ঈদ কার্ড: হারিয়েও ফিরে আসে বারবার
'নাইন্টিজ কিড' বা নব্বইয়ের দশকে যারা বড় হয়েছেন—ঈদ কার্ড তাদের কাছে এক আবেগের নাম। সেসময় প্রযুক্তির এত বিস্তার ছিল না। মোবাইলে আঙুলের দু টোকায় ঈদের শুভেচ্ছা পাঠানো যেত না। তখন একজন আরেকজনকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাত ছোট-বড় ঈদ কার্ডের মাধ্যমে।
পনেরো রোজা থেকেই পাড়ায় মহল্লায় চেয়ার টেবিল পেতে বিক্রি শুরু হতো রঙ-বেরঙের ঈদ কার্ড। শিশু থেকে তরুণ, সবাই ঈদ কার্ডে ঈদের শুভেচ্ছাবাণী লিখে একজন আরেকজনকে দিত। বাহারি রঙ আর নকশাওয়ালা সেসব কার্ডে থাকতো চাঁদ-তারা, ফুল-লতা-পাতা, বিভিন্ন কার্টুন এবং সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের ছবি। বাংলা, ইংরেজি এবং আরবি ভাষাতেও লেখা থাকতো 'ঈদ মোবারক'।
ছোটবেলায় পাওয়া ঈদ কার্ড
এক ভাজের মিনি ঈদ কার্ডই সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল। আবার কিছু ঈদ কার্ডের ভেতরে থাকতো কয়েকটি স্তরের ভাজ। কার্ড খুললেই কাগজের ভাজে ফুটে উঠতো ফুল বা পাখি। আবার কিছু দামি কার্ডে থাকত ছোট ছোট মেশিন। কার্ড খুললে বেজে উঠতো সুরেলা গান। দশ পয়সা থেকে শুরু করে পাঁচ টাকা পর্যন্ত হতো একেকটি ঈদ কার্ডের দাম।
স্কুলের টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে অথবা বাবা-মা'র কাছে আবদার করে কিছু টাকা জমিয়ে ঈদ কার্ড কিনতো শিশুরা। ঢাকা শহরে বড় বড় কার্ডের দোকানে লম্বা লাইন থাকতো ঈদের আগের দিন পর্যন্ত। আর পাড়ায়-মহল্লায় চেয়ার টেবিল পেতে, সুতোয় ঈদ কার্ড ঝুলিয়ে চলতো বিক্রি।

শুধু শিশু-কিশোররা নয়, বয়সীরাও ঈদ কার্ড কিনতেন পরিবারের সদস্য কিংবা সহকর্মীদের ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য। অনেকে আবার ঈদ কার্ডের ভেতরে সালামি দিয়ে দিতেন শিশুদের। সালামি দেয়ার জন্য আলাদা কাটআউট থাকতো কিছু কার্ডের ভেতরে।
হাতে বানানো ঈদ কার্ড দেয়ার প্রচলনও ছিল। নানা রঙের পোস্টার কাগজ, জরি কলম, আঠা—এসব কিনে কাগজ কেটে ঈদ কার্ড বানিয়ে দিত অনেকে। নিজ হাতে প্রিয়জনের জন্য কিছু তৈরি করার আনন্দটা পাওয়া যেত তখন।
কিন্তু সময় যত গিয়েছে, প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে হারিয়ে গিয়েছে আমাদের ঈদ কার্ড দেয়া-নেয়ার সংস্কৃতি। ২০১০ সালের পর থেকে কার্ডের বদলে মেসেজে বা ফোনে ঈদের শুভেচ্ছা জানানো শুরু হয়েছে। এরপর ধীরে ধরে কমতে শুরু করে ঈদ কার্ডের প্রচলন।
২৫ বছর ধরে ঈদ কার্ড বিক্রি করেন আলী আজম
ঢাকার পুরান পল্টনে কার্ডের সবচেয়ে বড় দুই দোকান আইডিয়াল প্রোডাক্টস আর আজাদ প্রোডাক্টস। আজাদ প্রোডাক্টসে ২৫ বছর ধরে কাজ করছেন আলী আজম। এখন ঈদ কার্ডের ব্যবসা কেমন জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'আজকে থেকে ১২-১৩ বছর আগেও আমাদের দোকানের সামনে লাইন পড়তো ঈদ কার্ড কেনার জন্য। আমাদের পুরো বছরের ব্যবসা কয়েকদিনেই হয়ে যেত। এখন আর ঈদ কার্ড পয়সা দিয়ে কিনে না কেউ। আমরা আগে লাখ লাখ ঈদ কার্ড প্রডাকশন করতাম। এখন হাজারখানেক করি। কালেভদ্রে দু-একজন কাস্টমার এসে ঈদ কার্ড কিনে নেয়'।

