কাপ্তানবাজারে কাঁঠালপাতা: দিনে ২৫,০০০ টাকার বেচাকেনা, ঈদের বাজার দ্বিগুণ বড়
ছাগলের প্রিয় খাবার কাঁঠালপাতা। রাজধানী ঢাকায় কাঁঠালপাতা বেশ দুর্লভ। কিন্তু এখানে ছাগলের বেচাকেনা কম নয়। বিশেষ করে কোরবানির ঈদে কয়েক লাখ ছাগল ও ভেড়া কোরবানি দেওয়া হয়। ভেড়ারও পছন্দের খাবার কাঁঠালপাতা। সাধারণত ১০টি ছাগলের জন্য প্রতিদিন আড়াই গাট্টি কাঁঠালপাতা প্রয়োজন। একেকটি গাট্টিতে ১০ আঁটি করে পাতা থাকে। একটি আঁটির দাম স্বাভাবিক সময়ে ২৫ টাকা। তবে ঈদ মৌসুমে প্রতিটি আঁটির দাম ৫০ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। পাইকারিতে একেক গাট্টি বিক্রি হয় সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়।
ঢাকায় কাঁঠালগাছ খুঁজে পেতে হয়রান হতে হয়, আর বড় কাঁঠালগাছ তো দুষ্প্রাপ্য। মূলত কাঁঠালগাছ বেড়ে ওঠার উপযুক্ত পরিবেশ ঢাকায় নেই। এই গাছের জন্য প্রয়োজন প্রচুর রোদ এবং পানি নিষ্কাশন করতে পারে এমন দোআঁশ মাটি। গোড়ায় পানি জমলে এই গাছের শিকড় পচে যায়।
ঢাকায় সারা বছর ছাগল বিক্রি হয় এমন তিনটি বড় আড়ত (গুদামসদৃশ বড় ঘর) আছে—গাবতলী, কাপ্তানবাজার ও যাত্রাবাড়ী। এসব আড়তে প্রতিদিন কয়েক হাজার ছাগল ও ভেড়া বেচাকেনা হয়। এছাড়া মেরাদিয়া ও কাজলায় সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে ছাগল বেচাকেনা চলে। আরমানিটোলা ও মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধেও ছাগলের নিয়মিত আড়ত রয়েছে। এর বাইরে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট আরও কিছু আড়ত আছে।
ঢাকায় ছাগল বেশি আসে মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ ও যশোর থেকে। এর মধ্যে মেহেরপুরের বারাদী হাটটি শতবর্ষী। যশোরের হয়বতপুর এবং ঝিনাইদহের বারোবাজারও বেশ নামকরা।
আলুবাজার থেকে কাপ্তানবাজার
কাপ্তানবাজারের হাটটি আগে ছিল আলুবাজারে। তবে সেখানকার স্থানীয়রা মহাজন ও পাইকারদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন না। কাপ্তানবাজারের বেচালদার (তত্ত্বাবধায়ক) মনিরুল ইসলাম মন্টু বললেন, 'তখন গোসল করতে যেতে হতো সেই সোয়ারীঘাটে। এরশাদ আমলে কাপ্তানবাজারের আড়ত গড়া শুরু হয়, উদ্বোধন হয় খালেদা জিয়ার আমলে। তারপর থেকে আলুবাজারের জৌলুস কমতে থাকে। এখন আলুবাজারে কোনো আড়ত নেই।'
মন্টুর বাড়ি ঝিনাইদহ। ২৩ বছর ধরে তিনি ছাগল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আগে ছিলেন রাখাল। সাধারণত হাটে একজন এজেন্ট (গোমস্তা) থাকেন, যিনি মহাজন বা বেপারির হয়ে ছাগল কেনেন। এরপর সেগুলো গাড়িতে তোলা হয়। সন্ধ্যায় গাড়ি ছাড়ার পর থেকে রাখালের কাজ শুরু হয়। ছাগলের গলায় যেন দড়ির ফাঁস না লাগে বা একটির সঙ্গে অন্যটি জড়িয়ে না যায়, সেদিকে সতর্ক নজর রাখা রাখালের দায়িত্ব। সকালে আড়তে না পৌঁছানো পর্যন্ত রাখাল সার্বক্ষণিক সজাগ থাকেন। বেচালদারকে ছাগল বুঝিয়ে দেওয়ার পর তার কাজ শেষ হয়।
