‘গডফাদার’ চলচ্চিত্রের অভিনেতা রবার্ট ডুভাল মারা গেছেন
বিখ্যাত চলচ্চিত্র 'দ্য গডফাদার' এবং 'অ্যাপোক্যালিপস নাউ'-তে অভিনয় করা কিংবদন্তি অভিনেতা রবার্ট ডুভাল ৯৫ বছর বয়সে মারা গেছেন।
'টেন্ডার মার্সিস' চলচ্চিত্রের জন্য অস্কার বিজয়ী এই অভিনেতা গত রোববার ভার্জিনিয়ার মিডলবার্গে নিজ বাসভবনে 'শান্তিতে' শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর স্ত্রী লুসিয়ানার পক্ষ থেকে তাঁর জনসংযোগ সংস্থার পাঠানো এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
লুসিয়ানা বলেন, 'পুরো বিশ্বের কাছে তিনি ছিলেন একজন একাডেমি অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী অভিনেতা, একজন পরিচালক এবং একজন গল্পকার। কিন্তু আমার কাছে তিনি ছিলেন আমার সবকিছু। অভিনয়ের প্রতি তাঁর যে গভীর নেশা ছিল, তা কেবল চরিত্রের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, ভালো খাবার এবং আড্ডার মাধ্যমে সবার মনোযোগের কেন্দ্রে থাকার ক্ষমতার সাথেই তুলনা করা যায়।'
'গডফাদার' ছবির সহ-অভিনেতা আল পাচিনো তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, ডুভালের সাথে কাজ করা তাঁর জন্য একটি 'সম্মান' ছিল।
আল পাচিনো আরও বলেন, 'লোকে যেমনটা বলে, তিনি ছিলেন একজন জন্মগত অভিনেতা; অভিনয়ের সাথে তাঁর আত্মিক টান, তাঁর প্রজ্ঞা এবং অসাধারণ প্রতিভা সবসময় স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমি তাঁকে খুব মিস করব।'
ছয় দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে ডুভাল অসংখ্য 'টাফ-গাই' বা কঠোর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য পরিচিত ছিলেন, যেমন ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা পরিচালিত দ্য গডফাদার এবং দ্য গডফাদার পার্ট ২-এ মাফিয়া পরিবারের বিশ্বস্ত আইনি উপদেষ্টা (কনসিলিয়েরি) হিসেবে তাঁর ভূমিকা।
তিনি কপোলা-র ভিয়েতনাম যুদ্ধভিত্তিক মহাকাব্যিক সিনেমা অ্যাপোক্যালিপস নাউ-তেও একজন শক্তিশালী সেনা কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
১৯৭৯ সালের সেই ধ্রুপদী সিনেমায় পর্দায় তাঁর উপস্থিতি ছিল মাত্র কয়েক মিনিটের, কিন্তু তাঁর সেই বিখ্যাত সংলাপ—'আমি সকালে ন্যাপামের গন্ধ ভালোবাসি'— তাঁকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিল।
পরিচালক কপোলা ডুভালের এই প্রয়াণকে চলচ্চিত্র জগতের জন্য একটি বড় 'আঘাত' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে কপোলা তাঁর প্রোডাকশন কোম্পানির কথা উল্লেখ করে বলেন, 'তিনি ছিলেন একজন মহান অভিনেতা এবং শুরু থেকেই আমেরিকান জোয়েট্রোপ-এর এক অপরিহার্য অংশ।'
অ্যাপোক্যালিপস নাউ-তে তাঁর চরিত্রটি মূলত আরও বেশি উগ্র হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ডুভাল সেটিকে কিছুটা নমনীয় করে তোলেন এবং চরিত্রটির নাম 'ক্যাপ্টেন কার্নেজ' থেকে পরিবর্তন করে 'লেফটেন্যান্ট কর্নেল উইলিয়াম কিলগোর' রাখা হয়।
২০১৫ সালে প্রখ্যাত টক শো হোস্ট ল্যারি কিং-কে ডুভাল বলেছিলেন, 'আমি আমার হোমওয়ার্ক করতাম। আমি (চরিত্রটি নিয়ে) ব্যাপক গবেষণা করতাম।'
রবার্ট ডুভালের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি আসতে শুরু করে। মার্কিন কৌতুক অভিনেতা ও অভিনেতা অ্যাডাম স্যান্ডলার ২০২২ সালের চলচ্চিত্র 'হাসল' শুটিংয়ের সময়কার তাঁদের দুজনের কিছু ছবি পোস্ট করেছেন।
তিনি লেখেন, 'অত্যন্ত রসিক মানুষ ছিলেন। অসম্ভব দৃঢ় ছিলেন। আমাদের দেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা। এমন একজন মহান মানুষ যাঁর সাথে কথা বলে এবং হেসে সময় কাটানো যেত... তাঁর স্ত্রী লুসিয়ানা এবং তাঁর পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি আমাদের সমবেদনা জানাচ্ছি।'
অস্কার বিজয়ী জেমি লি-কার্টিসও 'দ্য গডফাদার'-এ টম হ্যাগেন চরিত্রে ডুভালের একটি ছবিসহ ইনস্টাগ্রামে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। তিনি লেখেন, 'পর্দায় দেখা এ যাবৎকালের শ্রেষ্ঠ কনসিলিয়েরি (পরামর্শদাতা)। সাবাস, রবার্ট ডুভাল।'
