জুয়া ও মাদক অনেক অপরাধের মূল কারণ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
দেশে সংঘটিত অনেক অপরাধের পেছনে জুয়া ও মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
অনেক গুরুতর অপরাধের পেছনে মাদকাসক্তি ও জুয়ার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'জুয়া ও মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে এর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য অপরাধও কমানো সম্ভব হতে পারে।'
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'অপরাধ সংঘটনের পর শুধু অপরাধীকে গ্রেপ্তার, বিচার ও শাস্তি দিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; অপরাধের পেছনের কারণ চিহ্নিত করে সেগুলো মোকাবিলা করতে হবে।'
তিনি বলেন, 'অপরাধকে শুধু একটি ঘটনা হিসেবে দেখলে হবে না। কেন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, এর পেছনে কী ধরনের সামাজিক বা অন্যান্য কারণ রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'অপরাধ হচ্ছে একটা উপসর্গ। দেখা যাচ্ছে, অপরাধের কিন্তু রোগ হচ্ছে অন্য জায়গায়। মূল কারণ চিহ্নিত করে সেখানে ব্যবস্থা নেওয়া গেলে অপরাধের হার কমানো সম্ভব।'
সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আধুনিক ইউনিট অপরাধের ধরন দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'ডিজিটাল ও সাইবার স্পেসে অপরাধ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধ শনাক্তকরণে ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং তথ্য বিশ্লেষণের গুরুত্বও বেড়েছে।'
পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে শিগগিরই আধুনিক সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং বিভাগীয় পর্যায়ে আধুনিক সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট ও ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা পর্যায়েও সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি থানা ও উপজেলা পর্যায়েও এ বিষয়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে।'
এর আগে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) পুলিশ স্টাফ কলেজের পরিচালনা বোর্ডের সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, 'একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ ও প্রাতিষ্ঠানিক সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা করছে সরকার। অপরাধ বদলালে আইনও বদলাতে হবে অপরাধের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আইনেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা দরকার।'
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'পুরনো আইন দিয়ে নতুন ধরনের অপরাধ সবসময় কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায় না। বিশেষ করে অনলাইন ও সাইবার স্পেসে জুয়ার বিস্তারসহ নতুন ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নতুন আইন প্রণয়ন এবং বিদ্যমান আইন সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে।'
কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে আইন দুর্বল হলে আসামিকে গ্রেপ্তারের পরও দ্রুত জামিন বা মুক্তির সুযোগ তৈরি হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'অপরাধের ধরন ও সমাজের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার করতে হবে।'
ঝুঁকিতে ক্রাইম রিপোর্টার, সহায়তার উদ্যোগ ক্রাইম রিপোর্টিং করতে গিয়ে সাংবাদিকরা ঝুঁকির মুখে পড়লে তাদের সহায়তার জন্য সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, 'ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিক আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকার অথবা করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) আওতায় তাদের সহযোগিতা করা যায় কি না, তা নিয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।'
ক্রাইম রিপোর্টিংকে অনেকাংশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'অপরাধের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকদেরও প্রযুক্তি ও নতুন ধরনের অপরাধ সম্পর্কে দক্ষতা বাড়াতে হবে।'
তিনি বলেন, 'ক্রাইম রিপোর্টারদের ক্ষেত্রটা আলাদা। এটা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের একটা পার্ট।'
ক্রাইম রিপোর্টারদের জন্য সনদ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
ঝুঁকিপূর্ণ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সনদ দেওয়া যায় কি না, তা যাচাই করে দেখার কথা বলেন তিনি।
অপরাধ কমাতে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ সাংবাদিকদের দায়িত্বের কথা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা তৈরিতেও গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকতে হবে।'
আইন প্রণয়ন, আইন প্রয়োগ, বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গণমাধ্যম—সব পক্ষের সমন্বিত ভূমিকার মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ক্রাইম রিপোর্টারদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী (রাজনৈতিক) মো. রাশেদ খান, বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাছির জামাল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার-মিডিয়া অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ক্র্যাব সভাপতি মির্জা মেহেদী তমাল এবং সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এম এম বাদশাহ্।
