পুরোনো ল্যাপটপের বিনিময়ে নতুন ল্যাপটপ পেতে চান? পাশে আছে 'এক্সচেঞ্জকরি'
ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা পুরোনো ল্যাপটপটি হয়তো অনেকদিন ধরেই কারও চোখে পড়েনি। কিবোর্ডে আঁচড়, স্ক্রিনে হালকা দাগ, ব্যাটারিতে আগের মতো প্রাণ নেই। একসময় যে যন্ত্রটি দিয়ে কাজের চাপ সামলানো হতো কিংবা পড়াশোনা চলত, আজ সেটিই যেন নীরবে অপেক্ষা করছে তার শেষ পরিণতির জন্য। অধিকাংশ মানুষের কাছে এমন একটি ল্যাপটপ মানেই 'অচল'—বা ভাঙারির দোকানে বিক্রি করে দেওয়ার মতো কিছু।
কিন্তু চিত্রটা কি সত্যিই এতটা সরল? সামান্য মেরামত, একটু যত্ন আর সঠিক ব্যবস্থাপনা পেলে এই পুরোনো ল্যাপটপই আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে—এ কথা অনেকেরই অজানা। তখন সেটি আর শুধু একটি যন্ত্র থাকে না। কারও পড়াশোনার একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে, আবার কারও জন্য হয়ে দাঁড়ায় জীবিকা চালানোর অপরিহার্য সঙ্গী।
প্রশ্ন হলো, কেমন হতো যদি একটি পুরোনো ল্যাপটপের বদলে পাওয়া যেত নতুন কিংবা মানসম্মত রিফারবিশড ল্যাপটপ?
বাংলাদেশের বাস্তবতায় পুরোনো কম্পিউটার বা ল্যাপটপ ভাঙারির দোকানে বিক্রির চিত্র বহুদিনের পরিচিত। প্রয়োজন শেষ হলেই কিংবা সামান্য ত্রুটি দেখা দিলেই সেগুলো চলে যায় ভাঙারির দোকানে—মাত্র কয়েকশ টাকার বিনিময়ে। ফলে মানুষের মনে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের দ্বিধা কাজ করে এসেছে। এই যন্ত্রগুলোর প্রকৃত মূল্য কি সত্যিই এত কম? একটু যত্ন নিলে কি এগুলো আবার ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠতে পারে না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে পুরোনো প্রযুক্তির সম্ভাবনা, পুনঃব্যবহার আর টেকসই ব্যবস্থাপনার ধারণা। বিশ্বজুড়ে যখন ই-বর্জ্যের বিশাল সমস্যা নিয়ে আলোচনা চলছে, পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখতে তখন জনপ্রিয় হচ্ছে পুনর্ব্যবহারের ভাবনা। সেই চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন রাসেল আহমেদ ও এম. আহসান হাবিব। তাদের উদ্যোগেই শুরু হয় 'এক্সচেঞ্জকরি'-র যাত্রা।
'এক্সচেঞ্জকরি' কেবল পুরোনো ল্যাপটপ কেনাবেচার প্ল্যাটফর্ম নয়। এটি এমন একটি উদ্যোগ, যেখানে পুরোনো ল্যাপটপের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা হয় এবং সেই মূল্যকে ভিত্তি করে নতুন কিংবা মানসম্মত রিফারবিশড ল্যাপটপ কেনার সুযোগ তৈরি করা হয়।
এখানে একটি যন্ত্রকে অচলতার তকমা দিয়ে নয়, বরং তার ব্যবহারযোগ্যতা ও সম্ভাবনার আলোকে বিচার করা হয়। ফলে যেসব ল্যাপটপ একসময় ফেলে দেওয়ার তালিকায় ছিল, সেগুলো এখন মাত্র ১০ হাজার টাকা থেকে নতুন করে কেনার সুযোগ পাচ্ছেন গ্রাহকরা।
শুরুর গল্প
বাংলাদেশে বহুদিন ধরেই পুরোনো ল্যাপটপ মানে একরাশ অনিশ্চয়তা। ওয়ারেন্টি নেই, দায়দায়িত্ব নেই—আজ যিনি বিক্রি করছেন, কাল তিনি থাকবেন কি না, সেটাও প্রশ্ন। এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ বাজারেই 'এক্সচেঞ্জকরি' পুরোনো প্রযুক্তিকে দেখেছে অন্য চোখে। তাদের কাছে পুরোনো ল্যাপটপ মানে বাতিল কোনো বস্তু নয়।