বেচালদার মহাজনের হয়ে আড়তে বেচাকেনা পরিচালনা করেন। দিনে ছয়-সাতবার কাঁঠালপাতা ও গমের ভুসি খাওয়ানোর দায়িত্বও তার। খাওয়ানোর সময় দড়িতে ঝোলানো কাঁঠালপাতা মাঝেমধ্যে ওপর-নিচ করে দিতে হয়, যাতে বিভিন্ন উচ্চতার সব ছাগলই পেট ভরে খেতে পারে।
মন্টু বললেন, 'কাঁঠালপাতা ছাগলের ওষুধ হিসেবে কাজ করে। এতে পশুটির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, হাঁচি-কাশি কমে। সারারাত ভ্রমণ করে আসার পর ছাগলগুলো ঝিমিয়ে পড়ে, তখন কাঁঠালপাতাই এদের চাঙ্গা করে তোলে।'
কাপ্তানবাজারে দিনে ১০০ থেকে ১২৫ গাট্টি কাঁঠালপাতা বিক্রি হয়। ঢাকায় ঘাস নেই বলে কাঁঠালপাতার ওপরই চাপ পড়ে বেশি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত কাঁঠালপাতা ঢাকায় আসে কোথা থেকে?
শাহ আলমের শাগরেদ
মিজান রহমানের বয়স ৩২, কাঁঠালপাতার ব্যবসা করছেন ১৮ বছর ধরে। তার বাড়ি রংপুরের উলিপুরে। ছোটবেলায় পালিয়ে ঢাকা চলে এসেছিলেন তিনি। যাত্রাবাড়ীতে একটি চায়ের দোকানে কাজ করতেন, যেটি 'ভাবীর দোকান' নামে পরিচিত ছিল। খাওয়া-থাকা বাদে সেখানে তিনি ৩০০ টাকা বেতন পেতেন। সেই দোকানের এক গ্রাহক ছিলেন শাহ আলম। একদিন তিনি মিজানকে প্রস্তাব দিলেন, 'আমার শাগরেদ হবা? মাসে তিন হাজার টাকা পাবা।'
চৌদ্দ বছর বয়সে ৩ হাজার টাকা ছিল অনেক বড় অংক, যদিও খাওয়া-থাকা বাবদ অনেকটা খরচ হয়ে যেত। শাহ আলমের হাত ধরেই মিজান কাঁঠালপাতা সংগ্রহের কলাকৌশল শিখতে থাকেন। গাছ চিনতে শেখা ছিল এই ব্যবসার প্রথম পাঠ, কারণ সব বয়সের গাছ থেকে পাতা ছেঁড়া যায় না। এরপর গাছে ওঠা এবং গাছের নির্দিষ্ট অংশ থেকে পাতা বাছাই করা ছিল দ্বিতীয় পাঠ। তৃতীয় পাঠ হলো পাতা ছিঁড়ে বস্তায় ভরে নিচে নামিয়ে আনা। আর শেষ ধাপ হলো চারদিক ঘেরা কাঠের ট্রলিতে পাতা সাজিয়ে বড় রাস্তায় নিয়ে আসা।
সংগ্রহ অভিযান শেষে ভ্যানগাড়িতে করে পাতা আড়তে আনা হয়। বিক্রির কাজ শাহ আলম একাই করতেন; মিজান শুধু সেগুলো নির্দিষ্ট মহাজনের কোঠায় (আড়তে নির্ধারিত স্থান) পৌঁছে দিতেন। শাহ আলমের সঙ্গে তিন বছর থাকার পর মিজান কাপ্তানবাজারে নিজের ব্যবসা শুরু করেন। মিজান মূলত কেরানীগঞ্জ থেকে পাতা সংগ্রহ করেন। এখানকার তেঘরিয়া, কলাতিয়া ও রোহিতপুরের গৃহস্থবাড়িগুলোতে প্রচুর কাঁঠালগাছ আছে। ওস্তাদ শাহ আলমের সঙ্গে কাজ করার সুবাদে কেরানীগঞ্জের অনেক এলাকা এখন তার চেনা, অনেকের সঙ্গে পরিচয়ও আছে। তবে ওস্তাদের কাজে তিনি কখনো ভাগ বসাননি।
