বিদেশি সাংবাদিকের দেখা ২৫ মার্চ ১৯৭১
নিউইয়র্ক পোস্টে মিশেল লরার প্রতিবেদন
ট্যাংক যেভাবে একটি শহর গুঁড়িয়ে দিল
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ফটোগ্রাফার মিশেল লরা ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় ছিলেন। তখনই বাঙালিদের স্বাধীনতা আন্দোলন নস্যাৎ করতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সাংবাদিকদের সবাইকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আটক করা হয়। বের হলেই গুলির হুমকি। এর মধ্যেই লরা সঙ্গোপনে বেরিয়ে পড়েন এবং বিধ্বস্ত ঢাকা শহর ঘুরে ঘুরে দেখেন। শেষ পর্যন্ত অন্য বৈদেশিক সংবাদদাতাদের সঙ্গে তাঁকেও ঢাকা থেকে জোর করে বহিষ্কার করা হয়। মিশেল লরার সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন:
ঢাকা পূর্ব পাকিস্তান (এপি): বৃহস্পতিবার রাতে কোনো ধরনের আগাম সতর্কতা ছাড়াই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সবাইকে বিস্মিত করে বাঙালিদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের এম ২৪ ট্যাংক, গোলন্দাজ ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে প্রদেশের রাজধানী ও সবচেয়ে বড় শহর ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
সেনাবাহিনীর প্রধান নিশানা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়, জনাকীর্ণ পুরনো ঢাকা, যেখানে শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের সমর্থন সবচেয়ে বেশি এবং ১৫ লাখ মানুষের এই শহরের বাইরের শিল্পাঞ্চল। কেবল রাজধানীতেই সম্ভবত সাত হাজার লোক নিহত হয়েছে।
শনিবার ও রোববার যারা বের হয়েছেন তারা তখনও আগুন জ্বলছে এমন অনেক স্থান দেখতে পান। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের বিছানায় পাওয়া গেছে অগ্নিদগ্ধ ছাত্রের মৃতদেহ। ট্যাংক সরাসরি ছাত্রাবাসে আঘাত করে।
জগন্নাথ কলেজে (হলে) তড়িঘড়ি করে গণকবর দেওয়া হয়েছে। ইকবাল হলে নিহত হয়েছে ২০০ ছাত্র। তখনো ছাত্রাবাসের সামনে প্রায় ২০টি মৃতদেহ পড়ে ছিল। সেনারা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর বাজুকা নিক্ষেপ করেছে। সেখানে হতাহতের সংখ্যা জানা যায়নি। হাজার হাজার মানুষ হাতে যেটুকু নিতে পারে তা নিয়েই শহর ছেড়ে পালাচ্ছে। খাবারদাবার ও কাপড়বোঝাই ঠেলাগাড়ি নিয়ে কেউ কেউ পথ চলছে। সেনা কর্তৃপক্ষের আদেশের পর হাতেগোনা কিছু লোক সরকারি কাজে ফিরে এসেছে। (৩০ মার্চ ১৯৭১)
রবার্ট কেয়লরের ইউপিআই রিপোর্ট
২৬ ঘণ্টার ঢাকা নাটক
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন ঢাকার নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে নেয়, ইউপিআইর প্রতিনিধি রবার্ট কেয়লর তখন ঢাকায়। তারই রচনা প্রত্যক্ষদর্শীর ডায়েরি। আরও বিদেশি সংবাদদাতাদের সঙ্গে তার অবস্থান। রবার্ট কেয়লরের প্রতিবেদন:
ঢাকা হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টাল: রাত ১১টা, বৃহস্পতিবার ২৫ মার্চ আমি হোটেলের লবিতে নেমে আসি। আমার হাতে একটি বার্তা, জনগণের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর ব্যবহার অব্যাহত রাখার 'ভয়াবহ পরিণতি' সম্পর্কে শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বক্তব্য অবলম্বন করেই আমার বার্তা।
