যানজট কমাতে অবৈধ অটোরিকশা চার্জিং পয়েন্ট বন্ধের নির্দেশ, সড়ক খননেও কড়াকড়ি সরকারের
ঢাকায় যানজট কমাতে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট শনাক্ত ও বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি সড়কে কোনো কাজ শুরুর আগে ট্রাফিক বিভাগের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা এবং উন্নয়ন প্রকল্প শেষ করতে দেরি হলে জরিমানা আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বিদ্যুতের লাইনে অবৈধ সংযোগ দিয়ে যেসব চার্জিং পয়েন্ট চলছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানাতে বিদ্যুৎ বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভাগ, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও সিটি করপোরেশনগুলো যৌথভাবে অবৈধভাবে পরিচালিত কারখানা ও প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেবে।
ঢাকা বিমানবন্দর ফ্লাইওভারের আশপাশে সড়কের পাশে ফেলে রাখা মাটি ও নির্মাণসামগ্রী দ্রুত সরিয়ে যান চলাচলের উপযোগী করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা সড়কগুলো চিহ্নিত করে জনসাধারণের চলাচলের জন্য খুলে দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
সড়কে কাজের আগে ট্রাফিক বিভাগের অনুমতি, দেরি হলে জরিমানা
ডিএমপির আওতাধীন এলাকায় কোনো উন্নয়নকাজ শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের মতামত ও অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভায়।
সভায় বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন সংস্থাগুলো কাজ শুরুর মাত্র দুই-তিন দিন আগে ট্রাফিক বিভাগকে অবহিত করে। আবার কখনো অনুমতি ছাড়াই খননকাজ শুরু করে। বিশেষ করে শাখা বা সার্ভিস রোডে অনুমতি ছাড়া কাজ করার প্রবণতা বেশি, যা তীব্র যানজট ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি/ডিএসসিসি), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (আরএইচডি) বা সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার কাছ থেকে রাস্তা খননের অনুমতি নেওয়ার আগেই ট্রাফিক বিভাগের মতামত নিতে হবে। আবেদনপত্রের সঙ্গে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান (টিএমপি), কাজের সময়সূচি (ওয়ার্ক শিডিউল) এবং ট্রাফিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য জমা দিতে হবে।
এ ছাড়া কাজ শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারের সঙ্গে যৌথভাবে নির্মাণস্থল পরিদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রধান সড়কে কাজ শুরুর আগে ডিটিসিএর অনুমোদন নিয়ে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগকে অবহিত করতে হবে। শাখা সড়কের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। তবে বিকল্প রাস্তা থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী রাস্তা বন্ধ করে কাজ করা যাবে।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নির্বিঘ্ন রাখতে কর্মদিবসে রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত নির্মাণকাজ পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার বেশি জনবল ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে ২৪ ঘণ্টা কাজ চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে দ্রুত কাজ শেষ করে জনদুর্ভোগ কমানো যায়।
সভায় বলা হয়, উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে তাদের দাখিল করা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই কাজ শেষ করতে হবে এবং কাজের সময়সূচি শতভাগ অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং জরিমানা করা হবে। গৃহীত ব্যবস্থা ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগকে জানাতে হবে। ভবিষ্যতে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের মূল্যায়নে ডিএমপির প্রতিবেদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
সভায় আরও জানানো হয়, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) আইন, ২০১২ অনুযায়ী ট্রাফিক চলাচলে প্রভাব ফেলে এমন প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরুর আগে ট্রাফিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (টিআইএ) করা বাধ্যতামূলক। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের মতামতের ভিত্তিতে ডিটিসিএ প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে।
টিআইএতে শুধু প্রকল্প এলাকার করিডোর নয়, পুরো ঢাকার সড়ক নেটওয়ার্কের ওপর প্রকল্পের প্রভাব বিশ্লেষণ করতে হবে। এ জন্য স্বীকৃত ট্রাফিক মডেলিং পদ্ধতি ব্যবহার করে একাধিক বিকল্প ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি এবং তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সবচেয়ে কার্যকর পরিকল্পনা নির্বাচন করতে হবে।
