বাণিজ্যে গতি আনতে লাকসাম-চট্টগ্রাম রেললাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের উদ্যোগ
চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী বন্দর দিয়ে পণ্য ও কনটেইনার পরিবহন সহজ করতে এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রসারের লক্ষ্যে লাকসাম-চট্টগ্রাম রেল সংযোগকে ডুয়েলগেজে উন্নীত করতে ১৬ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার।
টিবিএসের দেখা রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী, এই প্রকল্পের আওতায় বর্তমান ১৩১.২০ কিলোমিটার মিটারগেজ ডাবল লাইনকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে রূপান্তর করা হবে। এর ফলে এই রুটে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ, উভয় ধরনের ট্রেনই চলাচল করতে পারবে।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার জন্য প্রস্তুত করা নথিপত্র অনুসারে, এ উদ্যোগের ফলে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো থেকে দেশজুড়ে পণ্য ও কনটেইনার পরিবহন সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
'লাকসাম-চট্টগ্রাম মিটারগেজ ডাবল ট্র্যাককে ডুয়েলগেজ ডাবল ট্র্যাকে রূপান্তর' শীর্ষক এ প্রকল্পের আরেকটি লক্ষ্য হলো, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে গতি আনা এবং ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে সংযোগ সুসংহত করা।
প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয়ের মধ্যে ১৪ হাজার ১৩০ কোটি টাকা জোগান দেওয়া হবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ঋণ নিয়ে। আর সরকারের তহবিল থেকে দেওয়া হবে ২ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ রেলওয়ে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০৩২ সালের ৩০ জুন মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
পিইসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে যত কনটেইনার পরিবহন হয়, রেলওয়ের মাধ্যমে তার মাত্র ৪ শতাংশ হয়ে থাকে। সরকার রেলওয়ের মাধ্যমে ৫০ শতাংশ কনটেইনার পরিবহনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এজন্য গেজ ইউনিফিকেশন করে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল করিডোরকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের মাধ্যমে আংশিকভাবে এই লক্ষ্য পূরণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই রেল করিডোর ট্রান্স-এশিয়ান রেলপথ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য রেল যোগাযোগ আরও দৃঢ় করবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরের ঢাকা থেকে টঙ্গী ২২.৯৪ কিলোমিটার এবং আখাউড়া থেকে লাকসাম ৭১.২৪ কিলোমিটার অংশের মিটারগেজ সিঙ্গল লাইন ট্র্যাককে ইতিমধ্যে ডাবল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাকে রূপান্তর করা হয়েছে।
বাকি ২২৫.৮৫ কিলোমিটার পথের মধ্যে রয়েছে টঙ্গী-ভৈরব বাজার-আখাউড়া ৯৭.০১ কিলোমিটার ও লাকসাম-চট্টগ্রাম ১৩১.২০ কিলোমিটার অংশ। এই দুই অংশের মিটারগেজ ডাবল লাইন ট্র্যাককে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা প্রয়োজন। এজন্যই এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ প্রকল্পের ডিজাইন পরামর্শক হিসেবে কানাডার কানাডা-ভিত্তিক ক্যানারেইল কনসালট্যান্ট ইনকর্পোরেটেডকে প্রধান পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি অস্ট্রেলিয়ার এসএমইসি কনসালট্যান্টস পিটিআই লিমিটেড, ফ্রান্সের সিস্ট্রা এসএ, বাংলাদেশের এইস কনসালট্যান্ট লিমিটেড ও স্ট্র্যাটেজি কনসালট্যান্ট লিমিটেডের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কাজ করছে।
এই পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে জানিয়েছে, প্রকল্পটি আর্থিকভাবে লাভজনক, কারিগরিভাবে বাস্তবায়নযোগ্য এবং এর সামাজিক ও পরিবেশগত যৌক্তিকতাও রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল লিংকের সাথে যুক্ত হয়ে কক্সবাজার ও মাতারবাড়ী বন্দর থেকে যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রাফিক উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।
এছাড়া প্রকল্পের ফলে লাকসাম-চট্টগ্রাম অংশে ট্রেন পরিচালনার ব্যয় কমার পাশাপাশি ব্রডগেজ ট্রেনের গতি বেড়ে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার ও মিটারগেজের গতি ৮০ কিলোমিটারে উন্নীত হবে। এতে যাত্রীদের ভ্রমণের সময়ও উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।
প্রকল্পটি জাতীয় মহাসড়কের ওপর পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ কমাবে এবং দেশের লজিস্টিক খাতে বড় পরিবর্তন আনবে বলে আশা আশা করা হচ্ছে।
