৯৬ বছর বয়সে অভিনয় থেকে অবসর নিলেন কিংবদন্তি ক্লিন্ট ইস্টউড
সাত দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ার এবং ঝুলিতে ৭০টিরও বেশি চলচ্চিত্র নিয়ে অবশেষে হলিউড থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা ও পরিচালক ক্লিন্ট ইস্টউড। গত ৩১ মে (রবিবার) ৯৬ বছরে পা দেওয়া চারবার অস্কারজয়ী এই তারকা বিদায় জানালেন রুপালি জগতকে।
গত শতকের ষাটের দশকে জনপ্রিয় টিভি সিরিজ 'রোহাইড'-এর মাধ্যমে আলোচনায় আসেন ইস্টউড। এরপর সার্জিও লিওনের বিখ্যাত স্প্যাগেটি ওয়েস্টার্ন 'ডলারস ট্রিলজি'র মাধ্যমে তিনি বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেন, যার মধ্যে অন্যতম ছিল 'দ্য গুড, দ্য ব্যাড অ্যান্ড দ্য আগলি'।
সত্তরের দশকে 'প্লে মিস্টি ফর মি' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালনার হাতেখড়ি হয় তাঁর। পরবর্তী ছয় দশকে তিনি একে একে উপহার দেন 'আনফরগিভেন', 'মিলিয়ন ডলার বেবি', 'চেঞ্জলিং', 'গ্র্যান তোরিনো', 'আমেরিকান স্নাইপার' এবং 'দ্য মিউল'-এর মতো কালজয়ী সব সিনেমা। অভিনেতা থেকে সফল পরিচালক হয়ে ওঠার এক অনন্য উদাহরণ তিনি। নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট ঘরানায় সীমাবদ্ধ রাখেননি ইস্টউড; থ্রিলার, বায়োপিক, রোমান্স, যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র কিংবা মিউজিক্যাল—সবক্ষেত্রেই তিনি দেখিয়েছেন নিজের মুন্সিয়ানা। দ্রুততম সময়ে কাজ শেষ করা এবং বাজেটের চেয়ে কম খরচে ছবি নির্মাণের জন্য তাঁর বিশেষ সুখ্যাতি ছিল।
ইস্টউড কি নতুন কোনো সিনেমা নিয়ে আসছেন?—ভক্তদের মনে থাকা এমন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন তাঁর ছেলে, সংগীতশিল্পী ও সুরকার কাইল ইস্টউড। বাবার বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করা কাইল এক অনুষ্ঠানে ক্লিন্ট ইস্টউডের অবসরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সম্প্রতি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে কাইলকে বলতে শোনা যায়, "বাবার সাথে কাজ করার অনেক চমৎকার স্মৃতি আছে আমার। তিনি এখন অবসরে, তাঁর বয়স এখন ৯৫ (বর্তমানে ৯৬)। আমি নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করি তাঁর অনেকগুলো ছবিতে কাজ করতে পেরে। আমার জন্য এটি ছিল এক দারুণ অভিজ্ঞতা।"
নিজের কাজের প্রতি অগাধ নিষ্ঠার জন্য পরিচিত ইস্টউড প্রায়ই তাঁর পরিচালিত ছবিগুলোতে অভিনয় করতেন। পর্দায় তাঁর শেষ পারফরম্যান্স ছিল ২০২১ সালের 'ক্রাই মাচো' ছবিতে। আর পরিচালক হিসেবে তাঁর সর্বশেষ কাজ ছিল ২০২৪ সালের লিগ্যাল থ্রিলার 'জুরি নম্বর ২', যেখানে অভিনয় করেছেন নিকোলাস হোল্ট এবং টনি কোলেট।
ইস্টউডের সাথে তিনবার কাজ করা অভিনেত্রী লরা লিনি তাঁর কাজের ধরন সম্পর্কে বলেন, ক্লিন্ট সেটে কখনও চিৎকার করতেন না। এর কারণ হিসেবে লরা জানান, ষাটের দশকে 'রোহাইড'-এর মতো ওয়েস্টার্ন সিনেমা করার সময় ইস্টউড দেখেছিলেন যে সেটে বেশি শব্দ করলে ঘোড়াগুলো ভয় পেয়ে যায়। সেই থেকেই শান্তভাবে কাজ করার অভ্যাস তাঁর। লরা লিনি তাঁর 'অ্যাবসোলিউট পাওয়ার' (১৯৯৭), 'মিস্টিক রিভার' (২০০৩) এবং 'সালি' (২০১৬) ছবিতে অভিনয় করেছেন। লরা বলেন, "তাঁর সেটে কীভাবে শান্ত থাকতে হয়, তা আমি শিখেছি। তিনি সাধারণত একটি টেইক নিতেন। তিনি সব সময় একই ক্রু নিয়ে কাজ করতেন। তিনি খুব নিচু স্বরে কথা বলেন। ক্যামেরার পাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্য দেখেন এবং বলেন— 'ঠিক আছে, থামতে পারো। তোমার কি ভালো লেগেছে? আমার তো ভালো লেগেছে। ফোকাস কি ঠিক ছিল? ঠিক আছে, আমরা পরবর্তী দৃশ্যে যেতে পারি'।"
লরা আরও বলেন, "তিনি এভাবেই কাজ করেন। তিনি কখনও 'অ্যাকশন' বা 'কাট' বলে চিৎকার করেন না। কারণ সবাই মানুষ এবং চিৎকার করলে মনোযোগ নষ্ট হয়, যেখান থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে সময়ের প্রয়োজন হয়।"
ক্লিন্ট ইস্টউডের নির্দেশনায় অভিনয় করে মোট পাঁচজন তারকা অস্কার জিতেছেন: জিন হ্যাকম্যান (আনফরগিভেন), শন পেন ও টিম রবিনস (মিস্টিক রিভার), হিলারি সোয়াঙ্ক এবং মরগান ফ্রিম্যান (মিলিয়ন ডলার বেবি)।
প্রয়াত অভিনেতা রিচার্ড হ্যারিস, যিনি ১৯৯২ সালের 'আনফরগিভেন' ছবিতে কাজ করেছিলেন, তিনি ইস্টউডের প্রস্তুতিকে 'বিস্ময়কর' বলে অভিহিত করেছিলেন। অভিনেত্রী হিলারি সোয়াঙ্ক বলেন, "তিনি সবাইকে খুব সহজে কমফোর্টেবল করে দেন।" অন্যদিকে মরগান ফ্রিম্যান ইস্টউডকেই তাঁর জীবনের সেরা পরিচালক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
১৯৯৫ সালের 'দ্য ব্রিজেস অব ম্যাডিসন কাউন্টি' ছবির সহ-অভিনেত্রী মেরিল স্ট্রিপ জানান, স্টুডিও কর্তৃপক্ষ যখন ৪৫ বছর বয়সে তাঁকে নারী চরিত্রের জন্য 'বেশি বয়স্ক' মনে করেছিল, তখন ইস্টউড তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এবং তাঁর পক্ষেই লড়াই করেছিলেন। ক্লিন্ট ইস্টউডের এই প্রস্থান হলিউডের একটি স্বর্ণালী অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবেই দেখছেন চলচ্চিত্র বোদ্ধারা।