আমি একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে টেলিগ্রাফ অফিসে গিয়ে বার্তাটি প্রেরণের পরিকল্পনা করছি, আমি দেখলাম লবিতে অনেকের জটলা⎯যুদ্ধসাজে সজ্জিত সৈন্যরা এসেছে, হেলমেট মাথায়, হাতে খোলা অস্ত্র। হোটেলের কর্মচারীরা একটি ব্ল্যাকবোর্ড বসিয়ে তাতে নোটিশ লিখেছে⎯'অনুগ্রহ করে বাইরে যাবেন না,' একেবারে দরজার সামনে চক দিয়ে লেখা। শনিবার হরতাল পালনের জন্য শেখের আহ্বান সংবলিত বিবৃতিটি কেউ একজন ব্ল্যাকবোর্ডের উপর সেঁটে দিয়েছে। অন্য সংবাদদাতারা জানালেন, তারা যখন বাইরে যেতে চেষ্টা করেছেন সৈন্যরা তাদের বাধা দিয়ে ভেতরে ঢোকার নির্দেশ দিয়েছে। এই সৈন্যদের নেতা বলে দিয়েছে, যে বাইরে যেতে চেষ্টা করবে তাকে গুলি করা হবে।
রাত ১১.৪৫
কী যে ঘটছে সবাই তা বের করার চেষ্টা করছে। একটি তত্ত্ব হচ্ছে, এই গার্ডরা হোটেলে অবস্থানরত পশ্চিম পাকিস্তানি নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টোর প্রতিরক্ষার চেষ্টা করছে⎯ভুট্টো পূর্ব পাকিস্তানে ঘৃণিত ব্যক্তি। হোটেলের সর্বোচ্চ তলায় তিনি অবস্থান করছেন। অন্য একটি তত্ত্ব হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটতে যাচ্ছে, সে জন্যই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অন্য কোনো জেনারেলের স্বার্থে হার্ডলাইনে যাননি।
সময় যতটা গড়াতে থাকে ততটাই অভ্যুত্থানের মতোই মনে হয়। সন্ধ্যার পর সৈন্যদের গাড়ির বহর দু'বার হোটেলের সামনে দিয়ে অতিক্রম করতে দেখা গেছে। প্রেসিডেন্টের মূল সহযোগীদের একজনের ব্যক্তিগত নম্বরে ফোন করলাম⎯উদ্দেশ্য একটি গুজব প্রেসিডেন্ট এর মধ্যেই ঢাকা থেকে চলে গেছেন⎯এর যথার্থতা যাচাই করা (সমঝোতার জন্য প্রেসিডেন্টও ঢাকায় অবস্থান করছিলেন।) কেউ-একজন ফোন ধরলেন কিন্তু কথা বললেন না। আমি স্থানীয় একটি সংবাদ সংস্থায় ফোন করি এবং কী ঘটছে এ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা আছে কি-না জানতে চাই। তারাও বলতে পারছে না। অফিস ছেড়ে বেরও হতে পারছে না।
সিডনি শনবার্গের ২৫ মার্চ ঢাকা
বিদ্রোহ ঠেকাতে সৈন্যরা কামান দাগিয়েছে
১৯৭১-এ দিল্লিতে কর্মরত নিউইয়র্ক টাইমস সংবাদদাতা সিডনি এইচ শনবার্গ উত্তপ্ত পূর্ব পাকিস্তান কাভার করতে তখন ঢাকায়। ২৭ মার্চ ১৯৭১ যে ৩৫ জন বিদেশি সাংবাদিককে ঢাকা থেকে বহিষ্কার করা হয় সিডনি তাদের অন্যতম। ২৫ মার্চ গণহত্যার তিনি অন্যতম সাক্ষী। তার প্রতিবেদন ২৮ মার্চ ১৯৭১ নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত হয়:
নিরস্ত্র বেসামরিক জনতার ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কামান ও ভারী মেশিনগান চালিয়ে পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন নস্যাৎ করে দিতে চেয়েছে। কোনোভাবে সতর্ক না করেই বৃহস্পতিবার রাতে তারা আক্রমণ শুরু করে। সেনাবাহিনীতে প্রাধান্য পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের−তারা প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকার রাস্তায় নেমেছে। তাদের লক্ষ্য স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান ঘাঁটিগুলো যেমন⎯বিশ্ববিদ্যালয় অবরোধ।
ক'জন মৃত্যুবরণ করেছে বা জখম হয়েছে জানার উপায় নেই। ঢাকায় আঘাত হানার আগে থেকেই দেশের ভেতর বেসামরিক জনতা ও পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর আসছিল।
সিডনি শনবার্গ ঢাকায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে থেকে শহরের বিভিন্ন অংশে আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পাচ্ছিলেন। ভয়াবহ আগুন জ্বলছিল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়।