গাজীপুরের পাতা সুস্বাদু
নিয়ম অনুযায়ী, শুধু পাতা সংগ্রহের জন্য গাছের মালিককে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা (৫০০, ৭০০ বা ১০০০ টাকা) দিতে হয়। এরপর চোখের আন্দাজে মোট পাতার অর্ধেক রেখে বাকিটা ছিঁড়ে নেওয়া হয়। মিজান সাধারণত মোটা ডাল ভাঙেন না; যেখানে ডাল চিকন হতে শুরু করেছে, সেখান থেকে সংগ্রহ করেন। কাঁঠালগাছের ডাল ভাঙার সময় সতর্ক থাকতে হয়, কারণ এগুলো বেশ ভঙ্গুর।
সুস্বাদু কাঁঠালপাতা হয় গাজীপুর ও টাঙ্গাইলে। মধুপুর গড় অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এখানকার মাটির রং লালচে-বাদামি। মাটির বুনট কাদা মিশ্রিত দোআঁশ। মিজান সেখান থেকেও পাতা সংগ্রহ করেন। পাতার সংকট থাকলে বা বিশ্রামের প্রয়োজনে সপ্তাহে এক-দুই দিন ব্যবসা বন্ধ রাখেন তিনি।
মিজান থাকেন আড়ত সংলগ্ন একটি বড় ভবনে। সেখানে ব্যাপারী, পাইকার, বেচালদার ও মহাজনসহ প্রায় ৩০০ লোক থাকেন। একটি মেসে দুই বেলা খাওয়ার জন্য মিজানের খরচ হয় দিনে ১২০ টাকা। সকালের নাশতা মিলিয়ে দৈনিক খাবারের খরচ দাঁড়ায় ১৬০ টাকায়। তার পরিবার থাকে উলিপুরে; তার দুই মেয়ে রয়েছে। সম্প্রতি মিজান একজন সহকারীও নিয়োগ দিয়েছেন।
মিজানের সঙ্গে একই ঘরে থাকেন তার 'দেশাল' (একই অঞ্চলের) ভাই এম এ মান্নান। তিনি মূলত ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে মধ্যস্থতা করেন। দুই পক্ষ থেকেই সামান্য কমিশন পান, আর এটাই তার রোজগার। মান্নান জানালেন, সকালে পাতাওয়ালারা প্রতিটি কোঠায় পাতা দিয়ে যান। এটি সম্পূর্ণ নগদ কারবার। ছেঁড়ার পর পাতা সাধারণত দুই দিন রসালো থাকে।
গাছেরও নিশ্চয়ই কষ্ট হয়
কাপ্তানবাজারে কাঁঠালপাতার ব্যবসায়ী আছেন সাত-আটজন। পাতার গাট্টি বাঁধা হয় পাটের রশি দিয়ে। আড়াই গজের এক টুকরো রশির দাম ৪ টাকা। তবে খরচ বাঁচাতে অধিকাংশ সময় ব্যবসায়ীরা কসাইয়ের দোকান থেকে পরিত্যক্ত রশি সংগ্রহ করে কাজ চালান।
কাঁঠালপাতার ব্যবসা আর বেশি দিন করতে চান না মিজান রহমান। কারণ, তিনি গাছের হাহাকার অনুভব করেন। আবেগপ্রবণ হয়ে বললেন, 'গাছেরও নিশ্চয়ই কষ্ট হয়। আমাদের মতো কেবল মুখ ফুটে বলতে পারে না। একেকটি ডাল ভাঙি আর দেখি অনেক কষ বের হচ্ছে। আমার তখন খুব খারাপ লাগে।'
উলিপুরে মিজানের কিছু ছাগল আছে। তবে জায়গার অভাবে সংখ্যা বাড়াতে পারছেন না। কিছু পুঁজিতেও টান আছে। এখন তিনি টাকা জমানোর চেষ্টা করছেন। পর্যাপ্ত টাকা হলে ছাগল কেনাবেচার কাজ শুরু করার ইচ্ছা তার। তখন আর তাকে গাছের পাতা ছেড়ার কাজ করতে হবে না।
ছবি: সালেহ শফিক