২০১৩ সালের চলচ্চিত্র 'জেন ম্যানসফিল্ডস কার'-এ ডুভালের চরিত্রের ছেলের ভূমিকায় অভিনয় করা সহ-অভিনেতা রবার্ট প্যাট্রিক বলেন, তিনি এই খবরে 'মর্মাহত'।
তিনি বলেন, 'বছরের পর বছর ধরে আমি ববিকে (ডুভাল) ফোন করতাম এবং আমরা সিনেমা আর বারবিকিউ নিয়ে কথা বলতাম। তিনি বারবিকিউ খুব পছন্দ করতেন এবং টেক্সাসের লকহার্টে যখনই আমি এটি খেতাম, তাঁকে সবসময় জানাতাম। আমি ববিকে খুব মিস করব। আমি সবসময় গর্বিত বোধ করব যে আমি তাঁর ছেলের চরিত্রে অভিনয় করতে পেরেছি। শান্তিতে ঘুমান আমার বন্ধু।'
ডুভালের স্ত্রী বিবৃতিতে আরও বলেন, 'তাঁর অসংখ্য চরিত্রের প্রতিটিটির জন্য বব তাঁর সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছিলেন এবং সেই চরিত্রগুলো মানুষের আত্মার যে সত্যকে প্রতিনিধিত্ব করত, তিনি তাকেই ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তা করতে গিয়ে তিনি আমাদের সবার জন্য চিরস্থায়ী এবং অবিস্মরণীয় কিছু রেখে গেছেন।
ববের প্রতি আপনারা বছরের পর বছর ধরে যে সমর্থন দেখিয়েছেন তার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ এবং তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো উদযাপনের জন্য আমাদের এই সময়টুকু ও গোপনীয়তা দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।'
সাতবার অস্কারের জন্য মনোনীত হওয়া ডুভাল ১৯৮৩ সালে 'টেন্ডার মার্সিস' ছবিতে একজন বিপর্যস্ত কান্ট্রি সিঙ্গারের চরিত্রে অভিনয় করে সেরা অভিনেতার পুরস্কার জিতেছিলেন।
তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ছিল ১৯৭৬ সালের 'নেটওয়ার্ক' ছবিতে একজন দাপুটে কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ, ১৯৭৯ সালের 'দ্য গ্রেট সান্তিনি'-তে একজন মেরিন অফিসার, এছাড়াও ১৯৯০ সালের 'দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল' এবং ২০১৪ সালে রবার্ট ডাউনি জুনিয়রের সাথে 'দ্য জাজ' সিনেমার বিভিন্ন চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন।
ডুভাল প্রায়ই বলতেন, ল্যারি ম্যাকমার্ট্রির উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত ১৯৮৯ সালের টিভি মিনি-সিরিজ 'লোনসাম ডোভ'-এ টেক্সাস রেঞ্জার থেকে কাউবয় হওয়া 'অগাস্টাস ম্যাক্রে' চরিত্রটি ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয়।
১৯৬৩ সালে হার্পার লি-র 'টু কিল এ মকিংবার্ড'- চলচ্চিত্রে নিভৃতচারী 'বু র্যাডলি' চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে রূপালি পর্দায় অভিষেক হয় তার।
মার্কিন অভিনেতা আলেক বল্ডউইন ডুভালের প্রতি এক ভিডিও শ্রদ্ধাঞ্জলিতে বলেন, 'যখন তিনি টু কিল এ মকিংবার্ড করেছিলেন, বু র্যাডলি চরিত্রে তাঁর পারফরম্যান্স আপনাকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল; তিনি একটিও সংলাপ ব্যবহার করেননি, একটি শব্দও না, এবং তাতেই তিনি নাড়িয়ে দিয়েছিলেন।'
সেই ছবির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন হর্টন ফুট, যিনি ডুভাল অভিনীত আরও বেশ কিছু সিনেমা লিখেছিলেন, যার মধ্যে 'টেন্ডার মার্সিস', 'টুমরো' এবং 'দ্য চেজ' উল্লেখযোগ্য।
১৯৯৭ সালের 'দ্য অ্যাপোস্টল' সিনেমাটি ডুভাল নিজেই লিখেছিলেন এবং পরিচালনা করেছিলেন; সেখানে তিনি একজন ধর্মপ্রচারকের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন যিনি একটি অপরাধ করার পর লুইজিয়ানায় নতুন জীবন শুরু করেন।
ব্রিটিশ অভিনেত্রী জেন সিমুর, যিনি ১৯৯৫ সালের 'দ্য স্টার্স ফেল অন হেনরিয়েটা' চলচ্চিত্রে ডুভালের সাথে কাজ করেছিলেন, ইনস্টাগ্রামে একটি আবেগঘন বার্তা শেয়ার করেন।
ডুভালের সাথে নিজের একটি ছবির ক্যাপশনে সিমুর লেখেন, 'আমরা তাঁর বারবিকিউ প্রেম এবং এমনকি কিছুটা টাঙ্গো নাচেরও অংশীদার হতে পেরেছিলাম। ক্যামেরার পেছনের সেই মুহূর্তগুলো কাজের মতোই স্মরণীয় ছিল।'
