পাকবাহিনীর গুলিতে চুরমার হয়ে যায় নবদম্পতি রণজিৎ ও রানীর সব স্বপ্ন
নয় বছর বয়সী অরুণ যখন ঠাকুরঘরে ঢুকলেন, দেখলেন মেঝেতে পড়ে আছেন তার দাদা। দাদার বুকের রক্তে ঠাকুরঘরের মেঝে ভেসে গেছে। বুঝতে পারলেন, দাদা আর নেই।
তিনি তাকালেন বউদির দিকে। দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন বউদি। লালচে শাড়িতে মাথায় ঘোমটা টানা, দুই হাত কোলের ওপর রাখা। চোখ স্থির স্বামী রণজিতের দিকে। কপালের সিঁদুরের টিপটাও মুছে গেছে।
'বউদি?' ডেকে উঠলেন অরুণ। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। বসে রইলেন একইভাবে। ডাকাডাকির এক পর্যায়ে অরুণ কাঁধ ধরে ঝাঁকি দিতেই বউদি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তখন বেরিয়ে এলো দুটি রক্তাক্ত হাত। শাঁখাপলা পরা সেই হাতদুটোতে জায়গায় জায়গায় উঠে এসেছে মাংসের দলা।
নববিবাহিতা দাদা-বউদিকে নিয়ে অরুণের স্মৃতিতে এ দৃশ্যটুকুই রয়ে গেছে। এরপরের দিনই তারা চলে যান মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরে গ্রামের বাড়িতে।
সবার বড় ছিলেন রণজিৎ
অরুণের পুরো নাম অরুণ কুমার দে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে তার বাসায় হানা দেয় পাকিস্তানি বাহিনী। কারণ, তার বাবা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সবার প্রিয় 'মধুদা'—মধুসূদন দে।
২৫ মার্চ ঢাকাজুড়ে হত্যাযজ্ঞ চললেও মধুসূদন দে বুঝতে পারেননি যে তার বাড়িতেও আক্রমণ হতে পারে। সেদিন আশপাশে সবকিছু বন্ধ থাকায় পরিবারের সবাই বাড়িতেই ছিলেন। দুই মেয়ে ছিলেন শ্বশুরবাড়িতে, আর ছোট মেয়ে ছিলেন বোনের শ্বশুরবাড়িতে। বাড়িতে ছিলেন মধুসূদন দে, তার স্ত্রী যোগমায়া এবং তাদের আট সন্তান। বড় ছেলে রণজিৎ দে তখন সদ্য বিবাহিত—বিয়ের বয়স মাত্র সাত-আট মাস।
ছোটবেলা থেকেই রণজিৎ মেধাবী ছিলেন। জগন্নাথ কলেজ থেকে বি.কম পাস করে একটি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি করছিলেন। খেলাধুলাতেও ছিলেন দক্ষ, বিশেষ করে ব্যাডমিন্টন খেলতে ভালোবাসতেন। স্বভাবে ছিলেন গম্ভীর। ছোট ভাইবোনেরা তাকে যেমন ভয় পেত, তেমনি মান্যও করত।
অরুণ বলেন, "দাদা ছিলেন সবার বড়। আমাদের কাছে অভিভাবকের মতো ছিলেন। মন দিয়ে পড়ালেখা করতে বলতেন। কথা না শুনলে শাসন করতেন। আমরাও তার কথা খুব মেনে চলতাম।"
বউদির হাতের মুগডাল রান্না ছিল অরুণের সবচেয়ে প্রিয়
বউদি রিনা রানী দে ছিলেন একদমই কোমল স্বভাবের। হাসিখুশি; কিন্তু লক্ষ্মী, চুপচাপ আর শান্ত। আদর করে মাঝে মাঝে অরুণকে ছোটো ভাই বলে ডাকতেন বউদি। সকালে বাড়ির পুরুষরা কাজে বেরিয়ে গেলে আর ছোটরা স্কুলে চলে গেলে রানী দে লেগে যেতেন শ্বাশুড়ি যোগমায়ার কাজে সাহায্য করতে।
