গ্যাস সংকটে নাজেহাল ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী-খাবার বিক্রেতারা, এবার টান পড়বে সাধারণ মানুষের পকেটে
হাতিরপুল বাজারে মোহাম্মদ নূর আলমের চায়ের দোকান। পাশেই একই ধরনের আরও দুটি দোকান। প্রত্যেকেরই মাসে অন্তত তিনটি করে গ্যাস সিলিন্ডার লাগে। তবে ছয় বছরের ব্যবসা জীবনে এমন পরিস্থিতি কখনো দেখেননি তারা। মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে গ্যাসের প্রতিটি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ দামে।
এলপিজি গ্যাসের চলমান সংকটে নূর আলমের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। একদিকে বাড়তি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে, অন্যদিকে চাহিদামতো সিলিন্ডার পাওয়ার নিশ্চয়তাও নেই। এর মধ্যেই অনেককে একাধিকবার দোকান বন্ধ রাখতে হয়েছে। কেউ কেউ আবার বাধ্য হয়ে খুঁজছেন এ জ্বালানির বিকল্প।
কিছুদিন আগেও ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১,২৫০ টাকা। গত সপ্তাহে সেই সিলিন্ডার কিনতেই নূর আলমকে গুনতে হয়েছে ২,২০০ টাকা। তার হিসাবে, একটি সিলিন্ডারেই চলে যাচ্ছে প্রায় দুই দিনের আয়। ব্যবসার অবস্থা জানতে চাইলে ক্ষোভ আর হতাশা গোপন রাখতে পারলেন না তিনি। বললেন, "দুই বোতলের টাকা দিয়া এক বোতল গ্যাস কিনছি। দাম বাড়লে ক্ষতিটা তো আমাদেরই হয়। একশো-দুইশো টাকা বাড়লে একটা কথা ছিল, কিন্তু এক হাজার টাকা বেশি দিয়া গ্যাস কিনলে ব্যবসাডা করমু কী?"
কাঠালবাগান ঢালে মাত্র এক মাস আগে একটি ফুডকার্টে ফাস্টফুডের ব্যবসা শুরু করেছেন মোহাম্মদ রাসেল। বড় স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও শুরুতেই ধাক্কা খেতে হয়েছে তাকে। গ্যাসের খোঁজে হাতিরপুল, মগবাজার, কারওয়ানবাজার ঘুরেও কোথাও সিলিন্ডার পাননি।
"কম দামের আশায় অনেক জায়গায় ঘুরছি। সবাই বলে গ্যাস নাই। থাকলেও দাম বেশি, আবার বলে অপেক্ষা করেন। শেষে এক পরিচিত ভাইয়ের মাধ্যমে ১,৮০০ টাকা দিয়া এক বোতল গ্যাস কিনছি। এখন কোনো মতে চালাইতেছি," বলেন রাসেল।
প্রায় একই অবস্থা ফুটপাতে খাবার বিক্রি করা অন্যান্য ব্যবসায়ীদেরও। কারওয়ানবাজারের চা বিক্রেতা মোহাম্মদ দুলাল, চানখারপুলের খাবারের দোকানদার মানিক মিয়া কিংবা কাঠালবাগানের হালিম বিক্রেতা বিল্লাল বেপারীর ভাষ্য এক—গ্যাসের দাম বাড়ায় লাভ কমে গেছে। তার ওপর সামনে গ্যাস পাওয়া যাবে কি না, সে নিশ্চয়তাও নেই। গ্যাস না পেলে পুরো ব্যবসাটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা তাদের।
দীর্ঘস্থায়ী হলে চাপ পড়বে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরে কয়েক বন্ধু মিলে একটি সৌখিন চায়ের দোকান চালান। গ্যাস সংকটে তাদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে। একদিন তো দোকানই বন্ধ রাখতে হয়েছিল। পরে আনন্দবাজার থেকে ২,৪০০ টাকা দিয়ে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছেন তারা।
আপাতত খাবারের দাম না বাড়ালেও সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে উপায় থাকবে না বলে জানান দোকানটির উদ্যোক্তাদের একজন মিরাজ হোসেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে কিছুটা হলেও দাম বাড়াতে হবে।
হাতিরপুল এলাকায় দুটি দোকান মিলিয়ে মাসে প্রায় ৩০টি গ্যাস সিলিন্ডার লাগে মোহাম্মদ জনির। তার হিসাবেও লাভের অঙ্ক দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। "আমরা দাম বাড়াতে চাই না। দাম বেশি হলে সবাই তো আর খাবার কিনবে না। কিন্তু গ্যাস কিনতেই যদি লাভের টাকাটা চলে যায়, তখন বাধ্য হতে হয়," বলেন তিনি।
এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি আবাসিক হলে চায়ের দাম বাড়ার খবর পাওয়া গেছে। এদিকে কাঠালবাগানে সম্প্রতি চায়ের দোকান শুরু করা মোহাম্মদ মনসুর এখনো গ্যাসের চুলা কিনতে পারেননি। এ মাসেই কেনার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি। আপাতত তিনি মাটির চুলা আর কাঠের লাকড়িতে চা বানাচ্ছেন। তিনিও ভাবছেন, এবার চায়ের দাম বাড়ানোর কথা।
এ মুহূর্তে মূল চাপটা পড়ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর। তবে সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে সাধারণ ক্রেতাদের পকেটেও টান পড়বে—এতে একমত সবাই। তাদের আশঙ্কা, এই গ্যাস সংকটের প্রভাব ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হবে সাধারণ মানুষের চায়ের কাপে।
গ্যাসের পরিবেশকরা যা বলছেন
হাতিরপুল–বাটা সিগন্যাল এলাকার বড় এলপিজি পরিবেশকদের একটি হলো 'আনান এন্টারপ্রাইজ'। তবে সরবরাহ সংকটের কারণে এখানেও এখন আগের দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে বেশ চড়া দামেই গ্যাস বিক্রি করতে হচ্ছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার মোহাম্মদ আশরাফ।
