সাভারে বাসে আগুন: ক্র্যাবের সাবেক সভাপতিকে আসামি করে মামলা, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ডিআরইউ’র
ঢাকার সাভারে সম্প্রতি সড়কের পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা একটি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। মামলায় ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) সাবেক সভাপতি কামরুজ্জামান খান ও ক্ষতিগ্রস্ত বাসের মালিকসহ ৬০-৭০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
গত সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাতে পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আব্বাস উদ্দিন বাদি হয়ে সাভার মডেল থানায় মামলাটি দায়ের করেন।
মামলায় অভিযুক্ত সবাইকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, ক্র্যাবের সাবেক সভাপতি ও ডিআরইউ-এর স্থায়ী সদস্য কামরুজ্জামান খানকে এই মামলায় আসামি করার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)।
গতকাল সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক রাশিম মোল্লা স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়।
কামরুজ্জামান খান নিজে এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি জানান, সাভারে তার বাড়ি হলেও, তিনি ঢাকাতেই বসবাস করেন।
এই অবস্থায় সাভারে সংঘটিত কোনো ঘটনায় কীভাবে তাকে আসামি করা হলো, সেটি জেনে নিজেই হতভম্ব হয়েছেন বলেও জানান তিনি।
কামরুজ্জামান খান দীর্ঘদিন যাবৎ সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ), সাভার প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের সদস্য। এছাড়াও ইতোপূর্বে ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) সভাপতিসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
বর্তমানে তিনি ইংরেজি দৈনিক 'টাইমস অব বাংলাদেশ'-এর সিনিয়র রিপোর্টার পদে কর্মরত রয়েছেন।
কামরুজ্জামান খানকে আগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। তবে তাকে এলাকায় কখনো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় দেখা যায়নি। বর্তমানেও দলীয় কোনো কার্যক্রম, কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত নন বলে দাবি করেছেন।
কামরুজ্জামান খান বলেন, '১৯৯৮ সাল থেকে সাংবাদিকতা করছি। ২০০৩ সালের ডিসেম্বর থেকে আমি ঢাকায় অপরাধ বিষয়ক বিটে (ক্রাইম বিট) ভোরের কাগজে কাজ শুরু করি। দীর্ঘদিন ভোরের কাগজে ছিলাম। গত এক বছর আগে আমি ইংরেজি দৈনিক টাইমস অব বাংলাদেশে সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে কাজ শুরু করেছি।'
তিনি বলেন, 'পেশাগত জীবনে জাতীয় প্রেস ক্লাব, সাভার প্রেস ক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সদস্য। ক্রাইম রিপোর্টার্স ইউনিটির বিভিন্ন দায়িত্বেও আমি ছিলাম।'
তিনি আরও বলেন, 'যেহেতু ঢাকায় কাজ করি তাই ঢাকাতেই অনেক বছর ধরে সেটেল্ড। নিজেকে পেশাদার সংবাদকর্মী বলে মনে করি। সাভারে আওয়ামী লীগের কমিটিতে আমার নাম ছিল। কিন্তু আমি কখনোই সক্রিয় ছিলাম না। সাভারের সাংবাদিক সহকর্মীদের কাছ থেকে মামলাতে আমার নাম রয়েছে জানতে পেরে হতভম্ব, হতবাক হয়েছি।'
এদিকে গত সোমবার দায়ের হওয়া মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গত সোমবার রাত ২টা ৪০ মিনিটে সাভারের রেডিও কলোনি ইউটার্নে অবস্থান করছিলেন সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আব্বাস উদ্দিন।
স্থানীয়দের কাছ থেকে রেডিও কলোনি স্টাফ কোয়ার্টারের অদূরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনে ছাত্রলীগের লোকজন 'জয় বাংলা'- স্লোগান দিয়ে পেট্রোল বোমাসহ একটি বাসে আগুন দেওয়ার লক্ষ্যে জড়ো হয়েছেন বলে জানতে পারেন।
ফোর্সসহ তিনি সেখানে গিয়ে দেখতে পান, ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের নামে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে ৬০-৭০ জন লোক একটি বাসে পেট্রোল বোমা মেরে অগ্নিসংযোগ করছেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অধিকাংশ আসামি মোটরসাইকেল ও মাইক্রোবাসে করে, অন্যান্য আসামিরা আশপাশের বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যান। কয়েকজন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীকে চিনতে পারেন তিনি
আগুন নেভানোর জন্য দ্রুত ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হলে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে এসে আগুন নেভান। পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তিনি আসামিদের শনাক্ত করেন।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, স্থানীয় লোকজনদের জিজ্ঞাসাবাদে ও গোপন সূত্রে জানা যায়, জ্বলতে থাকা সাভার পরিবহনের মালিক আসামি হাবিবুর রহমান হৃদয় (২৫) একজন ছাত্রলীগ সমর্থক এবং আওয়ামী লীগের নেতা ঢাকা-১৯ (সাভার) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুরাদ জংয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী।
হাবিবুর রহমান অসৎ উদ্দেশ্যে তার সাভার পরিবহন বাসটির ইঞ্জিন ও গিয়ার বক্স ছাড়া রাস্তার পাশে ফুটপাতে পার্কিং করে রেখেছিলেন। হাবিবুর রহমান এবং মুরাদ জং এবং বিরুলিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সেলিম মণ্ডলের নির্দেশে, সহায়তায় ও পৃষ্ঠপোষকতায় অন্যান্য আসামিদের জড়ো করে বাসটিতে অগ্নিসংযোগ করেছেন।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, অভিযান পরিচালনা করে ঘটনার রাতেই সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের আকরাইন বাজার এলাকা থেকে সাভার সদর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সোহেল রানাকে (৩০) গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বাসে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে অগ্নিসংযোগের কথা স্বীকার করেছেন।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, 'বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে ৪০ জনের নাম উল্লেখসহ ২০-৩০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে থানায় মামলা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে কেউ ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থাকলে তদন্তের পর প্রমাণ না পাওয়া গেলে মামলা থেকে অবশ্যই অব্যাহতি দেওয়া হবে।'
ডিআরইউ-এর বিবৃতি
গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে ডিআরইউ কার্যনির্বাহী কমিটির পক্ষে সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, কামরুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে করা মামলায় তাকে ১৮ নম্বর আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় ৪০ জনের নাম উল্লেখ করার পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
বিবৃতিতে ডিআরইউ নেতারা বলেন, মামলার এজাহারে কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তার কথিত সম্পৃক্ততার বিষয়ে কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। কোনো সাংবাদিককে হয়রানি বা পেশাগতভাবে চাপে ফেলার উদ্দেশ্যে মামলা ব্যবহার করা হলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য উদ্বেগজনক।
তারা আরও জানান, কামরুজ্জামান খান দীর্ঘদিন ধরে সাভারে বসবাস করেন না। এ অবস্থায় সাভারে সংঘটিত একটি ঘটনায় তাকে আসামি করার বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য তথ্য-প্রমাণ ছাড়া হয়রানিমূলক পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি তারা আহ্বান জানান।