অরুণের মনে পড়ে বউদির রান্নার কথা। বউদির হাতের মুগডাল রান্না ছিল অরুণের সবচেয়ে প্রিয়। মাছের মাথা দিয়ে মুগডাল খুব মজা করে রাঁধতে পারতেন তিনি। যেদিন রান্না হতো, অরুণ একদম চেটেপুটে খেতেন সেদিন।
মাঝে মাঝে লুডু খেলতেন বউদির সঙ্গে। দাদা আর বউদি লুডু খেললে পাশে বসে বসে খেলা দেখতেনও অরুণ।
খুব সুন্দর গান গাইতে পারতেন অরুণেরর দাদা রনজিৎ। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, দেশাত্মবোধক গান গাইতেন বেশি।
অরুণ বলেন, "আমার বউদির গলাও খুব সুন্দর ছিল। কিন্তু বাড়ির বড় বউ বলে গাইতেন না। তবে গান শুনতেন।"
সুইপার এসে পচাগলা মরদেহগুলো নিয়ে যায়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মধুসূদন দে'র জন্য শিব মন্দিরসংলগ্ন কর্মচারীদের স্টাফ কোয়ার্টারে একটি বাসা বরাদ্দ দিয়েছিল। বিয়ের পর রণজিৎ সেখানেই স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন।
অরুণের সবকিছু স্পষ্ট মনে নেই। শুধু মনে আছে, ঘরে ঢুকতেই সামনে একটি বারান্দা পড়ত। সেই বারান্দার দুপাশে ছিল দুটি ঘর। বাবা মধুসূদনের ঘরের পাশেই ছিল ঠাকুরঘর।
পাকিস্তানি বাহিনী প্রথমে পুরো বাড়ি ঘিরে ফেলে। এরপর দোতলার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ে। ভেতরে ঢুকে তারা প্রথমেই মধুসূদন দে'কে বেঁধে ফেলে, সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তখন অন্তঃসত্ত্বা যোগমায়া স্বামীকে বাঁচাতে সামনে গিয়ে দুহাত তুলে দাঁড়ালে, পাকবাহিনী বেয়োনেট দিয়ে তার দুই হাত কেটে ফেলে।
পুত্রবধূ রানী দে তখন ছিলেন ঠাকুরঘরে। পাকবাহিনী সেখানে ঢুকেই তাকে আক্রমণ করতে যায়। রণজিৎ পাশের ঘর থেকে দৌড়ে এসে স্ত্রীকে হাত তুলতে বলেন। ঠিক তখনই তার বুকে গুলি করা হয়।
এরপর মধুসূদন দে'কে গুলি করে আহত অবস্থায় জগন্নাথ হলের মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নির্যাতন করতে করতে তাকে হত্যা করা হয়।
তবে রানী দে কীভাবে নিহত হন, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। ঠাকুরঘরে তাকে কাঁধে ঝাঁকি দেওয়ার আগ পর্যন্ত সবাই ভেবেছিলেন তিনি বেঁচে আছেন।
অরুণ বলেন, "সম্ভবত পাকিস্তানিরা ধরতে এলে বউদি ভয় পেয়ে হাত গুটিয়ে মেঝেতে বসে পড়েন। তখন হয়তো তাকে গুলি করা হয়।"
২৬ মার্চের সেই রাতে বাবা-মা, বড় ভাই ও একমাত্র বউদির হত্যাকাণ্ড চোখের সামনে দেখে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েন অরুণ ও তার ভাইবোনেরা। পরদিন বাবার এক বন্ধুর সহায়তায় তারা মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরে গ্রামের বাড়িতে চলে যান। সেখান থেকে পরে দেশ ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমান।
মধুসূদনের স্ত্রী, ছেলে ও পুত্রবধূর মরদেহ কয়েকদিন পড়ে থাকে ঘরের মধ্যেই। পরে পৌরসভার কর্মীরা এসে পচাগলা সেই তিনটি মরদেহ সরিয়ে নিয়ে যায়।