আইডিয়াল প্রোডাক্টসের পুরান পল্টন শাখার ম্যানেজার আরিফুল ইসলাম মানিক ও প্রায় ২৫ বছর ধরে এখানে কাজ করছেন। তিনি বলেন, 'আইডিয়াল প্রোডাক্টসের একসময় সারাদেশে ১৭টি শাখা ছিল। এখন কমতে কমতে সে সংখ্যা চারে নেমেছে। আমাদের সবচেয়ে লাভের সিজন ছিল এই ঈদের সময়টা। দোকানের সামনে দুইজন অতিরিক্ত দারোয়ান থাকতো শুধু ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য। এখন আর সেই দিন নেই। এই মাসেই আমাদের নিউমার্কেটের শাখাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বেশিদিন আর এই ব্যবসা টিকবে না। এখন সবাই কম্পিউটারে ডিজাইনের কাজ পারে। বিয়ের কার্ডও অনেকে নিজেই বানিয়ে নেয়'।
তবে আনন্দের ব্যাপার হলো, ঈদ কার্ড আদান-প্রদানের প্রচলন কমে গেলেও, মানুষের মন থেকে শৈশবের এই স্মৃতি একবারে মুছে যায়নি । এখনও অনেকে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ঈদ কার্ড আবার ফিরিয়ে আনার।
কিছুদিন আগে মাগুরা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ঈদ কার্ড তৈরির প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রায় ৩০০ শিশু ও তাদের অভিভাবকরা অংশ নেন হাতে বানানো ঈদ কার্ড তৈরির প্রতিযোগিতায়। রঙ, তুলি, আর পোস্টার কাগজ দিয়ে নানা রকম ঈদ কার্ড তৈরি করেন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীরা। প্রতিযোগিতা শেষে নয়জন শিশুকে পুরস্কৃত করা হয়।

ফেসবুকের বিভিন্ন পেজেও ঈদ কার্ড বিক্রি হচ্ছে। নানা ধরনের ব্যতিক্রমী ডিজাইনের ঈদ কার্ড পাওয়া যায় এসব পেজে। এসব ঈদ কার্ডের বিশেষত্ব হলো এগুলোর সাথে সালামি হিসেবে টাকা দেয়ার ব্যবস্থা থাকে। এছাড়াও, অনলাইনে ঈদ কার্ডের বিক্রেতারা কাস্টমাইজড কার্ডও তৈরি করেন। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী তাদের পছন্দমতো ঈদ কার্ড বানিয়ে দেয়া হয়। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক ডিজাইনের এসব ঈদ কার্ডের অনেক চাহিদা এখন।
তিন বছর ধরে অনলাইন ঈদ কার্ড বিক্রি করেন স্বর্ণালী রাব্বি রাকা। তার ফেসবুক পেজের নাম 'স্প্লেন্ডিড টাচ'। রাকা জানান, প্রতি বছর ঈদের কয়েকদিন আগেই তার পেজের সব ঈদ কার্ড বিক্রি হয়ে যায়। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি—ক্রেতারা আগেভাগেই তাদের পছন্দের ঈদ কার্ড কিনে নিচ্ছেন। এছাড়া, কাস্টমাইজড অর্ডারও নিচ্ছেন তিনি, যা ক্রেতাদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে।

