‘দি এক্সরসিস্ট’ থেকে ‘কনজিউরিং’: বক্স অফিসে তুমুল সাফল্য—এখন কেন হরর সিনেমার স্বর্ণযুগ?
একটি বন্ধ দরজার অপর পাশে এমন কিছু আছে, যা আপনাকে অচেতন করতে পারে, বমি করাতে পারে, এমনকি আপনার হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলতে পারে—জানলে কি আপনি সেই দরজা খুলতে চাইবেন? বেশিরভাগ মানুষের উত্তর হবে 'না'। তবুও, এই 'না' এর মধ্যেও লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত কৌতূহল।
১৯৭৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'দ্য এক্সরসিস্ট' সিনেমাটি দেখে দর্শকরা রীতিমতো বমি করেছিলেন, অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন, এমনকি হৃদরোগেও আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু এর কোনো কিছুই সিনেমাপ্রেমীদের থামাতে পারেনি। সেই বছর 'দ্য এক্সরসিস্ট' ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমা এবং শীর্ষ ২০-এর মধ্যে একমাত্র হরর ফিল্ম।
পাঁচ দশক পেরিয়ে আজও সেই প্রবণতা অক্ষুণ্ণ। বিশ্বজুড়ে হরর সিনেমার জনপ্রিয়তা যেন বেড়েই চলেছে, বর্তমানে বক্স অফিসের অন্যতম প্রভাবশালী ঘরানায় পরিণত হয়েছে।
অক্টোবরের শুরুর দিকের হিসাব অনুযায়ী, শুধু আমেরিকাতেই হরর সিনেমা ১০০ কোটি ডলারের বেশি আয় করেছে, যা মোট বক্স-অফিস আয়ের প্রায় ১৭ শতাংশ, যেখানে এক দশক আগে এই হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। বর্তমানে, বিশ্বের শীর্ষ ২০ সর্বোচ্চ আয়ের সিনেমার এক-পঞ্চমাংশই হরর ফিল্ম।
শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যই নয়, হরর সিনেমা এখন প্রথম সারির অভিনেতা এবং সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া 'দ্য সাবস্ট্যান্স' অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডে সেরা ছবির জন্য মনোনীত হয়েছে। মাইকেল বি. জর্ডান এবং অ্যামি ম্যাডিগ্যান 'সিনার্স' এবং 'ওয়েপন্স'-এ তাদের অভিনয়ের জন্য অস্কারের সম্ভাব্য দাবিদার হিসেবে আলোচিত হচ্ছেন।
এ সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বর্তমানে হরর সিনেমার এক স্বর্ণযুগ চলছে। কিন্তু কীভাবে এটি সম্ভব হলো?
ক্লার্ক কলিস তার 'স্ক্রিমিং অ্যান্ড কনজিউরিং' বইয়ে হরর ঘরানার পুনরুজ্জীবনের গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সঙ্গেই হরর সিনেমার ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৩১ সালে বেলা লুগোসি ড্রাকুলার চরিত্রে অভিনয় করেন, যা ১৯২২ সালের 'নসফেরাতু'র পর হররকে এক নতুন মাত্রা দেয়।
১৯৫০-এর দশকে, মহাকাশ দৌড় এবং পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়ের সময়, 'দ্য ব্লব' এবং 'গডজিলা'-এর মতো হরর সিনেমার প্রচলন বেড়ে যায়।
পরের দশকে হরর আরও অন্ধকার ও গম্ভীর রূপ নেয়। ১৯৬০ সালের 'সাইকো'র নরম্যান বেটস এবং ১৯৭৪ সালের 'দ্য টেক্সাস চেইনস ম্যাসাকার'-এর লেদারফেসের মতো মানসিকভাবে অসুস্থ খলনায়করা পর্দায় দাপিয়ে বেড়ায়।
১৯৮০-এর দশকে স্ল্যাশার ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর উত্থান ঘটে। জেসন ভুরহিস, ফ্রেডি ক্রুগার ও মাইকেল মায়ার্সের মতো চরিত্রগুলো 'ফ্রাইডে দ্য থারটিন্থ', 'এ নাইটমেয়ার অন এলম স্ট্রিট' ও 'হ্যালোইন'-এ তরুণ-তরুণদের নির্মমভাবে হত্যা করে দর্শকদের ভয় ধরিয়েছিল। তবে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে দর্শকরা এই ধরনের গল্পে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা'র 'ব্রাম স্টোকার'স ড্রাকুলা' (১৯৯২) এবং নীল জর্ডানের 'ইনটারভিউ উইথ দ্য ভ্যাম্পায়ার' (১৯৯৪) বড় বাজেটের ব্লকবাস্টার হলেও সেভাবে ভীতিকর ছিল না।
মিস্টার কলিসের মতে, ১৯৯৬ সালের 'স্ক্রিম' হরর ঘরানার পুনরুজ্জীবনের মূল কারণ। এর বুদ্ধিদীপ্ত ও সৃজনশীল স্ক্রিপ্ট দর্শককে একদিকে যেমন ভয় দেখিয়েছে, তেমনি বিনোদনও দিয়েছে। এটি হরর সিনেমার প্রচলিত 'নিয়মকানুন' নিয়ে আলোচনা করে এক নতুন ধারার সূচনা করে।
এই ফ্র্যাঞ্চাইজি থেকে পাঁচটি সিকুয়েল ও একটি টিভি সিরিজ তৈরি হয়, যার মোট আয় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।