নির্বাচিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও ডাইভারশন পরিকল্পনা (টিএমপি) তৈরি করে ডিটিসিএর অনুমোদনের জন্য জমা দিতে হবে। অনুমোদিত টিআইএ ও টিএমপি যথাযথভাবে অনুসরণ না করলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার বিরুদ্ধে জরিমানা ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নির্মাণস্থলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা
উন্নয়নকাজ চলাকালে যানজট ও দুর্ঘটনা কমাতে নির্মাণস্থলে প্রশিক্ষিত সিগন্যালম্যান নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি নির্মাণস্থলে পর্যাপ্তসংখ্যক প্রশিক্ষিত ট্রাফিক সিগন্যালম্যান থাকতে হবে। তারা সরাসরি সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের অধীনে দায়িত্ব পালন করবেন। তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে।
এ ছাড়া নির্মাণকাজের আশপাশের বিকল্প সড়কে তৈরি হওয়া ছোট গর্ত দ্রুত সংস্কার করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই চলাচলযোগ্য লেন বা ফুটপাতে নির্মাণসামগ্রী, বালু বা যন্ত্রপাতি রাখা যাবে না।
দুর্ঘটনা এড়াতে নির্মাণস্থলের উভয় পাশে অন্তত পাঁচ থেকে ছয় ফুট উঁচু কংক্রিট বা স্টিলের ব্যারিয়ার দিয়ে ঘিরে রাখতে হবে। পাশাপাশি সাইটে পর্যাপ্ত ওয়াটার ট্যাংক ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখতে হবে এবং ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের জরুরি নম্বরসংবলিত সাইনবোর্ড স্থাপন করতে হবে।
নির্মাণকাজ শুরুর আগে আশপাশের বাসিন্দাদের মাইকিং বা প্রচারণার মাধ্যমে জানাতে হবে। মোটরসাইকেলসহ ছোট যানবাহনের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ফুটপাত বা ড্রেনের ওপর প্রয়োজনীয় ফিল প্লেট বসানোর কথাও বলা হয়েছে।
উন্নয়নকাজ নিয়ে মাসিক যৌথ পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক
সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ঢাকায় চলমান সড়ক উন্নয়ন ও নির্মাণকাজের অগ্রগতি এবং এসব কাজের কারণে সৃষ্ট সাময়িক জনদুর্ভোগ নিরসনে মাসিক যৌথ পর্যালোচনা সভা আয়োজন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক), ডিএমপির সভাপতিত্বে প্রতি মাসে অন্তত একবার সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সংস্থা ও ঠিকাদারদের উপস্থিতিতে সমন্বয় সভা করতে হবে। সভায় প্রকল্পের অগ্রগতি, সময়সূচি ও জনদুর্ভোগ পরিস্থিতি বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হবে।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ চলমান কাজের কারণে সৃষ্ট যানজট, নিরাপত্তাঝুঁকি ও অন্যান্য সমস্যা চিহ্নিত করে সচিত্র প্রতিবেদন উপস্থাপন করবে। সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সংস্থাকে এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হবে এবং পরবর্তী সভায় অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে।
পাবলিক পরীক্ষা চলাকালে স্কুল-কলেজসংলগ্ন সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে এবং হাসপাতাল এলাকায় জরুরি রোগী পরিবহন নির্বিঘ্ন করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষায় ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ, পানি ছিটানো এবং শব্দদূষণসংক্রান্ত আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সভায় আরও বলা হয়, পর্যাপ্ত নির্মাণসামগ্রী ছাড়া রাস্তা খনন করে দীর্ঘদিন কাজ ফেলে রাখা যাবে না। এমন ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ছাড়া ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে (ডিটিসিএ) আহ্বায়ক করে একটি সমন্বয় কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিটিতে রেলপথ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), ঢাকা ওয়াসা, তিতাস গ্যাস, ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল), বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল), রাজউকসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিরা থাকবেন।
রাজধানীর উন্নয়নকাজের সমন্বয়, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং জনদুর্ভোগ কমাতে একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে ১০ দিনের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে কমিটিকে বলা হয়েছে।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১ অক্টোবর বিকেল ৩টায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনায় একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হবে।
