মালয়েশিয়ায় শ্রম রপ্তানি: ৪৯ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল
মালয়েশিয়ায় শ্রম রপ্তানিতে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগে ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করে সরকারের সিদ্ধান্ত স্থগিত করে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশ স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ। ফলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নেওয়া সনদ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তই বহাল থাকছে।
প্রজ্ঞাপনের কার্যকারিতা স্থগিত করে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশ স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে রবিবার (৪ অক্টোবর) আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক এই আদেশ দেন।
আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, গত ১৯ জুলাই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর বিরুদ্ধে একটি এজেন্সি রিট করলে হাইকোর্ট প্রজ্ঞাপনের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে আপিল বিভাগ ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করেন।
এরপর আরও ১১টি এজেন্সি হাইকোর্টে রিট করে একই ধরনের স্থগিতাদেশ পান। এর বিরুদ্ধে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় আপিল বিভাগে আবেদন করে। রোববার সেই আবেদনের শুনানি শেষে হাইকোর্টের আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করেছেন চেম্বার বিচারপতি।
গত ১৯ জুলাইয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান আইন, ২০১৩, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (সংশোধন) আইন, ২০২৩ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইন ও বিধিবিধান মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তবে লাইসেন্স বাতিল হওয়া এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪০৬, ৪২০, ৩৮৫, ৩৮৬, ৪২৭ ও ৩৪ ধারায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে এবং তা গৃহীত হয়েছে। এ কারণে অভিবাসন আইন অনুযায়ী এজেন্সিগুলোর লাইসেন্স প্রত্যাহার করা হয়েছে।
লাইসেন্স বাতিল হওয়া ৪৯ এজেন্সির মধ্যে আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের স্ত্রী ও মেয়ের মালিকানাধীন দুটি এজেন্সি অরবিটালস এন্টারপ্রাইজ ও অরবিটাল ইন্টারন্যাশনাল রয়েছে।
ঢাকা-২০ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বেনজীর আহমেদের আহমেদ ইন্টারন্যাশনাল, ফেনী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর স্নিগ্ধা ওভারসিজ লিমিটেড এবং ফেনী-৩ আসনের জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদউদ্দিন চৌধুরীর ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনালও রয়েছে তালিকায়।
এছাড়া জনশক্তি খাতের ব্যবসায়ী নূর আলীর ইউনিক ইস্টার্ন প্রাইভেট লিমিটেড এবং মালয়েশিয়া সিন্ডিকেটের আলোচিত রুহুল আমিন ওরফে স্বপনের ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালও তালিকায় রয়েছে।
বাকি এজেন্সিগুলো হলো—শাহীন ট্রাভেলস, ইরভিং এন্টারপ্রাইজ, হেইডোরি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, রাব্বি ইন্টারন্যাশনাল, জাহরাত অ্যাসোসিয়েট, ফোর সাইট ইন্টারন্যাশনাল, বিনিময় ইন্টারন্যাশনাল, আকাশ ভ্রমণ লিমিটেড, কিউ কে কুইক এক্সপ্রেস লিমিটেড, ইউনাইটেড এক্সপোর্ট, জিএমজি ট্রেডিং, সাদিয়া ইন্টারন্যাশনাল, সুপার ইস্টার্ন লিমিটেড ও এলিগ্যান্টস ওভারসিজ।
এছাড়া মিডওয়ে ওভারসিজ লিমিটেড, মদিনা ওভারসিজ, আল-খামিস ইন্টারন্যাশনাল, নিউ এজ ইন্টারন্যাশনাল, ডাহমাশি করপোরেশন, গ্যালাক্সি করপোরেশন, সুলতান ওভারসিজ, প্রভাতী ইন্টারন্যাশনাল, ম্যানিসপাওয়ার করপোরেশন, আমিন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, আহমেদ ইন্টারন্যাশনাল, আইএসএমটি হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট, দরবার গ্লোবাল ওভারসিজ, নাতাশা ওভারসিজ, অপরাজিতা ওভারসিজ, স্ট্যানফোর্ড এমপ্লয়মেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড ও জান্নাত ওভারসিজ, বি এম ট্রাভেলস লিমিটেড, রুবেল বাংলাদেশ লিমিটেড।
আরও রয়েছে বিএনএস ওভারসিজ, ট্রান্স এশিয়া ইন্টিগ্রেট সার্ভিসেস, আল ফারাহ হিউম্যান রিসোর্সেস অ্যান্ড কনসালটেন্সি, ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনাল, অনন্য অপূর্ব রিক্রুটিং এজেন্সি, থানেক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, জে জি আলফালাহ ম্যানেজমেন্ট, ইম্পেরিয়াল রিসোর্সেস, পিআর ওভারসিজ ও এমইএফ গ্লোবাল বাংলাদেশ।
প্রসঙ্গত, বিভিন্ন অনিয়ম ও 'সিন্ডিকেটের' কারণে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নেওয়া বন্ধ করেছিল মালয়েশিয়া। ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর আবার বাংলাদেশের সঙ্গে শ্রমিক নেওয়ার চুক্তি করে দেশটি। ওই সময় শ্রমিক ভিসায় দেশটিতে যেতে সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার ৫৪০ টাকা ফি ঠিক দেয় সরকার।
বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়া সরকারের চুক্তির আওতায় ২০১৬ সাল পর্যন্ত ১০টি নির্ধারিত রিক্রুটিং এজেন্সি দেশটিতে শ্রমিক পাঠাত। পরে ২০২১ সালে নতুন একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে দুই দেশ। এতে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা বাড়িয়ে ১০০টি করা হয়।
তবে সেখানেও নতুন 'সিন্ডিকেট' তৈরি হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ১০০ এজেন্সির মধ্যে ২০-২৫টি এজেন্সির 'সিন্ডিকেট' মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে নামে দুদক। এর ধারাবাহিকতায় এর আগেও কয়েকটি এজেন্সির কর্ণধারদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে সংস্থাটি। এবার আরও ৬০টি মামলা করার উদ্যোগ নেয় দুদক।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, এসব এজেন্সি ২ লাখ ৬৭ হাজার ২৭৬ জন শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছে। সরকার নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার পরিবর্তে তার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি অর্থ নিয়ে তারা মোট ৪ হাজার ৫৪৫ কোটি ২০ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ টাকা অতিরিক্ত আদায় করেছে।