গ্রাহকের আস্থা অর্জনের লক্ষ্যেই পুরোনো ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ কিনলে তারা দিচ্ছে ৫০ দিনের রিপ্লেসমেন্ট গ্যারান্টি এবং পাঁচ বছরের ফ্রি সার্ভিস।
রাসেল বলেন, "বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বা বিশ্বজুড়ে একটি ল্যাপটপের গড় আয়ু ১০ থেকে ১২ বছর। অর্থাৎ আপনি যদি আজ একটি ল্যাপটপ কেনেন, মাঝখানে হয়তো ব্যাটারি নষ্ট হবে বা কিছু সমস্যা দেখা দেবে, কিন্তু সেটি ১০ থেকে ১২ বছর ব্যবহার করা সম্ভব।"
'এক্সচেঞ্জকরি'-র আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১৫ সালে। তবে এর পেছনে আছে আরও আগের অভিজ্ঞতার গল্প। স্বত্বাধিকারী রাসেল আহমেদ একসময় কাজ করেছেন এসআর ল্যাপটপের ডিস্ট্রিবিউশনের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানে। কর্পোরেট ক্লায়েন্টদের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করতে করতেই তিনি বুঝতে শিখেছিলেন—ব্যবসা শুধু পণ্য বিক্রির নাম নয়। তখন অনেক ক্লায়েন্টই তাকে বলতেন, "আপনার কমিউনিকেশন ভালো, সার্ভিস স্ট্যান্ডার্ডও ভালো—আপনি নিজে কিছু শুরু করতে পারেন।" সেই কথাগুলোই ধীরে ধীরে রাসেলের মনে ভবিষ্যৎ উদ্যোগের প্রথম বীজ বপন করে।
গ্রাহকদের এই আস্থার ওপর ভর করেই ২০১২ সালে মাত্র ৫০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে রাসেল আহমেদ শুরু করেন 'সিস্টেমআই টেকনোলজিস লিমিটেড'। শুরুর দিকে তাদের মূল কাজ ছিল কর্পোরেট অফিসে আইটি হার্ডওয়্যার সরবরাহ করা। নিয়মিত বাজার পরিদর্শনের সময়ই একটি বিষয় তার চোখে পড়ে—অসংখ্য অফিসে পড়ে আছে পুরোনো ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ। কোনোটির ব্যাটারি দুর্বল, কোনোটির সফটওয়্যারের সমস্যা, আবার সামান্য হার্ডওয়্যার ত্রুটির কারণেই কোনো কোনো ডিভাইস ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই তার মনে একটি বড় প্রশ্ন তোলে—ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি কেন এভাবে পরিত্যক্ত হবে? সেই প্রশ্ন থেকেই ২০১৫ সালে জন্ম নেয় কম্পিউটার অদলবদলের এক নতুন ধারণা।
ভাবনাটি ছিল স্পষ্ট। গ্রাহক তার পুরোনো ডিভাইস দিলে সেটির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা হবে, আর সেই মূল্যের বিপরীতে তিনি নতুন কিংবা রিফারবিশড ডিভাইস নিতে পারবেন।
সে সময় বাংলাদেশের বাজারে ওয়ারেন্টিসহ, বিশ্বাসযোগ্য এমন এক্সচেঞ্জ সেবার নজির ছিল প্রায় নেই বললেই চলে। সেই শূন্যস্থান পূরণের লক্ষ্য নিয়েই যাত্রা শুরু করে 'এক্সচেঞ্জকরি'।