প্যারামিলিটারি ফোর্স (ইপিআর) পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসে এখনও আগুন জ্বলছে। গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসছে। আজ সকালেই ৩৫ জন বিদেশি সাংবাদিককে ঢাকা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। হোটেলের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে একজন পাকিস্তানি ছাত্র বলছে, 'হায় আল্লাহ, হায় আল্লাহ, ওরা তাদের মেরে ফেলছে, ওরা তাদের জবাই করছে।'
সামরিক ট্রাকবহরের পাহারায় এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথে সাংবাদিকরা দেখেছেন, রাস্তার দু'পাশের বস্তিতে এবং স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের জোরদার সমর্থকদের বাড়িতে সেনাসদস্যরা আগুন দিচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাতে যখন এই অভিযান শুরু হয়, সৈন্যরা বিজয়ধ্বনি দিয়ে শহরের বিভিন্ন অংশে প্রবেশ করে অটোম্যাটিক রাইফেল, মেশিনগান ও রিকয়েললেস রাইফেল থেকে অবিরাম গুলিবর্ষণ করে এবং বিভিন্ন স্থানে আগুন ধরিয়ে দেয়। কী ঘটছে জানার জন্য হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থানরত বিদেশি সাংবাদিকরা বাইরে যেতে চান, নতুন করে বলীয়ান সেনাবাহিনী জোর করে তাদের আবার ভেতরে ঢুকিয়ে দেয় এবং বলে, ভবনের বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করলে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করা হবে।
হোটেলের চারপাশে আগুন ও গোলাগুলি বাড়তে থাকে, রাত ১টা নাগাদ গোটা শহরেই তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বাইরের মিলিটারি গার্ডের আদেশে রাত ১.২৫ মিনিটে হোটেলের টেলিফোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। একই সময় টেলিগ্রাফ অফিস টাওয়ারের বাতিও নিভে যায়। ভারী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসে বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরের অন্যান্য অংশ থেকে।
রাত ২.১৫ মিনিটের দিকে মেশিনগানবাহী একটি জিপ ময়মনসিংহ রোড ধরে এগিয়ে একটি বাজারের সামনে থামে। দোতলার জানালা বরাবর মেশিনগান তাক করা একডজন সশস্ত্র সৈন্য হেঁটে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। তাদের একটি দল বহন করছে রকেট জাতীয় অস্ত্র।
দোতলা থেকে হঠাৎ চিৎকারধ্বনি শোনা গেল 'বাঙালি এক হও' আর তখনই সৈন্যদল ভবনটির ওপর অবিরাম গোলাবর্ষণ করতে শুরু করল। যে গাড়ি দিয়ে এই কানাগলিতে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছিল, সে গাড়ি উল্টে দিল। হোটেলের দশ তলার ছাদ থেকে গুলির ঝলক বিদেশি সাংবাদিকরা দেখেছেন, এ ছিল এক অবিশ্বাস্য নাটক।
সেনাসদস্যরা যখন গুলি করতে করতে এগোয়, ১৫ থেকে ২০ জন বাঙালি যুবক প্রায় ২০০ গজ দূরে তাদের মুখোমুখি হয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। কিন্তু মনে হল তারা নিরস্ত্র, খালি হাত। জিপের ওপরের মেশিনগান ঘুরিয়ে ধরল তাদের দিকে, এরপর চলল গুলি। স্বয়ংক্রিয় রাইফেলধারী সৈন্যরাও তাদের সঙ্গে যোগ দিল। যুবকরা রাস্তার দু'পাশে ছড়িয়ে পড়ল। কেউ নিহত কিংবা আহত হয়েছে কি-না এখান থেকে বোঝা মুশকিল । এবার তারা এগিয়ে গেল গলির দিকে। একটি স্পেয়ার পার্টসের দোকানে আগুন ধরিয়ে দিল। তাদের মূল লক্ষ্য 'দ্য পিপল' অফিস ও প্রেস। এই ইংরেজি দৈনিক পত্রিকাটি শেখ মুজিবকে ক্রমাগত সমর্থন এবং সেনাবাহিনীকে বিদ্রুপ করে যাচ্ছিল।
পশ্চিম পাকিস্তানি ভাষা উর্দুতে তারা চিৎকার করে সতর্ক করল, ভেতরে কেউ থাকলে আত্মসমর্পণ কর, নতুবা গুলি করে হত্যা করা হবে। কোনো উত্তর এল না, কেউ বেরও হল না। তারা পত্রিকাটির অফিসে রকেট শেল নিক্ষেপ করল। সঙ্গে চলল মেশিনগান ও ছোট অস্ত্রের গুলি। এরপর ভবনে আগুন লাগিয়ে ছাপাখানা ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি ভাঙতে লাগল।…
