মারা গেছেন ইরানি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি বাহরাম বেজাই
ইরানি চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব বাহরাম বেজাই আর নেই। ৮৭ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তার মৃত্যুতে ইরানে ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ইরানের সংবাদপত্রগুলোর প্রথম পাতাজুড়ে প্রকাশ করা হয়েছে তার মৃত্যুর খবর। বিরোধী দল থেকে শুরু করে শাহ আমলের অনুসারীরাও তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন। ইরানের শেষ শাহের নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভি বেজাইয়ের প্রয়াণকে 'দেশের শিল্প ও সংস্কৃতির জন্য এক বিশাল ক্ষতি' হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আশির দশকে শাহ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে আসা ইসলামি শাসনব্যবস্থায় বেজাইয়ের পরবর্তী সময়ের চলচ্চিত্রগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও বর্তমান সরকারের অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইরানি সংস্কৃতিতে তার অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
ইরানের বর্তমান প্রজন্মের অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতা বেইজাইয়ের কাছে তাদের ঋণের কথা স্বীকার করেছেন। চলতি বছরের কান চলচ্চিত্র উৎসবে শীর্ষ পুরস্কার বিজয়ী প্রখ্যাত নির্মাতা জাফর পানাহি বেইজাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, তিনি তাদের শিখিয়েছেন 'কীভাবে বিস্মৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়'।
নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা—উভয় সত্তাতেই বেজাই তার কাজে সরাসরি রাজনৈতিক প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলতেন। তিনি সবসময় বলতেন, তিনি তার সৃষ্টিকর্মে স্পষ্ট কোনো বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেন না। তবে তার দীর্ঘ কয়েক দশকের কাজে ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক চরিত্রগুলোকে দমনমূলক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে দেখা গেছে।
বিখ্যাত কবি পরিবারে জন্ম নেওয়া বেজাই ছোটবেলা থেকেই পারস্য সংস্কৃতির গভীর ঐতিহ্যে বেড়ে উঠেছিলেন। প্রথমে তিনি পারস্যের লোককথা ও রীতিনীতি নির্ভর নাটক লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। আজীবন চলচ্চিত্রের ভক্ত বেজাই সত্তর দশকে চলচ্চিত্র নির্মাণে আসেন। ইরানি চলচ্চিত্রের 'নিউ ওয়েভ' বা নতুন ধারার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি পরিচিতি পান।
তার সৃজনশীল কাজের সবচেয়ে বড় অংশটি ছিল শাহ আমল এবং পরবর্তী সময়ে ইসলামী বিপ্লবের ক্রান্তিকালীন সময়ে। এই উভয় শাসনব্যবস্থাই তার কাজের মধ্যে অবাধ্যতা বা ভিন্নমতের কোনো প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত আছে কি না, তা খুঁজে দেখার চেষ্টা করত।
এ প্রসঙ্গে জাফর পানাহি বলেন, 'বেজাই সহজ পথ বেছে নেননি। তিনি বছরের পর বছর বর্জন, চাপিয়ে দেওয়া নীরবতা এবং দূরত্ব সহ্য করেছেন; কিন্তু তিনি তার ভাষা ও বিশ্বাস ত্যাগ করেননি।'
ইরানি বিপ্লবের কয়েক বছর পর তিনি নির্মাণ করেন তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে বিবেচিত 'বাশু, দ্য লিটল স্ট্রেনজার'। ইরান-ইরাক যুদ্ধ থেকে বাঁচতে আশ্রয় খোঁজা এক ছোট ছেলেকে নিয়ে এই সিনেমাটি তৈরি। সে সময়ের অন্য সব সিনেমার মতো এটিও ইরানে নিষিদ্ধ ছিল। তবে পরবর্তীতে চলচ্চিত্র সমালোচকদের ভোটে এটি সর্বকালের সেরা ইরানি চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয়। চলতি বছরের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটির পুনরুদ্ধার করা সংস্করণ প্রদর্শিত হয় এবং ক্লাসিক বিভাগে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জেতে।
২০১০ সালে বেজাই পাকাপাকিভাবে ইরান ত্যাগ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত ইরানি সংস্কৃতি বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন। দেশ ছাড়লেও তার মন পড়ে ছিল ইরানেই। তার স্ত্রী অভিনেত্রী মোজদেহ শামসাই জানান, কেবল 'ইরান' শব্দটি শুনলেই তার চোখে পানি চলে আসত। তিনি সবসময় তার দেশের নতুন সংস্কৃতি ও ভবিষ্যতের ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন।