২০১৫ সালের মার্চ মাসে রাসেল চালু করেন 'স্বাধীন অফার' নামে এক অভিনব উদ্যোগ। নিয়ম ছিল সহজ—যে কোনো গ্রাহক চাইলে পুরোনো ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ দিয়ে ওয়ারেন্টিসহ একটি নতুন ডিভাইস নিতে পারবেন। 'পুরোনোর বদলে নতুন'—এই ধারণাটিই তখন অনেকের কাছে ছিল একেবারেই ভিন্ন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অফারটি মানুষের কৌতূহল তৈরি করে এবং বাজারে আলাদা করে নজর কাড়তে শুরু করে।
তবে এক্সচেঞ্জের পর পুরোনো ল্যাপটপগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে—এই প্রশ্নও সামনে আসে। সেই ভাবনা থেকেই একই বছরে রাসেল শুরু করেন আরেকটি উদ্যোগ, 'ডিভাইস মামা'। এই উদ্যোগের আওতায় পুরোনো ল্যাপটপগুলো রিফারবিশ করে ওয়ারেন্টিসহ আবার বাজারে আনা হতো। শুরুতে দুশ্চিন্তা ছিল—মানুষ কি সত্যিই পুরোনো ডিভাইসে ভরসা করবে? কিন্তু বাস্তবতা ছিল আশাব্যঞ্জক। মানসম্মত সার্ভিস ও ওয়ারেন্টির কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই গ্রাহকদের আস্থা তৈরি হয়।
যেভাবে কাজ করে 'এক্সচেঞ্জকরি'
'এক্সচেঞ্জকরি' কেবল পুরোনো ল্যাপটপ কেনাবেচার একটি প্ল্যাটফর্ম নয়; ধীরে ধীরে এটি গড়ে তুলেছে একটি পূর্ণাঙ্গ সার্কুলার সিস্টেম। এখানে পুরোনো ল্যাপটপ সংগ্রহ থেকে শুরু করে রিফারবিশমেন্ট, পুনরায় বিক্রি ও রিসাইক্লিং—প্রযুক্তির পুরো জীবনচক্রটিকেই নতুন করে ভাবা হয়। লক্ষ্য একটাই—একটি ডিভাইস যতদিন সম্ভব ব্যবহারযোগ্য রাখা, তার মূল্য নষ্ট না হতে দেওয়া এবং একই সঙ্গে একটি টেকসই ব্যবসায়িক মডেল দাঁড় করানো।
এই মডেলকে কার্যকর করতে শুরু থেকেই তারা জোর দেয় প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানে। গ্রাহককে এখানে দোকানে এসে দরদাম করতে হয় না। এক্সচেঞ্জকরি-র অনলাইন পোর্টালে পুরোনো ডিভাইসের ছবি ও কনফিগারেশন দিলে সেখান থেকেই যাচাই করে একটি প্রাথমিক মূল্য জানানো হয়। গ্রাহক সম্মত হলে তবেই তিনি ডিল সেন্টারে আসেন, অথবা প্রয়োজনে হোম সার্ভিস নেন। পুরো প্রক্রিয়াটি একটি নির্দিষ্ট অটোমেশনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
এর পাশাপাশি রয়েছে এক্সচেঞ্জ সুবিধা। অর্থাৎ, ব্যবহৃত ল্যাপটপের বদলে গ্রাহকেরা নিতে পারেন নতুন কিংবা আরও হালনাগাদ কোনো মডেলের ল্যাপটপ। অনেকের পক্ষেই এককালীন বড় অঙ্কের টাকা খরচ করা সম্ভব নয়—এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই এক্সচেঞ্জকরি বিভিন্ন বাজেটের উপযোগী মানসম্মত রিফারবিশড ল্যাপটপ সরবরাহ করে। ফলে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ফ্রিল্যান্সার ও কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ—সমাজের নানা স্তরের মানুষের কাছে প্রযুক্তি আরও সহজলভ্য হয়ে উঠছে।
কীভাবে নির্ধারিত হয় পুরোনো ল্যাপটপের দাম?
পুরোনো ল্যাপটপের দাম কীভাবে নির্ধারিত হয়—এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাসেল বলেন, "প্রত্যেক ল্যাপটপের একটি নির্দিষ্ট প্রসেসর থাকে। মূলত জেনারেশন অনুযায়ী আমরা দাম ঠিক করি—এটি কোর আই ফাইভের কোন জেনারেশন, সেকেন্ড নাকি থার্ড। এরপর র্যাম, এসএসডি, ব্যাটারি ব্যাকআপ এবং কোনো পার্টস নষ্ট আছে কি না—সবকিছুই বিবেচনায় রাখা হয়। এই প্যারামিটারগুলোর ভিত্তিতেই শেষ দাম নির্ধারণ করা হয়।"