এরপর আসে ১৯৯৯ সালের 'দ্য ব্লেয়ার উইচ প্রজেক্ট'। কম বাজেট, প্রায় স্ক্রিপ্টবিহীন এবং কোনো দানব না দেখিয়েও এটি দর্শকদের মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের মাধ্যমে আতঙ্কিত করে তোলে। মূলত দর্শকের কল্পনা এবং তিন প্রধান চরিত্রের মানসিক যন্ত্রণার ওপর ভর করে সিনেমাটি ৪৮০ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে।
২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্লুমহাউস প্রোডাকশন এই সহজ নীতিকেই কাজে লাগায়। তারা নির্মাতাদের সীমিত বাজেট, সৃজনশীল স্বাধীনতা এবং ছবি হিট হলে লাভের ভাগ পাওয়ার সুযোগ দেয়।
২০০৭ সালে 'প্যারানরমাল অ্যাক্টিভিটি' ২৯০ মিলিয়ন ডলার আয় করে এবং ছয়টি সিকুয়েল তৈরি হয়। এরপর তারা 'দ্য পার্জ', 'ইনসিডিয়াস' এর মতো জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি এবং সমালোচকদের প্রশংসিত 'গেট আউট'-এর মতো সিনেমাও উপহার দেয়।
হরর ঘরানা দুটি বিপরীতমুখী দিক থেকে লাভবান হয়। প্রথমত, স্টিফেন ফলোজের মতো বিশ্লেষকরা বলেন, 'যারা ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে হরর পছন্দ করতেন, কিন্তু সেসময় তা গ্রহণযোগ্য ছিল না—তারা এখন শিল্প পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন।'
দ্বিতীয়ত, হররের দর্শকধারা সবসময় নতুনদের দিয়ে পুনর্নবায়ন হয়। ১৯-২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে অন্য যেকোনো ঘরানার চেয়ে হররের ভক্ত সংখ্যা বেশি। এর ফলে দর্শকবৃন্দ ক্রমাগত নতুন প্রজন্মের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়।
'স্টার ওয়ারস' বা 'ইন্ডিয়ানা জোনস'-এর মতো ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো বয়স্ক ভক্তদের ধরে রাখায় ধারাবাহিকতার সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকলেও, হরর মুক্তভাবে নতুনত্ব গ্রহণ করে।
গল্প এবং চরিত্রগুলোও সহজেই পুনরায় তৈরি করা যায়। জেমস হোয়েল, কেনেথ ব্রানাঘ এবং গুয়ের্মো দেল তোরোর—প্রত্যেকেই মেরি শেলির ফ্রাঙ্কেনস্টাইন-এর অনুপ্রেরণায় সিনেমা তৈরি করেছেন, কিন্তু প্রত্যেকটির ধারা, কাঠামো ও অনুভূতি ভিন্ন।
এক প্রজন্ম আগে, কোনো নির্মাতাকে আইডিয়া বাস্তবায়নের জন্য স্টুডিও এবং মূলধারার বিতরণ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। এখন যন্ত্রপাতি সস্তা; স্মার্টফোনেই সবাই সিনেমা ক্যামেরা বহন করে। এ বছরের পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপ্টিক হরর '২৮ ইয়ার্স লেটার' মূলত আইফোনে শুট করা হয়েছে। স্টুডিও বা প্রযোজক যদি কোনো প্রকল্প প্রত্যাখ্যান করে, নির্মাতারা ক্রাউডফান্ডিং-এর মাধ্যমে তা তৈরি করে ইউটিউবে প্রকাশ করতে পারেন।
তবে, হরর স্ট্রিম করা সহজ হলেও মানুষ এখনও বড় পর্দায় দেখতে আগ্রহী। অচেনাদের মধ্যে বসে একসঙ্গে ভীত হওয়ার অভিজ্ঞতা অনুভূতিকে আরও তীব্র করে। ব্লুমহাউসের প্রেসিডেন্ট অভিজয় প্রকাশ বলেন, 'অন্ধকারে ভীতিকর গল্প শোনার অভিজ্ঞতা মৌলিক।'
তবে এত সব কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে না কেন এত মানুষ স্বেচ্ছায় ভীত হয়ে হরর সিনেমা দেখে। এর একটি কারণ হতে পারে—এটি একটি মনোবিকাশমূলক অভিজ্ঞতা।
বিহেভিয়ারাল বিজ্ঞানী এবং হররপ্রেমী কলটান স্ক্রিভনার একটি স্বজ্ঞাত ব্যাখ্যা দেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পৃথিবী যেন আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন ও কম নিরাপদ মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, মানুষ হরর সিনেমা দেখে, ভূতুড়ে বাড়ি ঘুরে বা অন্যান্য ভীতিকর অভিজ্ঞতায় অংশগ্রহণ করে চারপাশের বা সম্ভাব্য বিপদগুলো বোঝার চেষ্টা করে।
এ কারণেই নারীরা সিরিয়াল কিলারের গল্পে আকৃষ্ট হন এবং ২০২০ সালের মার্চে স্টিভেন সোদারবার্গের 'কন্ট্যাজিয়ন' (২০১১) সিনেমার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। স্ক্রিভনার লিখেছেন, 'যদি জেব্রারা সিংহ কীভাবে শিকার করে তা নিয়ে মুভি দেখতে পারত, তারা সম্ভবত তা দেখত।'
