হৃদরোগের চিকিৎসায় দেশে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও সক্ষমতা এখনও ঢাকাকেন্দ্রিক
হৃদরোগের চিকিৎসায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও এ খাতের ক্রমবর্ধমান চিকিৎসাসুবিধা এখনও মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে রাজধানীর বাইরের মানুষ, বিশেষ করে হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচারের মতো উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সীমিত সুযোগ পাচ্ছেন।
হৃদরোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে হৃদরোগের চিকিৎসাসেবা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৪৩টি প্রতিষ্ঠানে হৃদরোগের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৩৪টিতে অস্ত্রোপচারের সুবিধা রয়েছে। তবে এই ৩৪টি প্রতিষ্ঠানের মাত্র আটটি ঢাকার বাইরে।
ফলে দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচারই ঢাকাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে করা হয়, যদিও দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র প্রায় ১০ শতাংশের বসবাস রাজধানীতে। অন্যদিকে, বাকি ৯০ শতাংশ মানুষের জন্য দেশের মোট হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচারের মাত্র ৫ শতাংশ সুবিধা রয়েছে।
কার্ডিয়াক সার্জন সোসাইটি অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মাত্র তিনটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে—জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে—কার্ডিয়াক সার্জারি হয়। সিলেট, রংপুর ও খুলনায় ক্যাথল্যাব রয়েছে এবং সেখানে এনজিওগ্রাম করা হলেও কার্ডিয়াক সার্জারি হয় না।
দেশে বছরে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার কার্ডিয়াক সার্জারি হয়। অথচ বছরে প্রায় ২৫ হাজার রোগীর এ ধরনের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন রয়েছে।
হৃদরোগের চিকিৎসায় ক্যাথল্যাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে এনজিওগ্রাম, এনজিওপ্লাস্টি, পেসমেকার বা আইসিডি ইমপ্লান্টেশনসহ বিভিন্ন পরীক্ষা ও চিকিৎসা করা হয়। সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ৮৭টি ক্যাথল্যাব রয়েছে। এর মধ্যে ৫৮টিই রাজধানীতে।
তবে বর্তমানে দেশের প্রায় সব মেডিকেল কলেজ ও জেলা সদর হাসপাতালে কার্ডিওলজিস্ট রয়েছেন। বাংলাদেশ কার্ডিয়াক সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কার্ডিওলজিস্ট রয়েছেন।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের যেসব হাসপাতালে করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) নেই, সেগুলোতে অন্তত পাঁচ শয্যার সিসিইউ চালুর প্রস্তাব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দিয়েছে কার্ডিয়াক সোসাইটি।
বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির (বিএমইউ) কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. দীন-ই-মুজাহিদ মোহাম্মদ ফারুক ওসমানী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, হার্ট অ্যাটাকের পর ঢাকার বাইরের একজন রোগীকে ঢাকায় আনতে অনেক ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যায়। এ সময়ের মধ্যে ধমনীতে রক্ত জমাট বাঁধা ঠেকাতে স্ট্রেপটোকাইনেজ ইনজেকশন দেওয়া গেলে অনেক মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে তা করতে না পারায় অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু এড়ানো যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, "জটিল হৃদরোগের অধিকাংশ চিকিৎসা এখনও ঢাকাকেন্দ্রিক হলেও চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহীর মতো বিভাগীয় শহরগুলোতে সক্ষমতা বাড়ছে। তবে হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের মতো সেবা দেশে এখনও চালু হয়নি।"
চিকিৎসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, "ঢাকার বাইরে হৃদরোগের চিকিৎসাসেবার পরিসর আরও বাড়াতে দেশের আট বিভাগীয় শহরে ক্যানসার ও কিডনি চিকিৎসার পাশাপাশি হৃদরোগ সেন্টার তৈরির কাজ চলছে।"
কার্ডিও-পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার চালুর উদ্যোগ বিএমইউর
দেশে হৃদরোগের চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট, হার্ট ফেইলিয়র ব্যবস্থাপনা ও কার্ডিয়াক পুনর্বাসনের মতো বিশেষায়িত সেবা এখনও সীমিত। এ ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) প্রথমবারের মতো কার্ডিও-পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
বিএমইউর হার্ট ফেইলিয়র বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং বাংলাদেশ হার্ট ফেইলিয়র অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ডা. ওসমানী বলেন, দেশে হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা, এনজিওপ্লাস্টি ও বাইপাস সার্জারির সক্ষমতা বেড়েছে। তবে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো হার্ট অ্যাটাকের পর রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন বা কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন।
তিনি বলেন, "রোগীর রিং বসানো বা বাইপাস করলেই চিকিৎসা শেষ হয় না। কীভাবে ব্যায়াম করবেন, কী খাবার খাবেন, কীভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন—এসবের জন্য একটি রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার প্রয়োজন, যা বাংলাদেশে এখনও কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।"
ডা. ওসমানী জানান, গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি ও যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) সহযোগিতায় বিএমইউতে রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের নকশা ও প্রস্তুতির কাজ এগিয়েছে। বিদেশি অংশীদারেরা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্থান বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
এদিকে, চলতি বছরের নভেম্বরে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট ও হার্ট বায়োপসি বিষয়ে ফেলোশিপ প্রশিক্ষণে যাচ্ছেন বিএমইউর দুই চিকিৎসক। আন্তর্জাতিক এ সহযোগিতার মাধ্যমে ভবিষ্যতে দেশে উন্নত হার্ট ফেইলিয়র চিকিৎসা ও হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট চালুর পথ তৈরি হবে বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা।
'গ্যাসের ব্যথা' ভেবে হার্টের ব্যথাকে অবহেলা নয়
চিকিৎসকেরা বলছেন, খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা, দূষণ, ধূমপান ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাবে দেশে হৃদরোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিওলজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. অমল কুমার চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, আগে বয়স্কদের মধ্যে হৃদরোগ বেশি দেখা গেলেও এখন তরুণদের মধ্যেও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়ছে। তাই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পাশাপাশি ৩০ বছর বয়সের পর নিয়মিত হৃদযন্ত্র পরীক্ষা করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, কারও বুকে ব্যথার সঙ্গে অস্বস্তি, ঘাম, বমি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। বুকের কোনো ব্যথাকেই 'গ্যাসের ব্যথা' ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়।
ডা. অমল বলেন, হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই বুকে ব্যথা হলে দ্রুত নিকটস্থ চিকিৎসকের কাছে গিয়ে সেটি হার্ট অ্যাটাক নাকি অন্য কোনো কারণে হচ্ছে, তা নিশ্চিত হতে হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয় হার্ট অ্যাটাকে। ২০২২ সালে দেশে মোট মৃত্যুর ১৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ ঘটেছে হার্ট অ্যাটাকে। হৃদরোগসহ (৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ) অন্যান্য কার্ডিওভাসকুলার রোগ বিবেচনায় এ হার ২১ দশমিক ১২ শতাংশ।
আজ মঙ্গলবার বিশ্ব হার্ট দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য—'ডোন্ট মিস আ বিট' (Don't Miss a Beat)।
