ঢাকার সেই দিন: যখন পাড়াই ছিল আমাদের জগৎ
আজিমপুরের ছোট ভাট জামে মসজিদ এলাকার কথা মনে পড়লেই পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী আলাউদ্দিন গাজীর মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
'এটা ছিল আমাদের খেলার মাঠ। টেপ প্যাঁচানো টেনিস বলে এখানেই আমি ক্রিকেট শিখেছি। বল নর্দমায় পড়লে কেউ তুলতে চাইত না, কিন্তু শেষমেশ কাউকে না কাউকে তো তুলতেই হতো', তিনি বলেন।
স্মৃতিচারণ করে তিনি আরও বলেন, 'কিশোররা যখন ফুটবল খেলত, বড়রা দাঁড়িয়ে দেখত। কে ভালো খেলে, তা পুরো পাড়ার সবাই জানত। ক্রিকেট খেলার সময় ছক্কা মেরে যদি কোনো দোকানের কাচ ভেঙে ফেলতাম, তবে সবাই মিলে দৌড়ে পালাতাম।'
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, 'এখনকার বাচ্চারা তো ঘরবন্দী। ওদের জগতটাই আলাদা। পাড়ার সেই একাত্মতা বা ঐক্যের আনন্দ ওরা জানে না।'
সেই আপন ভাব, যা এক সময় ঢাকার প্রতিটি অলিগলি, উঠান আর ছাদের সঙ্গে মিশে ছিল, আজকের নগরীতে তা খুঁজে পাওয়া দায়। যারা আশির বা নব্বইয়ের দশকে এই শহরে বেড়ে উঠেছেন তাদের মতে, শহরটা তখন হয়তো খুব পরিষ্কার বা শান্ত ছিল না, কিন্তু অনেক বেশি আপন ছিল। ক্রিকেট খেলার সুবাদে অপরিচিতরাও ভাই হয়ে যেত। পাড়ার কারও অসুখ হলে কিংবা স্থানীয় টুর্নামেন্টে কোনো ছেলে গোল করলে পুরো গলি এক হয়ে যেত।
গাজী বলেন, 'পাড়া শব্দটা শুধু ভৌগোলিক অবস্থান বোঝাত না, এর গভীরতা ছিল আরও বেশি। এর মানে ছিল নিরাপত্তা আর এক ধরণের সামাজিক বন্ধন। আজ সেই বন্ধনের উষ্ণতাটুকু বেঁচে আছে কেবল তাদের গল্পে, যারা সেই জীবনটা পার করে এসেছেন।'
আজকের ঢাকা একেবারেই অন্যরকম। জাতিসংঘের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীর জনসংখ্যা এখন প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ; যা ২৫ বছর আগের তুলনায় দ্বিগুণ। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহর হারিয়েছে তার উন্মুক্ত পরিসর।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) একটি জরিপ বলছে, ঢাকায় খেলার মাঠ ও খোলা জায়গার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। দুই দশক আগেও যেখানে প্রায় ১৫০টি মাঠ ছিল, এখন তা মাত্র ২৪টিতে এসে ঠেকেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট আরও তীব্র; নগর পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুযায়ী শহরে বর্তমানে প্রায় ৭৯৫টি খেলার মাঠের ঘাটতি রয়েছে। জায়গার এই সংকটে হারিয়ে গেছে দলবেঁধে খেলাধুলা, খোলা আকাশের নিচে আড্ডা কিংবা শৈশবের দুরন্তপনা—যেগুলো এক সময় পাড়াকে এক সুতোয় বেঁধে রাখত।
সবুজ ও উন্মুক্ত জনপরিসরের সংখ্যাও তীব্রভাবে কমে গেছে। এক সময় যেখানে শিশুদের খেলা বা প্রতিবেশীদের আড্ডার জন্য উঠান বা মাঠ ছিল, সেখানে এখন শুধুই কংক্রিটের দালান, সরু গলি আর বাণিজ্যিক স্থাপনা। অনেক ওয়ার্ডে নিরাপদ কোনো খেলার মাঠ বা পার্ক নেই। ফলে শিশু, এমনকি বড়রাও শরীরচর্চা বা দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ফলাফল হিসেবে গড়ে উঠেছে এমন এক শহর, যা আকারে বড়, ঘনবসতিপূর্ণ এবং আধুনিক; কিন্তু যেখানে স্বতঃস্ফূর্ত খেলা, সান্ধ্যকালীন আড্ডা, উৎসব উদযাপন আর প্রতিবেশীর ওপর আস্থার সেই 'পাড়া কালচার' খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় পাড়ার সেই পুরনো মেজাজ সাময়িকভাবে ফিরে এসেছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যখন রাস্তায় পুলিশ ছিল না, তখন ডাকাতির গুজব ছড়িয়ে পড়ে।
