন্সর চায় ডিএসসিসি
  • চালু হলো ‘হ্যালো ডিসি’ অ্যাপ, এক ক্লিকেই মিলবে জেলা প্রশাসনের সেবা
  • ঢাকা-সিলেট রুটে বিরতিহীন ‘টাঙ্গুয়ার এক্সপ্রেস’ ট্রেন চালুর অনুমোদন, ঢাকা-কুড়িগ্রাম রুটেও আসছে নতুন ট্রেন
  • মেট্রোরেলের নিরাপত্তা অডিটে কাঠামোগত ত্রুটি, অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি চিহ্নিত
  • ঢাকার কাছে ‘সেকেন্ডারি সিটি’ গড়ার লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করেছে সরকার: গৃহায়ণমন্ত্রী

Most Read

1
মাদ্রিদে স্পেনের উন্মুক্ত ছাদের বাসে বিজয় শোভাযাত্রার সময় আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে খোঁচা দিয়ে একটি প্ল্যাকার্ড হাতে লামিনে ইয়ামাল (ডানে)। ছবি: ইএসপিএন
খেলা

স্পেনের বিশ্বকাপজয় উদ্‌যাপনে আর্জেন্টিনাকে কটাক্ষ লামিনে ইয়ামালের

2
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ

জামায়াত এমপির অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ভাইরাল; এমপি বললেন ওই নারী দ্বিতীয় স্ত্রী

3
সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশ

চালু হলো ‘হ্যালো ডিসি’ অ্যাপ, এক ক্লিকেই মিলবে জেলা প্রশাসনের সেবা

4
'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি)-র জনসমাগম। ছবি: এএনআই
আন্তর্জাতিক

ভারতে প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদ করার পর শত শত তরুণের হোয়াটসঅ্যাপে পুলিশের নোটিশ

5
ইনফোগ্রাফিক: টিবিএস
অর্থনীতি

১৭ অগ্রাধিকার প্রকল্পে ৩৯০ কোটি ডলার বৈদেশিক অর্থায়ন সংগ্রহের পরিকল্পনা সরকারের

6
স্পেনের ট্রফি উঁচিয়ে ধরার সময়ও মঞ্চে অবস্থান করতে চান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: হেক্টর ভিভাস
খেলা

স্পেনের বিশ্বকাপ উদ্‌যাপনের ছবি থেকে ট্রাম্পকে 'ক্রপ' করে বাদ দিয়েছে ফিফা

The Business Standard
Top

Contact Us

The Business Standard

Main Office -4/A, Eskaton Garden, Dhaka- 1000

Phone: +8801847 416158 - 59

Send Opinion articles to - oped.tbs@gmail.com

For advertisement- sales@tbsnews.net

Copyright © 2022 THE BUSINESS STANDARD All rights reserved. Technical Partner: RSI Lab