সিডনি শনবার্গ লিখেছেন, ভোর পৌনে ৫টায় পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস সদর দফতরের দিকে ভয়াবহ অগ্নিশিখা দেখা গেল। পৌনে ৬টার দিকে আব্ছা আলোয় চোখে পড়ল চাইনিজ টি-৫১ হালকা ট্যাংকে চড়ে সৈন্যরা শহরের প্রধান প্রধান সড়কে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে।
গতকাল ভোর থেকে মাথার উপর হেলিকপ্টার ঘুরঘুর করছে⎯লক্ষ্যবস্তুর ওপর আক্রমণ চালানোর জরিপ চালাচ্ছে। নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর ত্রাণ সহায়তার জন্য সৌদি আরব পাকিস্তানকে চারটি হেলিকপ্টার দিয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, সেই হেলিকপ্টার পূর্ব পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সিডনি শনবার্গসহ বিদেশি সাংবাদিকদের যখন পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহিষ্কারের উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে বের করে দেওয়া হয় একজন হোটেল কর্মকর্তা বললেন, 'এটা এখন আর হোটেল থাকবে না, হয়ে উঠবে রক্তাক্ত হাসপাতাল।' (নিউ ইয়র্ক টাইমস)
ডেইলি টেলিগ্রাফে ২৯ মার্চের প্রতিবেদন
সম্পাদকীয় নীতিমালায় বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন এলেও সংবাদ প্রকাশে বস্তুনিষ্ঠতা ও উদার বিশ্লেষণের ধারাটি আগাগোড়াই অব্যাহত রেখেছে বিলেতের দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ।
পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটি বের হয় ২৯ জুন ১৮৫৫। তখন সম্পাদক থর্নটন লেই হান্ট। পত্রিকাটি রাজনৈতিকভাবে রক্ষণশীল দলের প্রতি কোমল। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় টেলিগ্রাফের সম্পাদক মরিস গ্রিন। তখন চলছিল শ্রমিক দলের শাসন। ডেইলি টেলিগ্রাফ প্রথম পর্যায়ে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তানান্তর কথা বলেছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের পাশবিকতার নিন্দা করেছে, কার্যত পাকিস্তান যে ভেঙে গেছে তা স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছে। তৃতীয় পর্যায়ে শরণার্থী সমস্যার ভয়াবহতা ও শরণার্থীদের মানবেতর জীবন নিয়ে লিখেছে এবং চতুর্থ পর্যায়ে যুদ্ধের দায় ইয়াহিয়া খানের সেনা সরকার ও ভুট্টোর ওপর অর্পণ করেছে এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের জন্য নিজ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
শুরুতে সায়মন ড্রিঙ্গয়ের প্রতিবেদন বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। একাত্তরের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা থেকে ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্ক সংবাদ পাঠিয়েছেন: আজ পূর্ব পাকিস্তানের ভেতরেই ৮০ লাখ মানুষ বাস্তচ্যূত পুরুষ, নারী ও শিশু ক্ষুধার্ত ও নিরাশ্রয়। তারা নিজ দেশে পরবাসী। তিনি লিখেছেন পাকিস্তানি সৈনিকদের গুলি করে বাঙালি মারাতেই আনন্দ। ২৯ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ ভিন্ন শিরোনামে তিনটি সংবাদ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের হত্যাযজ্ঞ নিয়ে প্রকাশ করে–ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামে। বাংলাদেশ টেলিগ্রাফের কাছে কতটা গুরুত্ব পেয়েছে এটাই তার প্রমাণ।
নির্মম পাকিস্তানি আগ্রাসন
পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যরা গতকাল (২৮ মার্চ ১৯৭১) পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে তাদের মুঠি শক্ত করে এনেছে। গত সপ্তাহান্তের খবর তারা শত শত নাগরিককে হত্যা করেছে বলে জানা গেছে। দিল্লি থেকে আমাদের প্রতিনিধি জানিয়েছেন বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। তবে এর মধ্যে সৈন্যরা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। গতকাল ঢাকা থেকে সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করা হয়েছে। গোলযোগ দমনের জন্য গতকাল আরও বহুসংখ্যক সৈন্য উড়োজাহাজে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়েছে। পাকিস্তানি সৈন্যরা এতটুকু ছাড় না দিয়ে বেসামরিক জনগণকে সন্ত্রস্ত করে আনুগত্য স্বীকারে বাধ্য করছে। শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ সমর্থকরা এর তীব্র প্রতিবাদ করে চলেছেন।
সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আনীত হত্যাযজ্ঞের অভিযোগ পশ্চিম পাকিস্তানি কর্মকর্তারা অস্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, শান্তিকালীন অবস্থা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে এবং জনজীবনে স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছে।
তারা বলেছেন, কলকাতার কাছে নোঙর করা একটি জাহাজে স্থাপিত একটি গোপন বেতারকেন্দ্র হতে আজগুবি সব রটনা করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, গতরাতে সেনাবাহিনী শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করেছে। বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে তাঁর বাড়ি সৈন্যরা ঘিরে রেখেছিল। আশঙ্কা রয়েছে এই দ্বন্দ্ব সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে পৌঁছে যেতে পারে, সেখানকার বাঙালিরা পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের সঙ্গে মিশে ভারতীয় রাজনৈতিক উস্কানিদাতাদের কারণে জটিল অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। ভারত এ অবস্থায় পাকিস্তানের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না বলে মনে হচ্ছে।
যদি অব্যাহত লড়াইয়ের কারণে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত ৮০০ ব্রিটিশ নাগরিককে উড়োজাহাজে ফিরিয়ে আনার মতো জরুরি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। (২৯ মার্চ ১৯৭১)
পূর্ব পাকিস্তান বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন
গণযুদ্ধের ভয়াবহ চক্রে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। যেটুকু খবর পাওয়া গেছে তাতে এটাই মনে হওয়ার কথা। প্রদেশটি কার্যত বহিঃর্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। যেসব কূটনৈতিক উৎস ঢাকায় তাদের মিশনের সঙ্গে ক্ষীণ রেডিও যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে এবং শুক্রবার লড়াই শুরু হওয়ার পর যেসব পর্যালোচক পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে এসেছিল সবার মতে ৭০ হাজার পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে দাবিয়ে রাখতে তাদের নিষ্ঠুরতা এতটুকুও হ্রাস করছে না।
নিহত বাঙালির সংখ্যা দশ হাজার থেকে এক লাখের মধ্যে হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রকৃত সংখ্যা যাই হোক এতে কোনো সন্দেহ নেই যে সেনাবাহিনী তাদের ইচ্ছেটাই কেবল সকলের ওপর চাপিয়ে দেবে, আর তা করবে ইচ্ছেমতো নির্মমতার সঙ্গে।
