পুলিশের সামনেই রাড্ডা ক্লিনিক থেকে লুটের মালামাল পিকআপে তোলার দৃশ্য সিসিটিভি ফুটেজে
মিরপুর-১ নম্বরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে মধ্যরাতে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের সময় বাইরে পুলিশের একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকার পরেও স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি থেকে মালামাল বের করে পিকআপ ভ্যানে তুলছিলেন কয়েকজন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে এ চিত্র দেখা গেছে।
ফুটেজে আরও দেখা যায়, লুটপাট শুরুর আগে সরকারি স্থাপনা ভাঙার কাজে ব্যবহৃত একটি এক্সকাভেটর ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির দিকে এগিয়ে আসে। সেটি কেন্দ্রটির দিকে এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে মানুষের সংখ্যাও বাড়তে থাকে।
এরপর কয়েকশ মানুষকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ভেতরে ঢুকতে দেখা যায়। সিসিটিভি ফুটেজে যাদের দেখা গেছে, তাদের মুখ ঢাকা ছিল না। তাদের চলাফেরা দেখে মনে হচ্ছিল, সেখানে স্বাভাবিক কোনো নির্মাণকাজ চলছে।
পরে ঘটনাস্থলে কয়েকটি পিকআপ ভ্যান আনা হয়। এরপর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভেতর থেকে মালামাল বের করে সেগুলো পিকআপে তুলতে শুরু করেন লোকজন।
ফুটেজে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দৃশ্যটি দেখা যায় শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাত দেড়টার কিছু আগে। এ সময় পুলিশের একটি গাড়ি স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ফটকের সামনে এসে থামে। বাইরে লুট করা মালামালবোঝাই একটি পিকআপ দাঁড়িয়ে ছিল। পুলিশের গাড়িটি সেখানে থাকা অবস্থাতেও স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে মালামাল বের করে পিকআপে তোলা চলতে থাকে।
ফুটেজে পুলিশের গাড়ি থেকে কাউকে নামতে বা ঘটনাস্থলে থাকা লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে দেখা যায়নি। তবে গাড়ির ভেতর থেকে একজন পুলিশ সদস্যকে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। এ সময় অন্যরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভেতর থেকে মালামাল বের করে পিকআপে তুলতে থাকেন।
শনিবার রাত ১২টা থেকে ২টার মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। রাড্ডা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ২০০ থেকে ২৫০ জন স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা চালিয়ে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে এবং সেখানে লুটপাট ও ভাঙচুর চালায়। পরে ভারী যন্ত্রপাতি এনে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্যকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, হামলাকারীরা ওষুধ, টিকা, সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) রেজিস্টার ও নথিপত্র, পরিবার পরিকল্পনার সামগ্রী, একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, ফ্রিজ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) এবং নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। এতে মোট দেড় কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক হিসাবে বলা হয়েছে।
বেসরকারি এনজিও পরিচালিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ১৯৭৬ সাল থেকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, ইপিআই টিকাদান ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি সরকারের ইপিআই টিকাদান কর্মসূচিও পরিচালনা করত এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যসেবা দিত।
এ ঘটনায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার শাহ আলী থানায় মামলা করেছেন। মামলায় মিরপুরের বিএনপি নেতা মোহাম্মদ হানিফ মিয়া এবং অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অনধিকার প্রবেশ, চুরি, হুমকি এবং দেড় কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে হানিফ এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর হোসেন স্বীকার করেছেন, হামলা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত ছিল। পুলিশের উপস্থিতি সত্ত্বেও কেন কাউকে আটক করা হয়নি—এমন প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, অর্থের বিনিময়ে হামলায় অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা। পরে তাদের আদালতে পাঠানো হলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
ঘটনার পর শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, পুলিশের কোনো সদস্যের দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা গাফিলতি পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার সময় পুলিশের উপস্থিতি ও তাদের ভূমিকা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা দেখে বোঝা যায়, খুব অল্প সময়ের মধ্যে এ ঘটনা ঘটানো সম্ভব নয়। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় তিনি দেখতে পান, সময় নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সেখানকার বিভিন্ন যন্ত্রপাতিও পাওয়া যায়নি।
