সার সংগ্রহের জরুরি দৌড়ঝাঁপ: যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সরবরাহে বিঘ্নের মধ্যে বিকল্প উৎসের সন্ধানে সরকার
আসন্ন বোরো মৌসুমে ইউরিয়া সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতি এড়িয়ে বিকল্প উৎসের সন্ধানে নেমেছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সার সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায়—রাশিয়া, ব্রুনাই এবং মালয়েশিয়ার সঙ্গে সরকারের সঙ্গে সরকারের (জিটুজি) চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিল্প মন্ত্রণালয় বর্তমানে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান 'প্রডিনটর্গ', মালয়েশিয়ার 'পেট্রোনাস কেমিক্যালস' এবং ব্রুনাইয়ের 'বিএফআই'-এর সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সার রপ্তানির প্রধান নৌপথ—হরমুজ প্রণালি এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সামুদ্রিক চোকপয়েন্ট বা সংবেদনশীল নৌপথগুলো এড়িয়ে চলাই, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ভার্চ্যুয়ালি অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপিত শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক প্রস্তাবে এসব উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
উপসাগরীয় অঞ্চলে নৌপরিবহনে ঝুঁকি বাড়া সত্ত্বেও, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান 'ফার্টিগ্লোব' থেকে প্রথাগত ফ্রেইট-অন-বোর্ড বা এফওবি কাঠামোর বদলে—সংশোধিত সিএফআর (কস্ট-অ্যান্ড-ফ্রেইট) শর্তে—ইউরিয়া আমদানি অব্যাহত রাখার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে কমিটি। পরবর্তীতে শিল্প মন্ত্রণালয় সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি থেকে এই ব্যবস্থার ভূতাপেক্ষ অনুমোদন নেবে।
এ ছাড়া রাশিয়ার 'জেএসসি ফরেন ইকোনমিক কর্পোরেশন প্রডিনটরগ'-এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী জিটুজি সার আমদানি চুক্তি স্বাক্ষরের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে কমিটি। এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বাংলাদেশে এমওপি সার সরবরাহ করে থাকে। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত এই কোম্পানি থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এমওপি সার আমদানি করে বাংলাদেশ।
দেশে ইউরিয়া সারের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ টন, এর মধ্যে আগামী ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত, বোরো মওসুমের পিক সিজন বা সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে—ইউরিয়ার চাহিদা থাকবে ১৪ লাখ টন। গত ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ইউরিয়ার মজুদ রয়েছে ৩.৭৬ লাখ টন। গতবছরও একই সময়ে প্রায় সমপরিমাণ ইউরিয়ার মজুদ থাকলেও—মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত না থাকায় ও আমদানি ব্যাহত না হওয়ায় দেশে সারের কোন সংকট হয়নি।
বাংলাদেশ নন-ইউরিয়া সার, যেমন ডিএপি, এমওপি এবং পটাশ মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে না। ফলে এসব সার সরবরাহে সংকট হওয়ার কোনও কারণ নেই। সরকারিভাবে ক্রয়ের পাশাপাশি বেসরকারিখাতকেও নন-ইউরিয়া সার আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
কৃষিসচিব রফিকুল ই মোহাম্মদ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, হরমুজ প্রণালি ও আশেপাশের নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে সরকার বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। তিনি বলেন, "সরকার বিকল্প উৎস থেকে সার, জ্বালানি তেল এবং অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এর কোনো বিকল্প নেই।"
তিনি আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে—বাংলাদেশ এখন ব্রুনাই, মরক্কো, মালয়েশিয়া এবং চীনের দিকে নজর দিচ্ছে। একই সঙ্গে কানাডা ও তিউনিসিয়ার সঙ্গেও আলোচনা শুরু হয়েছে।
"কৃষি উৎপাদনের এই আবশ্যিক উপকরণের আমদানি নিশ্চিত করা এবং মজুত গড়ে তোলার জন্য সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। এই মুহূর্তে খরচ আমাদের মূল বিবেচ্য নয়; সরবরাহ নিশ্চিত করাই মূল অগ্রাধিকার," যোগ করেন তিনি।