এক্সচেঞ্জকরি যেকোনো ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ বা ডেস্কটপের অদলবদলের সুযোগ রাখে। এমনকি কোনো ডিভাইসের মাদারবোর্ড নষ্ট থাকলেও, অন্য পার্টস ঠিক থাকলে গ্রাহক সেই পার্টসের মূল্যও পেতে পারেন।
বর্তমানে ঢাকায় তাদের তিনটি ডিল সেন্টার রয়েছে—তেজগাঁও লিংক রোড, মিরপুর ১২ ও ধানমন্ডিতে। এসব সেন্টারে এসে গ্রাহকেরা পছন্দের পণ্য নিয়ে যেতে পারেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার গ্রাহক এক্সচেঞ্জকরি-র সেবা নিয়েছেন। প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা কাজ করেছে রানার্স অটোমোবাইল গ্রুপ, সাজিদা ফাউন্ডেশন ও ব্র্যাক কুমনের মতো সংস্থার সঙ্গে।
এখানে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত ল্যাপটপ পাওয়া যায়। এক্সচেঞ্জের হিসাব বোঝাতে গিয়ে রাসেল বলেন, "ধরুন কেউ একটি ল্যাপটপ নিয়ে এলেন, যার মূল্য ধরা হলো ১০ বা ১৫ হাজার টাকা। তিনি যদি ৪০ হাজার টাকার একটি ল্যাপটপ পছন্দ করেন, তাহলে বাকি টাকাটা তাকে যোগ করতে হবে।"
"এটা পুরোপুরি গ্রাহকের পছন্দের ওপর," বলেন তিনি। "যেটা নেবেন, সেই অনুযায়ীই অতিরিক্ত টাকা দিতে হবে।"
ধানমন্ডি কিংবা মিরপুরের ডিল সেন্টারগুলোতে প্রতিদিনই দেখা যায় আগ্রহী গ্রাহকদের ভিড়। কখনো একসঙ্গে আসে চার সদস্যের একটি পরিবার, কখনো একা কোনো শিক্ষার্থী।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সৌরভ কুমার দত্ত পুরোনো ল্যাপটপের বিনিময়ে নতুন ল্যাপটপ কিনে বলেন, "একজন শিক্ষার্থী হিসেবে এক্সচেঞ্জকরি লিমিটেড থেকে এত যুক্তিসংগত দামে মানসম্মত ল্যাপটপ পাওয়া সত্যিই আশীর্বাদের মতো। তাদের সাশ্রয়ী সমাধান আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনা, গবেষণা এবং বিভিন্ন দক্ষতা বৃদ্ধির কাজ আর্থিক চাপ ছাড়াই চালিয়ে যেতে অনেক সহজ করে দিয়েছে।"
এক্সচেঞ্জকরি-র উদ্যোগ কেবল খরচ কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে তাদের মনোযোগ নিয়েও সন্তুষ্ট কর্পোরেট ক্লায়েন্টরা।
ব্র্যাক কুমন-এর সিনিয়র ম্যানেজার জাহিদুল ইসলাম বলেন, "কর্পোরেট ফোকাসড পিসি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে এক্সচেঞ্জকরি লিমিটেড আমাদের হার্ডওয়্যার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। স্থায়িত্ব ও ই-ওয়েস্ট হ্রাসের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি সত্যিই প্রশংসনীয়।"
ঢাকার বাইরের গ্রাহকের জন্য 'টেস্ট বিফোর পে' সেবা
অনলাইনে ল্যাপটপ কেনাবেচা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যে ভীতি কাজ করে, তা দূর করতে এক্সচেঞ্জকরি কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে—জানতে চাইলে রাসেল বলেন, "পুরোনো ল্যাপটপ নিয়ে মানুষের মনে ভয় থাকে—চলবে তো? নষ্ট হয়ে যাবে না তো?"
