লঞ্চ আর বাসের খুদে জগৎ: রিমোট-কন্ট্রোলে চলে পারাবাত-সুন্দরবন, রাস্তায় নামে এনা-গ্রিনলাইন
কীর্তনখোলা নদীর তীরে বসে লঞ্চ দেখা ছিল শুভর শৈশবের প্রিয় অভ্যাস। দূরদূরান্ত থেকে ঘাটে যখন লঞ্চ এসে ভিড়ত, শুভর চোখে তা ছিল জাদুর মতো। ইঞ্জিনের শব্দ, পানির ছিটা, আর মানুষের ভিড়—সব মিলিয়ে ঘাটে আসা লঞ্চগুলো যেন হয়ে উঠত তার কল্পনার নৌকা।
মাঝে মাঝে সেই কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে মাটি দিয়ে বানাতেন ছোট ছোট লঞ্চের মডেল। নিজের হাতে গড়া সেই খেলনা লঞ্চে যেন তিনি দেখতেন ভবিষ্যতের স্বপ্ন—একদিন হয়ত সত্যিকারের লঞ্চ বানাবেন নিজের হাতে।
শুরুটা হয়েছিল একান্ত নিজ আগ্রহ থেকেই। বরিশালের মানুষ তিনি, নদীমাতৃক সেই অঞ্চলে লঞ্চ ছিল জীবনের অংশ। যখনই লঞ্চে উঠতেন, একটাই ভাবনা মাথায় ঘুরত—'যদি এই লঞ্চটা রিমোট-কন্ট্রোল দিয়ে চালানো যেত! যদি ছোট একটা লঞ্চ নিজের হাতে বানাতে পারতাম, তাহলে কেমন হতো?'
মায়ের টাকা চুরি করে লঞ্চ তৈরি করা শিখেছি!
কৌতূহল থেকে ভাবনার শুরু—কীভাবে আধুনিক উপায়ে কিছু তৈরি করা যায়। তখন তিনি পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। খালা ও মামার ফোন ব্যবহার করে ইউটিউব আর ফেসবুক থেকে লঞ্চ বানানোর কৌশল শিখতেন।
স্কুলের টিফিনের টাকা জমানোর পাশাপাশি স্বপ্নের লঞ্চ তৈরির খরচ জোগাতে কখনো কখনো মায়ের ব্যাগ থেকেও টাকা নিতে হতো।
শুভ হেসে বলেন, 'বলতে পারেন মায়ের টাকা চুরি করে লঞ্চ তৈরি করা শিখেছি!'
কিন্তু তাতেও সংকট কাটেনি। তাই কৌশলও আঁটতে হয়েছিল। যেমন, আলাদা মোটর কেনার সামর্থ্য না থাকায় খেলনা গাড়ি কিনে তার মোটর খুলে লঞ্চে লাগাতেন।
যেহেতু আসল লঞ্চ লোহা দিয়ে তৈরি হয়, তাই শুভ সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের প্রথম খুদে লঞ্চও বানাবেন লোহা দিয়ে। যেই ভাবা সেই কাজ। পুরোনো আলমারির টিন কেটে তৈরি করলেন একেকটা অংশ। কিন্তু প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। লঞ্চ পানিতে ভেসে থাকতে পারল না, ডুবে গেল। তবু মন ভাঙেনি তার।
তবে এই ব্যর্থতাই খুলে দেয় নতুন সম্ভাবনার দ্বার। জাহাজের ভিডিও ফুটেজ তিনি আপলোড করেন অনলাইনে। কিছুদিন পর দেশের বাইরে থেকে মিয়াদুল নামের এক ইতালি প্রবাসী তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ভদ্রলোকেরও বেশ আগ্রহ জাহাজ নির্মাণে। তিনি নিজ উদ্যোগে শুভকে খুঁটিনাটি বিষয়গুলোতে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন।
তাই আজও শুভ তাকে নিজের 'গুরু' বলে সম্মান করেন। 'আমি যত প্রজেক্ট তৈরি করি, সবসময় উনিই আমাকে দিক-নির্দেশনা দেন,' কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বলেন শুভ।
গুরু মিয়াদুল একদিন শুভকে বলেছিলেন, 'ভালো ফল পেতে হলে ম্যাটেরিয়াল [উপকরণ] বদলাতে হবে। আরও উন্নত উপাদান ব্যবহার করতে শিখতে হবে।' সেই কথাটাই যেন শুভর মনে গেঁথে যায়।