সেসময় উত্তরা, আজিমপুর, গুলশান, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর এবং পুরান ঢাকার বাসিন্দারা রাত জেগে এলাকা পাহারা দিয়েছেন। তরুণ ও মধ্যবয়সীরা গলিতে গলিতে টহল দিয়েছেন, দোকানপাটের খোঁজ নিয়েছেন, একে অন্যকে হাঁক-ডাক দিয়েছেন এবং নিশ্চিত করেছেন যেন কোনো বাড়ি অরক্ষিত না থাকে।
কয়েক রাতের জন্য হলেও অপরিচিতরা আবার কথা বলেছেন, চায়ের কাপ হাতে গল্প করেছেন এবং পাশের মানুষটাকে বিশ্বাস করার সেই অনুভূতি ফিরে পেয়েছেন। আতঙ্ক ছিল ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে ছিল সেই ঢাকার এক ঝলক, যে ঢাকা নিজের মানুষদের আগলে রাখত।
মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির ২২ বছর বয়সী বাসিন্দা শাহরিয়ার হোসেন জানান, সরকার পতনের পরের রাতগুলো ছিল অদ্ভুত রকমের অন্যরকম। তিনি বলেন, 'আমি এখানে দীর্ঘদিন ধরে আছি, কিন্তু চিনতাম শুধু ফার্মেসির লোক, মুদি দোকানদার কিংবা চায়ের দোকানদারকে। কোনো প্রতিবেশীকে চিনতাম না। কিন্তু যখন আমরা রাত জেগে এলাকা পাহারা দিলাম, তখন পাশের ভবনের সমবয়সীদের সঙ্গে পরিচয় হলো। কথা হলো, সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত হলাম। মনে হলো, প্রথমবারের মতো জায়গাটা শুধু বসবাসের স্থান নয়, বরং একটা সত্যিকারের "পাড়া" হয়ে উঠেছে।'
পুরান ঢাকার চকবাজারে সরু গলিগুলোতে এখনো মসলা, কাবাব আর পুরনো শহরের ইতিহাসের গন্ধ ভাসে, কিন্তু বদলে গেছে সেখানকার শব্দপট।
৪১ বছর বয়সী মুদি দোকানি মাকসুদ ইকবাল নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকের কথা স্মরণ করেন, যখন পুরো পাড়াটা ছিল একান্নবর্তী পরিবারের মতো। তিনি হাসতে হাসতে বলেন, 'শীতকালে গানের অনুষ্ঠান হতো, এমনকি যাত্রা ও নাটকও হতো। বিদ্যুৎ চলে গেলে আমরা হারিকেন জ্বালাতাম। প্রতি শীতে ব্যাডমিন্টন খেলতাম। আমরা সবাইকে চিনতাম। আর এখন? মানুষ এখানে যার যার মতো একা থাকে।'
মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডে হাসাহাসি আর উল্লাসের ফিসফাস আজও যেন বাতাসে ভাসে। ৩০ বছর বয়সী পেশাদার গ্রাফিক ডিজাইনার মাজহারুল হক রাফি 'সানরাইজ বয়েজ ফুটবল ক্লাব'-এর দিনগুলোর কথা মনে করেন।
কণ্ঠে নস্টালজিয়া নিয়ে তিনি বলেন, 'পাড়ার কাকারা চাঁদা তুলে আমাদের জার্সির ব্যবস্থা করতেন। আমাদের খেলা দেখার জন্য পুরো ব্লক রাস্তায় নেমে আসত। আমরা বন্ধুত্ব শিখেছিলাম সেখান থেকেই। এখন সেই জমি একজন ডেভলপারের দখলে। আমার ছোট ভাইটা কখনো ঠিকমতো বাইরে ফুটবল খেলতেই পারলনা। তাজমহল রোডের পানির ট্যাঙ্কি মাঠ আর মোহাম্মদপুর ঈদগাহ মাঠই এখন একমাত্র ভরসা, কিন্তু সেগুলোতে এত ভিড় থাকে যে খেলার মাঠের চেয়ে বাজারই মনে হয় বেশি।'
এদিকে, ধানমন্ডিতে পরিবর্তন সমৃদ্ধি নিয়ে এসেছে ঠিকই, কিন্তু দুর্বল করেছে সামাজিক জীবন।
৫৩ বছর বয়সী পারভীন হোসেন ঈদের সকালের কথা মনে করেন, যখন বাচ্চারা ঝুড়ি হাতে দরজায় দরজায় কড়া নাড়ত, মিষ্টি বা সালামি সংগ্রহ করত। তিনি বলেন, 'হিন্দু পরিবারগুলো পূজার আয়োজন করত আর মুসলিম পরিবারগুলো তাতে যোগ দিত। কে কোন ধর্মের, তা নিয়ে কোনো প্রশ্নই ছিল না। এই প্রজন্মের হয়তো স্বাচ্ছন্দ্য আছে, কিন্তু সেই সমাজ বা কমিউনিটি নেই।'
এক সময় সান্ধ্যকালীন আড্ডা, খাবারের দোকান আর ফুটবল-ক্রিকেট টুর্নামেন্টে মুখর থাকা এই শহর এখন পরিবর্তনের ছাপ বহন করছে।