স্থানীয়ভাবে ইউরিয়া উৎপাদন ব্যাহত
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনে থাকা পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে বর্তমানে কেবল ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসি চালু রয়েছে। গ্যাসের অভাবে বাকি চারটি চলতি বছরের শুরু থেকেই বন্ধ রয়েছে। তবে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড পুনরায় চালু করতে—গত ২৫ আগস্ট থেকে গ্যাস সরবরাহ করছে সরকার। তবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে কারখানাটি এখনও চালু করা সম্ভব হয়নি বলে শিল্প মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
এ ছাড়া, বহুজাতিক ইউরিয়া সার কারখানা– কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) নির্ধারিত ওভারহোলিং সম্পন্ন করতে আগামী ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। ফলে দেশীয় উৎস থেকে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইউরিয়া সারের যোগান পাচ্ছে না সরকার।
হুথিদের নিয়ন্ত্রণে বাব-আল মান্দেব, সৌদি থেকে আমদানি ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা
প্রথাগতভাবে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়, সৌদি আরবের সৌদি বেসিক ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (সাবিক) থেকে ইউরিয়া সার আমদানি করে এসেছে। সৌদি আরব তাদের আল-জুবাইল বন্দরের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশে ইউরিয়া রপ্তানি করতো।
কিন্তু ইরান যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার সরবরাহে ঝুঁকি থাকায়—সৌদি আরব আল-জুবাইল বন্দরের পরিবর্তে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে জাহাজে সার লোড দিচ্ছে বলে অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিকে জানিয়েছে বাংলাদেশে ইউরিয়া উৎপাদন, আমদানি ও সরবরাহকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিসিআইসি।
চুক্তির শর্ত পাল্টে সার দিবে আমিরাত
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ফার্টিগ্লোব থেকে জিটুজি চুক্তির আওতায়, ২০০৭ সাল থেকে ইউরিয়া আমদানি করে সরকার। গত আগস্টে এফওবি পদ্ধতিতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সার আমদানির চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও—হরমুজ প্রণালি দিয়ে বর্তমানে সার পরিবহনে ঝূঁকি থাকায়—আমিরাত এখন এফওবি'র বদলে সিএফআর পদ্ধতিতে সার রপ্তানির প্রস্তাব করেছে। জরুরিভিত্তিতে সারের মজুত গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে মন্ত্রিসভা কমিটি এই সংশোধিত শর্ত মেনে অনুমোদন দিয়েছে।
এফওবি পদ্ধতিতে আমদানি হলে, জাহাজ ভাড়া বাংলাদেশ বহন করতো এবং বাংলাদেশ জাহাজ পাঠিয়ে সার নিয়ে আসতো। সার বাংলাদেশের বন্দরে আসার পর বাংলাদেশ নিজের মতো করে সার খালাস করতো। কিন্তু, সিএফআর পদ্ধতিতে আমদানি হলে জাহাজ ঠিক করে দেবে আমিরাতের ফার্টিগ্লোব এবং তাদের শর্ত মেনে বন্দরে সার খালাস করতে হবে। সার খালাসে দেরি হলে বাংলাদেশকে ডেমারেজ বা ক্ষতিপূরণ মাশুল দিতে হবে।
ফার্টিগ্লোব বাংলাদেশের বন্দরগুলোতে প্রতিদিন সর্বনিম্ন ৫,০০০ টন সার খালাসের শর্ত দিয়েছে। এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে, বিলম্বের জন্য প্রতিদিন ৪০ হাজার ডলার (প্রায় ৫০ লাখ টাকা) ডেম্যুরেজ বা জরিমানা গুনতে হবে। বিসিআইসির পরিবহন ঠিকাদাররা সতর্ক করে জানিয়েছেন, বন্দরের বর্তমান অবকাঠামো দিয়ে দিনে সর্বোচ্চ ৩,০০০ টন সার খালাস করা সম্ভব; যা প্রতিদিন বড় অংকের জরিমানা গোনার ঝুঁকি তৈরি করছে।
এ ছাড়া, চুক্তিতে যে পদ্ধতিতে সারের দাম নির্ধারণ করার কথা ছিল, তাতেও পরিবর্তন এনেছে আমিরাত। এর আওতায়, লোডিং বা হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহনে সাপ্তাহিক বাজার বুলেটিনের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারিত হবে, যা আলোচনা-সাপেক্ষ। জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার পর—শিপিং নথিপত্র জমা দিলেই অর্থ পরিশোধ শুরু হবে।
সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে ফার্টিগ্লোব তাদের মিশরীয় অঙ্গপ্রতিষ্ঠান 'ইজিপশিয়ান ফার্টিলাইজার কোম্পানি' থেকে লোহিত সাগর হয়ে বাংলাদেশে জরুরিভিত্তিতে দুটি সারের চালানও পাঠিয়েছে।