মিয়াদুল শুধু পরামর্শই দেননি, উৎসাহও দিয়েছিলেন কাজটিকে বাণিজ্যিকভাবে এগিয়ে নিতে। আর শুভও এতে বিনা দ্বিধায় রাজি।
কিছুদিনের মধ্যেই মিয়াদুলের তৎপরতায় শুভর হাতে আসে ফাইবার গ্লাস ও আরও কিছু হালকা উপকরণ। বিদেশ থেকে আসে রিমোট, মোটরসহ অন্যান্য উপাদান।
এবার শুভর যাত্রা নেয় এক নতুন মোড়—চলে উপকরণ নিয়ে আরও গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
লোহা বা টিনের ভারী কাঠামোর বদলে এবার মনোযোগ যায় হালকা ও আধুনিক উপাদানের দিকে। ফাইবার গ্লাস, প্লাস্টিক, এমনকি অচেনা কিছু উপাদান নিয়েও শুরু হয় ধারাবাহিক পরীক্ষা। প্রায় সাত থেকে আট মাস পরিশ্রমের পর তিনি তৈরি করেন নতুন লঞ্চ, নাম রাখেন 'পারাবাত-১৮'।
যদিও তাতেও সম্পূর্ণভাবে সফল বলা যায় না, তবে থেমে থাকেননি শুভ। প্রতিটি ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি অর্জন করেন নতুন অভিজ্ঞতা, বাড়ালেন কারিগরি দক্ষতা, এবং ধীরে ধীরে নিজের স্বপ্নের পথে এগোতে থাকলেন।
এরই মধ্যে অনেক দিন পেরিয়ে যায়। লঞ্চের প্রতি আগ্রহকে পাথেয় করে শুভ মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ঠিক করেন, হাতের কাজ দিয়েই নিজেকে প্রমাণ করবেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে তিনি উপলব্ধি করেন, এবার কাজটা সত্যিই বদলে যাচ্ছে—নকশা থেকে ফিনিশিং, সবকিছুতেই এসেছে এক নতুন নিখুঁততা। মুখে আনন্দের হাসি ফুটিয়ে শুভ বলেন, 'আগের চেয়ে ফিনিশিং অনেক ভালো হয়েছে।'
প্রকৃত অর্থে বড় আকারে ও বাণিজ্যিকভাবে তিনি কাজ শুরু করেন ২০২৩ সাল থেকে। এর আগে কয়েক বছর ছিল শেখার, পরীক্ষা-নিরীক্ষার এবং নিজের দক্ষতা যাচাইয়ের সময়।
তিনি ঠিক করলেন, কীর্তনখোলা নদীতে চলা লঞ্চের নাম অনুসারে নিজের লঞ্চের নামকরণ করবেন। সেই কারণেই জন্ম নিল সুন্দরবন-১২, পারাবাত-১৮-এর মতো বড় ও পরিচিত লঞ্চ।
স্ত্রীর অনুপ্রেরণায় লঞ্চ থেকে বাসের জগতে
লঞ্চের কাজ শেষ হওয়ার পর শুভর মনে হলো, এবার কিছু নতুন করা দরকার—এমন কিছু, যা মানুষকে অবাক করবে, আবার তার কারিগরি দক্ষতাকেও আরও এগিয়ে নেবে। এবার এগিয়ে এলেন শুভর বাসপ্রেমী স্ত্রী। অনুপ্রেরণা দিলেন বাস নিয়ে কাজ শুরু করার। সেখান থেকেই শুরু হয় শুভর বাস তৈরির যাত্রা। তবে সেটি ছোট কোনো খেলনা নয়—বরং বড় আকৃতির, রিমোট-কন্ট্রোল বাস, যা রাস্তায় চলে।
শুভ বলেন, 'যখন দেখলাম মানুষ লঞ্চের ভিডিও দেখছে, প্রশংসাও করছে, কিন্তু কিনছে না—তখন বুঝলাম, আমাদের প্ল্যান [পরিকল্পনা] বদলাতে হবে। আমরা লঞ্চ নিয়ে কাজ করেছি, কিন্তু শুধু লঞ্চেই আটকে থাকলে হবে না। আমরা তো ইঞ্জিনিয়ারিং মনস্ক মানুষ— চেষ্টা করতেই হবে নতুন কিছু তৈরি করার।'
সেই ভাবনা থেকেই শুরু হলো তার নতুন স্বপ্ন— বাস। কারণ তার যুক্তিতে, 'বাংলাদেশে বাসের সেক্টরটা বড়, আর আমি বিশ্বাস করি এখান থেকেই আমরা একদিন বড় কিছু করতে পারব।'
যেভাবে তৈরি হয় খুদে বাস