ধানমন্ডির শংকর এলাকায় বেড়ে ওঠা ২৭ বছর বয়সী আরিফা রহমান সেই সন্ধ্যাগুলোর কথা স্পষ্ট মনে করতে পারেন। তিনি বলেন, 'তখন লোডশেডিং খুব সাধারণ ব্যাপার ছিল, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর। আমরা জানতাম এটা এক ঘণ্টা বা তার বেশি থাকবে। বাতি নিভে গেলেই আমি, আমার বন্ধুরা, মা, খালা; সবাই বাইরে চলে আসতাম। আমরা গল্প করতাম, খেলতাম, একসাথে সময় কাটাতাম। এখন লোডশেডিং নেই, তাই একত্র হওয়ার কোনো উপলক্ষও নেই। কোনো যৌথ মুহূর্ত নেই, নেই কোনো বন্ধনও।'
অনেকের কাছে পাড়া সংস্কৃতির এই হারিয়ে যাওয়া যেন শৈশব হারিয়ে ফেলার মতোই। বারান্দার সেই সান্ধ্য আড্ডা এখন ঘরের ভেতরের নীরবতায় রূপ নিয়েছে। যে প্রতিবেশীরা একসময় খাবার ভাগ করে খেতেন, তারা এখন একে অপরের নামও জানেন না।
ঢাকার সেই নিজস্ব রীতিগুলো—ছাদের ক্রিকেট, ঈদে ঘরে বানানো মিষ্টি, শীতের যাত্রা, ফুটবল ও ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে। প্রতিটি খোলা মাঠ কংক্রিটে ঢেকে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একেকটি স্মৃতি রোমন্থন করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
ঢাকার পাড়া সংস্কৃতির এই পরিবর্তন শহরের দ্রুত বৃদ্ধির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। খোলা মাঠের জায়গা নিয়েছে অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স। যানজট আর বাণিজ্যিকীকরণ গলিগুলোকে সংকুচিত করেছে। কোচিং সেন্টার আর ক্যাফেগুলো দখল করেছে জনপরিসর। শিশুরা আর মুক্তভাবে দৌড়াতে পারে না; গোপনীয়তা [প্রাইভেসি] আর সুবিধার দোহাই দিয়ে প্রতিবেশীসুলভ ঘনিষ্ঠতাকে দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তবুও, যারা এই শহরের পুরনো পাড়া ব্যবস্থায় বেড়ে উঠেছেন, তারা এমন এক সময়ের কথা মনে করেন যখন প্রতিটি মেলামেশায় মিশে ছিল আন্তরিকতা।
ব্যক্তিগত স্মৃতির বাইরে গবেষকরাও সময়ের সঙ্গে ঢাকার নগর সংস্কৃতির পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৫ সালের 'চেঞ্জিং আরবান কালচার: আ স্টাডি অফ দ্য ওল্ড সিটি ইন ঢাকা' শিরোনামের একটি গবেষণায় আধুনিকায়ন ও বিশ্বায়ন কীভাবে শহরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে বদলে দিয়েছে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ১০৪টি জরিপ ও ১৬টি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ওই গবেষণায় উঠে আসে যে, দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, প্রযুক্তির ব্যবহার ও পারিবারিক কাঠামো পাল্টালেও সামাজিক বুননের অনেকটাই তখনো অটুট ছিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণ প্রজন্ম তাদের ঘরে পশ্চিমা ভোগবাদ, ফ্যাশন ও আধুনিক যন্ত্রপাতির দিকে ঝুঁকছে। একসময়ের প্রভাবশালী যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙে একক পরিবার (নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি) জায়গা করে নিচ্ছে। বিশেষ করে নারীরা ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংমিশ্রণে তাদের পোশাক, চুলের সাজ ও ব্যক্তিগত পরিপাটির ধরনে পরিবর্তন আনছেন।
যদিও গবেষণাটি ২০১৫ সালের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছে, তবে সেখানে চিহ্নিত প্রবণতাগুলো যেমন, উন্মুক্ত স্থানের অভাব, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং জীবনযাত্রার ধীর পরিবর্তন ইত্যাদি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও তীব্র হয়েছে। আধুনিকায়ন ও বিশ্বায়ন যে কেবল নিত্যনৈমিত্তিক রুটিনই বদলে দিয়েছে তা নয়, বরং তরুণ প্রজন্মের সমাজের সঙ্গে মেশার ধরনও বদলে দিয়েছে, যা ঐতিহ্যবাহী 'পাড়া কালচারকে' ধীরে ধীরে মুছে ফেলার পেছনে ভূমিকা রাখছে।