তিনি বলেন, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দাম ১,৩০৬ টাকা হলেও এই দামে কোনো কোম্পানি থেকেই সিলিন্ডার সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। "মাল কিনলেও কোনো কোম্পানি মানি রিসিট দেয় না। পুরোনো কাস্টমারদের ফেরত দিতে হচ্ছে, গ্যাস নাই কোথাও। আগে যে ট্রাকে ২৮০ পিস মাল আনতাম, এখন একই ভাড়া দিয়ে ১২০ পিস আনতে হয়," বলেন আশরাফ।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দোকানে খালি সিলিন্ডার জমে থাকলেও কোনো কোম্পানি এখন রিফিল দিচ্ছে না।
সংকট শুধু খুচরা পর্যায়েই নয়, প্রকট হয়ে উঠেছে পাইকারি বাজারেও। কারওয়ান বাজারের পাইকারি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান 'মেসার্স জনতা ট্রেডার্স'-এর ম্যানেজার মোহাম্মদ মনির দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আমাদের দৈনিক ৩০০ পিস সিলিন্ডার দরকার। কিন্তু এখন কোনো দিন ৫০, কোনো দিন ৭০, আবার কোনো দিন ১০০ পিস পাই। এতে আমাদের ব্যবসাও ডাউন হয়ে যাচ্ছে।"
দাম এত বেশি কেন—এ প্রশ্নে মনির জানান, তারা ১২ কেজি সিলিন্ডার পাইকারি পর্যায়ে ১,৪৫০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। এখান থেকেই বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতারা সিলিন্ডার সংগ্রহ করেন। তবে তার অভিযোগ, পরবর্তী ধাপে অনেক খুচরা বিক্রেতা সংকটের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন।
তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে এখন দুই থেকে তিন দিন আগেই অর্ডার দিতে হয়। তবেই কোনোভাবে সীমিত পরিসরে গ্রাহকদের কাছে সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
তবে পরিবেশক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের এসব বক্তব্য মানতে নারাজ অনেক ক্রেতা। তাদের অভিযোগ, এলপিজি বাজারে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ইচ্ছাকৃতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাখে।
চা বিক্রেতা নূর ইসলাম বলেন, স্বাভাবিক সময়েও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে দাম বাড়ানো হয়। আর যখন বাস্তব কোনো সংকট দেখা দেয়, তখন বাড়তি মুনাফার আশায় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে এই চক্র। তার ভাষায়, "গ্যাস হঠাৎ এমন করে উধাও হয় কীভাবে? তারা বলে মাল নাই, আবার বেশি দাম দিলে ঠিকই পাওয়া যায়।"
সংকট কাটবে কবে
"আমাদের বলা হচ্ছে, নির্বাচনের আগে এই অবস্থা ঠিক হবে না। আবার কোম্পানিগুলো বলে মাল আসবে, কিন্তু বাস্তবে তো পাওয়া যায় না। কবে ঠিক হবে, বলতে পারছি না," বলেন মোহাম্মদ মনির।
এদিকে এলপিজি অপারেটরদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে বড় পরিমাণে এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এলপিজি ব্যবসায় যুক্ত ১২টি প্রতিষ্ঠান জানুয়ারি মাসে মোট ১ লাখ ৬৭ হাজার ৬০০ টন এবং ফেব্রুয়ারিতে ১ লাখ ৮৪ হাজার ১০০ টন এলপি গ্যাস আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এই বাড়তি আমদানির ফলে ধীরে ধীরে বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং দাম কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে।
এলপিজি সংকট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকেও তৎপরতার কথা জানানো হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে ও আসন্ন রমজান মাসে যেন এলপিজি গ্যাসের কোনো ঘাটতি না হয়, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।
তিনি বলেছেন, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে অপারেটররা যে আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা যেন বাস্তবে প্রতিফলিত হয়—এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।
এ সময় এলপিজি আমদানির পথে আর্থিক জটিলতা দূর করতেও উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এলপিজি আমদানিতে বাংলাদেশ ব্যাংক যেন কোনো ধরনের সীমা আরোপ না করে, সে বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি কীভাবে দ্রুত এলপিজি গ্যাস আমদানি করে বাজারের চাহিদা পূরণ করা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অপারেটর ও দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
এদিকে আগামী ২৫ বছরের জন্য নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান ২০২৫ প্রণয়ন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য আমদানি–নির্ভরতা কমানো, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বৃদ্ধি এবং টেকসই সবুজ জ্বালানিতে গুরুত্ব দেওয়া।
সরকারের এই নানামুখী তৎপরতায় বাজারে সরবরাহ বাড়বে বলে প্রত্যাশা করছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তারা। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনাও এলপিজি খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে—এমন আশাই সবার।
ছবি: জুনায়েত রাসেল/টিবিএস