নিজের ধারণা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শুভ বলেন, একটি রিমোট কন্ট্রোল বাস তৈরির মূল উপকরণ হলো প্লাস্টিক ও পিভিসি বোর্ড— যা দেখতে অনেকটা কাঠের মতো হলেও আসলে 'সিন্থেটিক' পদার্থ। এই উপাদান দিয়ে সহজেই যেকোনো আকৃতি দেওয়া যায়। পাশাপাশি তিনি ব্যবহার করেন স্টিল, ফাইবার গ্লাস ও রাবার, যা কাঠামোকে শক্ত ও টেকসই করে তোলে।
ফাইবার গ্লাসকেই তিনি বলেন সবচেয়ে 'ফ্লেক্সিবল' উপাদান। প্লাস্টিকের মতো এটি ভাঙলে পুরো অংশ ফেলে দিতে হয় না—শুধু ক্ষতিগ্রস্ত জায়গাটা মেরামত করলেই আবার আগের মতো হয়ে যায়।
তবে ফাইবার তুলনামূলক ব্যয়বহুল। একটি ফাইবার গ্লাসের বাস তৈরি করতে খরচ পড়ে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা, যেখানে প্লাস্টিকের বাস তৈরি করা যায় ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকায়। আর যদি কম দামের প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়, খরচ নেমে আসে মাত্র ৩,৫০০ থেকে ৩,৬০০ টাকায়।
বাসের টায়ার তৈরি হয় রাবার দিয়ে, কিন্তু ভেতরে টিউব ব্যবহার করা হয় না। শুভর ব্যাখ্যায়, 'রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি তো সবসময় সমান রাস্তায় চলে না। ঘরের বাইরে খারাপ রাস্তাও হতে পারে, তাই টায়ারগুলোকে শক্ত আর গ্রিপযুক্ত করতে হয়।'
তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে অনেকেই এই 'হবি সেক্টর'-এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। শৌখিন মানুষজন 'অফ-রোড' রিমোট কন্ট্রোল গাড়ির প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন, যেগুলোর দাম এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যেও হয়ে থাকে। এসব গাড়ি চলে যেকোনো পৃষ্ঠে— মসৃণ রাস্তা, কাদা বা বালু, সব জায়গাতেই।
শুভর মতে, তাদের তৈরি ছোট গাড়িগুলোর চাহিদা এখন দেশের নানা জায়গায়। 'বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত প্রায় দেড়শ ইউনিট বিক্রি করেছি,' বললেন তিনি গর্বের সঙ্গে। 'এখনও প্রায় বিশটা গাড়ির কাজ চলছে।'
তবে এসব গাড়ি বানাতে সময় লাগে আলাদা আলাদা। ছোট গাড়ি তৈরি করতে লাগে দুই থেকে তিন দিন, আর বড় সাইজের গাড়ির জন্য সময় লাগে এক থেকে দেড় মাস। কিন্তু যেহেতু সব গাড়িই 'হ্যান্ডমেড', তাই অর্ডার নেওয়ার পরই শুরু হয় প্রক্রিয়া— একেবারে নিজের হাতে।
'বড় গাড়ির ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত ১৫ থেকে ২০ দিনের সময় নিই,' বললেন শুভ। 'আজকে অর্ডার দিলে কাল ডেলিভারি সম্ভব নয়। একেকটা গাড়ি বানাতে সময় লাগে, ধৈর্য লাগে।'
তারা প্রতিটি গাড়ির জন্য আলাদা সিরিয়াল নাম্বার রাখেন—১ থেকে ১০০ পর্যন্ত। একশ ইউনিট তৈরি হওয়ার পর নতুন অর্ডার নেওয়া বন্ধ হয়ে যায়, এরপর শুরু হয় পরবর্তী ব্যাচ।
'৬০ দিনের মধ্যে আমরা একশ গাড়ি তৈরি করতে পারি,' হিসেব মিলিয়ে বললেন শুভ।