এই জায়গা থেকেই এক্সচেঞ্জকরি ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা থেকে দূরের গ্রাম বা উপজেলার গ্রাহকদের জন্য তারা চালু করেছে 'টেস্ট বিফোর পে' সেবা। রাসেল বলেন, "ধরুন, কুড়িগ্রামের কোনো গ্রাম থেকে কেউ অর্ডার করলেন। আমরা কোনো অ্যাডভান্স নিই না। শুধু খুব সামান্য ডেলিভারি চার্জ নিই—অনেক সময় সেটা ৩০০ টাকার মতো।" এরপর কুরিয়ারের মাধ্যমে ল্যাপটপ পাঠানো হয়।
"ল্যাপটপ হাতে পেয়ে গ্রাহক সেটি চালিয়ে দেখবেন ১৫–২০ মিনিট, কখনো আরও বেশি সময়। ইউএসবি পোর্ট ঠিক আছে কি না, ব্যাটারি কেমন, পারফরম্যান্স—সব নিজে দেখে তারপর পেমেন্ট করবেন।" এই সুযোগটাই অনলাইনে কেনাকাটার ভয় অনেকটাই দূর করে দেয়। "এই 'টেস্ট বিফোর পে'-এর কারণেই মানুষ আর ভাবে না—খারাপ জিনিস পাঠাবে কি না, ফেক হবে কি না।"
এই আস্থার ফলও মিলছে। এক্সচেঞ্জকরির প্রায় ৪০ শতাংশ বিক্রি হয় অনলাইনে। এমন ঘটনাও কম নয়, যখন গ্রাহক ল্যাপটপ দেখে বলেন, "না, এখানে একটু স্ক্র্যাচ আছে, আমার পছন্দ হয়নি।" তখন কোনো প্রশ্ন ছাড়াই সেই ডিভাইস ফেরত নেওয়া হয়।
এর পাশাপাশি যারা চাইছেন, তারা সরাসরি এক্সচেঞ্জকরির ডিল সেন্টারে এসে নিজের চোখে ল্যাপটপ দেখে নিতে পারেন, হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। শুধু বিক্রি নয়, সার্ভিসিংয়ের ক্ষেত্রেও তারা রেখেছে বাড়তি যত্নের ব্যবস্থা। ঢাকার বাইরে থাকা কোনো গ্রাহক কুরিয়ারে ল্যাপটপ পাঠালে, প্রয়োজনীয় সার্ভিস শেষে সেটি আবার ঠিক করে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়—এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কোনো সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয় না।
পুরোনো ল্যাপটপের ক্ষেত্রে এক্সচেঞ্জকরি দিচ্ছে পাঁচ বছরের বিনামূল্যে সার্ভিস চার্জের সুবিধা। অর্থাৎ নিয়মিত চেকআপ বা ছোটখাটো সমস্যার জন্য গ্রাহককে আলাদা করে সার্ভিস ফি দিতে হয় না। তবে কোনো যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে সেক্ষেত্রে শুধু সেই পার্টসের মূল্যই নেওয়া হয়, বাকিটা সার্ভিস পুরোপুরি বিনামূল্যে। এতে করে দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহকের খরচ যেমন কমে, তেমনি পুরোনো ল্যাপটপ ব্যবহারের ভয়ের জায়গাটাও অনেকটাই কমে আসে।
গ্রাহকের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতে এক্সচেঞ্জকরি রেখেছে তিন দিনের রিটার্ন পলিসিও। কোনো গ্রাহক যদি পুরোনো ল্যাপটপ কিনে মনে করেন এটি তার প্রয়োজন অনুযায়ী নয়, তাহলে তিন দিনের মধ্যে সেটি ফেরত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ ডিভাইসের ডিল হয় এক্সচেঞ্জকরি-তে। এর মধ্যে কর্পোরেট ক্লায়েন্ট ও রিটেল গ্রাহক—সবই অন্তর্ভুক্ত।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন
গত দশ বছরের চলার পথ মোটেও সহজ ছিল না। এই যাত্রায় চ্যালেঞ্জ কম আসেনি—এ কথা বলতে গিয়ে রাসেল স্বাভাবিকভাবেই ফিরে যান শুরুর দিনগুলোতে।
"আমাদের প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল পুরোনো ল্যাপটপের সঠিক দাম নির্ধারণ," বলেন তিনি। শুরুতে অনেক সময়ই ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। "যে ল্যাপটপের দাম হওয়া উচিত আট হাজার টাকা, আমরা কিনে ফেলেছি বারো হাজার টাকায়।"
আরেকটি সমস্যা ছিল ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট। ল্যাপটপ কিনে রেখে দিতে দিতে অনেক সময় সেগুলো নিজেই নষ্ট হয়ে যেত—স্টোরেজে থাকার কারণেই ক্ষতি হতো। কোন ল্যাপটপ রিফারবিশ হবে, কোনটা পার্টস হিসেবে ব্যবহার হবে—এই আলাদা করার প্রক্রিয়াটাও শুরুতে পরিষ্কার ছিল না।
ধীরে ধীরে তারা শিখেছেন, কীভাবে প্রতিটি যন্ত্রকে ভাগ করতে হয়—প্লাস্টিক আলাদা, বোর্ড আলাদা, মেটাল আলাদা করে বিক্রি বা রিসাইক্লিংয়ের জন্য প্রস্তুত করা।
রাসেল জানান, "ভবিষ্যতে বড় পরিসরের একটি রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট করার ভাবনা আছে আমাদের, যেখানে প্রযুক্তি বর্জ্যকে আরও কাঠামোগতভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হবে।"
ছবি: সৌজন্যেপ্রাপ্ত