আইডিয়া প্রোডাক্টস আর আজাদ প্রোডাক্টসে এখন মিনি ঈদ কার্ড খুব একটা বিক্রি হয় না। তবে চাহিদা আছে একটু বড় আকারের ঈদ কার্ডে, দাম ১০ থেকে ২০ টাকা । সাধারণত কর্পোরেট অফিসগুলোই এই ধরনের ঈদ কার্ড ব্যবহার করে। এছাড়াও রাজনৈতিক অঙ্গনে ঈদের সময় শুভেচ্ছা হিসেবে ঈদ কার্ড দেয়ার প্রচলন আছে। এরাই মূলত এখন দোকান থেকে ঈদ কার্ড কেনার মূল ক্রেতা।
বড়দের কাছ থেকে সালামি পাওয়া ছোটদের ঈদের আনন্দকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে—এই চিরচেনা সংস্কৃতি যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পেয়েছে ডিজিটালের ছোঁয়া। দেশের অন্যতম বড় মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ কয়েক বছর আগে চালু করেছিল ঈদের সালামি পাঠানোর সুবিধা, যেখানে টাকা পাঠানোর পাশাপাশি যুক্ত করা যেত ঈদের শুভেচ্ছাবার্তা।
এ বছর বিকাশের উদ্যোগ হয়েছে আরও ব্যতিক্রমী। শুধু বার্তা নয়, এবার অ্যাপের মাধ্যমে পাঠানো যাচ্ছে নানা ডিজাইনের ডিজিটাল ঈদ কার্ডও। নতুন এই সুবিধা প্রযুক্তিপ্রেমী ব্যবহারকারীদের বেশ মনে ধরেছে। ডিজিটাল যুগের ঈদ শুভেচ্ছা জানানোর এ অভিনব উদ্যোগ ইতোমধ্যেই নেটিজেনদের নজর কেড়েছে।

'নস্টালজিয়া কার্ডস'
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সানজিদা চৌধুরী অরিন, নবনিতা সাহা এবং আনিকা আজাদ। রমজানের শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় পাঠাগারের সামনে একটি ছোট্ট টেবিল নিয়ে বসেছিলেন তারা—বিক্রি করেছেন রঙ-বেরঙের ঈদ কার্ড ও স্টিকার। তাদের এই ছোট্ট স্টলের নাম দিয়েছিলেন 'নস্টালজিয়া কার্ডস।'
প্রথম দিন থেকেই পেয়েছেন ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের অভূতপূর্ব সাড়া। নবনিতা সাহা বলেন, প্রতিদিন গড়ে আমরা ৭০ জনের বেশি ক্রেতা পেয়েছি। ক্রেতাদের রেসপন্স খুবই অসাধারণ ছিল। স্টলে এসে অনেকেই বাচ্চাদের মতো খুশি হয়েছেন, ছোটবেলার ঈদ কার্ড বিনিময়ের স্মৃতি ভাগ করে নিয়েছেন'।

তবে স্টক শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং ব্যক্তিগত কিছু কারণে পাঁচ দিনের বেশি স্টল চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি তাদের পক্ষে। কিন্তু এরপরও ক্রেতাদের তুমুল আগ্রহ ছিল। নবনিতা জানান, অনেকেই তাকে ঈদের পরেও তার এই স্টল চালু রাখতে উৎসাহ দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, 'আমাদের একটি অন্যতম সুন্দর স্মৃতি হচ্ছে যখন ক্রেতারা গুণে গুণে নিজেদের বন্ধু বা পরিবারের ছোট ভাই-বোনদের জন্য কার্ড কিনে নিচ্ছিলেন, বা আমাদের সামনেই কার্ডে নাম লিখে বন্ধুদের হাতে দিচ্ছিলেন। অনেক ক্রেতাই একদিন কিনে নিয়ে পরদিন আবারো এসেছেন আরও কার্ড নিতে। ছোটবেলার সেই নস্টালজিয়া ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য থেকেই আমাদের "নস্টালজিয়া কার্ডস" শুরু করা। ক্রেতাদের স্বতঃস্ফূর্ত রেসপন্স দেখে মনে করি আমরা সত্যিই সফল!'
আমাদের দেশের নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না ঈদ কার্ডের সংস্কৃতি নিয়ে। নির্মল এই আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়ার প্রথা সবসময় টিকিয়ে রাখাই হোক আমাদের উদ্দেশ্য।
ছবি: ফাইয়াজ আহনাফ সামিন/টিবিএস