প্রতিমাসে সর্বসাকুল্যে ১৫ থেকে ২০টি বাস তৈরি করতে পারেন তিনি। নিয়মিত এই গাড়িগুলো গ্রাহকেরা কিনেও নিচ্ছেন, ফলে উৎপাদন ও বিক্রির প্রক্রিয়া চলছেই অবিচ্ছিন্নভাবে।
তবে সব গাড়িই এক রকম নয়। শিশুদের জন্য বানানো ইনডোর গাড়িগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট ও সাশ্রয়ী—প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকায় পাওয়া যায় একটি ১৮ ইঞ্চির গাড়ি।
অন্যদিকে, বড় মাপের মডেল তৈরি হয় প্রায় আড়াই ফিট দৈর্ঘ্যের, যার দাম প্রায় ১২ হাজার টাকা। এই ধরনের বাসে থাকে ইন্ডিকেটর, হেডলাইট, গাড়ির দরজা ও বক্স নিয়ন্ত্রণের সুবিধা। কাদা, মাটি বা বৃষ্টির মধ্যে যেকোনো পরিবেশে চালানো যায় এই বাসগুলো।
কথায় আছে, 'শখের দাম লাখ টাকা'। শুভ ৪ দশমিক ৬ ফুটের একটি ভলভো বাসও তৈরি করেছেন। যদিও এই বাসের বাজার মূল্য ৭০ হাজার টাকা, শখ ও আবেগের খাতিরে তিনি সেটি নিজের কাছেই রেখে দিয়েছেন।
শহরের বড় পরিবহন সংস্থার নাম যেমন এনা, গ্রিনলাইন বা ইউনিক পরিবহন—এসব নামও দেখা যায় শুভর তৈরি ছোট গাড়িগুলোর গায়ে। ছোট মডেল হলেও এতে ফুটে ওঠে বড় গাড়ির স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্য।
বাসের চেয়েও জটিল লঞ্চের নির্মাণশৈলী
বাসের চাহিদা বেশি হলেও লঞ্চের নির্মাণ কৌশল তুলনামূলকভাবে জটিল। প্রথমে লঞ্চের কাঠামো বা 'মেরুদণ্ড' তৈরি করে নিচের অংশে গোলাকার আকৃতি দিতে হয়, যা পানির প্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিক রাখে। এরপর ফাইবার গ্লাস লাগিয়ে মসৃণ করা হয়। বডির কাজে অ্যালুমিনিয়াম, প্লাস্টিক, ফাইবার ও স্টিলের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়।
লঞ্চের মোটর শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি রিমোটের রেঞ্জও বেশি রাখতে হয়। ঢেউয়ে যেন উল্টে না যায়, সেজন্য 'স্ট্যাবিলাইজার' ব্যবহার করা হয়।
এই সমস্ত উপকরণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারে লঞ্চের খরচ দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৪৫ হাজার টাকার মধ্যে। বিক্রির মূল্য থাকে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। লাভ সীমিত—প্রতি জাহাজে মাত্র ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। ফলে, সাধারণ মানুষের জন্য কিনতে তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল হলেও, লঞ্চ প্রেমীদের জন্য এটি এখনো আকর্ষণীয়।
গ্রাহকের খুশি, কারিগরের পরিশ্রম
খিলগাঁওয়ের দাশেরকান্দিতে শুভর 'এনএফএস প্রোডাকশন' অফিসে ছয়জন কর্মী কাজ করেন। শুভ নিজে তাদের কাজ শেখান এবং প্রতিটি মডেলের মান নিশ্চিত করেন। ডকইয়ার্ডে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকলেও এখন তার পূর্ণ মনোযোগ বাস ও লঞ্চ তৈরিতে। তার স্বপ্ন বাংলাদেশে একটি 'টয় ইন্ডাস্ট্রি' তৈরি করা।
বাস বা লঞ্চ অর্ডার করতে চাইলে গ্রাহক ঘুরে আসতে পারেন 'এনএফএস প্রোডাকশন লিমিটেড'-এর ফেসবুক পেজে, যেখানে শুভ নিয়মিত অর্ডার নেন। চাইলে খিলগাঁওয়ের দাশেরকান্দির অফিসে সরাসরি এসে অর্ডার দেওয়া সম্ভব।
