মাদকের ডিজিটাল প্রমাণ যাচাইয়ে ‘ফরেনসিক ল্যাব’ চায় ডিএনসি
মাদক কারবারিদের কাছ থেকে জব্দ করা ডিজিটাল ডিভাইস ও তথ্য-উপাত্তের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং মাদক অপরাধের তদন্ত দ্রুত, নির্ভুল ও কার্যকর করতে 'ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবরেটরি' নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)।
এরই মধ্যে ল্যাব নির্মাণের প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। ১২ কোটি ২৯ লাখ ৪৮ হাজার টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি চলতি বছরের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের জুন মেয়াদের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
ডিএনসি সূত্রে জানা গেছে, মাদক কারবারিরা এখন আর কেবল প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে না। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা বহুমুখী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, ইমো, মেসেঞ্জার ও ভিপিএনসহ বিভিন্ন এনক্রিপটেড অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে যোগাযোগ, অডিও-ভিডিও কল, লোকেশন শেয়ারিং এবং অর্থ লেনদেন চালিয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গোপন গ্রুপ তৈরি করে তারা ব্যবসার নেটওয়ার্ক বিস্তার করছে। এছাড়া অনলাইন পোর্টাল, মোবাইল ব্যাংকিং, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে মাদক সরবরাহ ও অর্থ লেনদেন করা হচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, বিভিন্ন সময় অভিযানে মাদক কারবারিদের কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, হার্ডডিস্ক ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ করা হলেও সেগুলোতে থাকা তথ্য, ভিডিও, বার্তা ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণে ডিএনসির নিজস্ব কোনো ল্যাব নেই। ফলে অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে মাদকের ডিজিটাল প্রমাণ যাচাই করতে যেমন বিলম্ব ঘটছে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। মূলত এ কারণেই নিজস্ব 'ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবরেটরি' নির্মাণ করতে চায় সংস্থাটি।
ডিএনসির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে জব্দকৃত ডিভাইসের এনক্রিপটেড বার্তা উদ্ধার, মুছে ফেলা ফাইল পুনরুদ্ধার, লোকেশন ট্র্যাকিং ও ভিডিও বিশ্লেষণসহ অন্যান্য প্রযুক্তিগত প্রমাণ দ্রুত ও নির্ভুলভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। এতে মাদক সংক্রান্ত অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক শক্তিশালী মামলা প্রস্তুত করা যাবে। পাশাপাশি মাদকের অনুপ্রবেশ ও বিপণন রোধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার ২০০টি মোবাইল ডিভাইস এবং প্রায় ৬০০টি কম্পিউটার, হার্ডডিস্ক, পেনড্রাইভ ও সার্ভারের ফরেনসিক বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। এছাড়া প্রতি বছর প্রায় ৫০০টি ভিডিও, ৭৫০টি অডিও এবং ১ হাজার ৫০০টি ছবির ফরেনসিক বিশ্লেষণ করা যাবে।
এ লক্ষ্য অর্জনে ৩ সেট মোবাইল ফরেনসিক সলিউশন, ১ সেট ভিডিও ও ইমেজ ফরেনসিক সলিউশন, ২ সেট কম্পিউটার ফরেনসিক সলিউশন এবং ফরেনসিক সলিউশন সফটওয়্যারগুলো চালানোর জন্য ৬টি হাই ওয়ার্ক স্টেশন ও ১টি পোর্টাল ওয়ার্ক স্টেশন কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবের তথ্যাদি সংরক্ষণ ও ব্যাকআপের জন্য ১টি মেইন সার্ভার ও ১টি স্টোরেজ সার্ভার স্থাপন এবং প্রতিটি সফটওয়্যার ব্যবহারের জন্য যথাযথ প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগের কথা জানানো হয়েছে।
ডিজিটাল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য একজন প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব পালন করবেন। তাকে সহযোগিতার জন্য থাকবেন একজন সহকারী প্রকল্প পরিচালক, একজন হিসাবরক্ষক, একজন কম্পিউটার অপারেটর এবং একজন অফিস সহায়ক। প্রকল্প পরিচালক ডিএনসির মহাপরিচালকের নিয়ন্ত্রণে থাকবেন এবং তার কাছে জবাবদিহি করবেন। অন্যদিকে অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা প্রকল্প পরিচালকের কাছে জবাবদিহি করবেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে প্রকৃত মাদক অপরাধীদের আরো দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে, যা দেশে মাদকাসক্ত ও মাদক কারবারির সংখ্যা হ্রাস করতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে ভূমিকা রাখবে। এছাড়া ডিএনসির গোয়েন্দা কার্যক্রম, তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়া আরো আধুনিক ও প্রমাণসম্মত হবে, যা সামগ্রিক মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে গতিশীল ও ফলপ্রসূ করবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (ক্রয়, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা) এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, 'মাদকবিরোধী অভিযানে বেশিরভাগ সময়ই ছোট কারবারি বা ক্যারিয়ার ধরা পড়ে, কিন্তু মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। গ্রেপ্তারকৃতদের ব্যবহৃত ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা করা গেলে চক্রের অন্যান্য সদস্য ও মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা সহজ হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'অনেক সময় আলামত হিসেবে সরাসরি মাদক না পাওয়া গেলে প্রমাণের অভাবে মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করা যায় না বা মামলা দেওয়া যায় না। তবে ফরেনসিকের মাধ্যমে ডিজিটাল প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।'
অধিদপ্তরের নিজস্ব ফরেনসিক ল্যাব নির্মিত হলে দেশে মাদকের বিস্তার কমবে এবং মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরো গতিশীল হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এই কর্মকর্তা।