নির্ধারিত সময় শেষে বাস গ্রাহক নিজেই নিতে পারেন, অথবা ডেলিভারি প্রতিষ্ঠান মারফত বাস পৌঁছে দেওয়ার সুবিধা আছে। তবে 'ক্যাশ অন ডেলিভারি' সেবার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত রয়েছে—গ্রাহককে অর্ডারের আগে মোট মূল্যের ৩০ শতাংশ পরিশোধ করতে হবে, তারপরই ক্যাশ অন ডেলিভারির সুবিধা পাওয়া যায়।
গ্রাহকদের কাছ থেকেও শুভ পাচ্ছেন ইতিবাচক সাড়া। আবুল বাশার নামের এক গ্রাহক কিছুদিন ধরে শুভর তৈরি গাড়ি ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন, 'গাড়ির ফিনিশিং ভালো। আলহামদুলিল্লাহ, অনেক ভালো চলছে।' তবে অনেক গ্রাহকের আবদার থাকে—ছোট গাড়ির ফিনিশিং যেন বড় মডেলের মতো নিখুঁত হয়।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাসের অর্ডার আসে শুভর কাছে। পটুয়াখালির রাইসুল ইসলামও অর্ডার দিয়েছেন ৩ দশমিক ৬ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি বাসের। তার চাহিদা ছিল একদম আসল বড় বাসের মতো—সাসপেনশন, ইন্ডিকেটর, ওয়াইপার, ইঞ্জিন-সাউন্ড সব কিছু মিলিয়ে তৈরি সাড়ে তিন ফুটের এই বাস। রাইসুল বলেন, 'আমি চেয়েছি আসল বাসের মতো সব বৈশিষ্ট্য। সেরকমই সবটা পেয়েছি।'
শুভর জন্য এটি তৈরি করা সহজ ছিল না; প্রায় তিন মাস সময় ব্যয় করে তিনি রাইসুলের জন্য বানিয়েছেন 'গ্রিনলাইন ডাবল ডেকার এসি বিজনেস-ক্লাস কোচ' বাস।
যত্ন করে রেখে দিয়েছেন সবচেয়ে বড় লঞ্চটি
শুভ বিশ্বাস করেন, এই কাজের আসল অংশই শেখা। তার ভাষায়, 'ক্রেতাকে সন্তুষ্ট করার আগে নিজেকে শেখাতে হয়।' তিনি জানেন, কোনো কাজের সামান্য ত্রুটিও ক্রেতার চোখে বড় হয়ে দেখা দেয়। তাই প্রতিটি প্রকল্পে তিনি রাখেন সূক্ষ্ম মনোযোগ। তার কাছে এটি শুধু ব্যবসা নয়—সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে পাওয়া এক 'গড গিফটেড' শক্তি, যা দিয়ে তিনি মানুষের মন জয় করতে পারেন।
তবুও বাস্তবতা কঠিন। তার তৈরি সব মডেলই হাতে বানানো—একেবারে নিজস্ব কারিগরিতে। কোম্পানির মানের মতো নিখুঁত ফিনিশিং আনতে চান তিনি, কিন্তু সেটি সবসময় সম্ভব হয় না।
কারণ দেশের ভেতরে উন্নত মানের উপকরণ পাওয়া যায় না, আর বিদেশ থেকে আনতে গেলে খরচ বেড়ে যায় কয়েকগুণ— ট্যাক্স, কাস্টমস, নানা জটিল প্রক্রিয়া।
কথার শেষে তার চোখে গর্ব আর আবেগের ঝিলিক দেখা যায়। তিনি বলেন, 'আমার নিজের তৈরি একটি রিমোট-কন্ট্রোল জাহাজ আছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়। প্রায় দেড় লক্ষ টাকা খরচে বানিয়েছি। ৬০ কেজি ওজন বহন করতে পারে, ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার গতি তোলে। এমনকি একবার আমরা সেই জাহাজ দিয়ে একটি নৌকায় ছয়জন মানুষ টেনে নিয়েছি।'
তবে সেই লঞ্চটি তিনি বিক্রি করেননি, নিজের কাছেই রেখেছেন। কারণ এটি শুধু একটি প্রজেক্ট নয়, তার আত্মার একটি অংশ।
ছবি: সৌজন্যেপ্রাপ্ত