গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখানো হয়েছে: আইনমন্ত্রী
গত ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে 'জিরো টলারেন্স' দেখানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, এসব ঘটনা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। পুলিশ কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেছে—এমন কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
আজ বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ ও ঢাকাস্থ আমেরিকা দূতাবাস যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
আইনমন্ত্রী বলেন, 'আমরা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত বা এ ধরনের অপরাধ থেকে উদ্ভূত মামলাগুলো নিষ্পত্তির চেষ্টা করছি। কোনো ব্যক্তি আমাদের লক্ষ্য নয়; আমাদের লক্ষ্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সম্পন্ন করা। ঘটনাচক্রে, এসব অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের অনেকে রাজনৈতিক পদে ছিলেন।'
তিনি আরও বলেন, 'এখন পর্যন্ত আমাদের বিচারব্যবস্থা যেসব মামলার মুখোমুখি হয়েছে, সেগুলোতে আমরা সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের হাতে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। প্রমাণগুলো এতটাই শক্তিশালী, বিশ্বের যেকোনো ট্রাইব্যুনালই এই সিদ্ধান্তে আসতে বাধ্য হবে যে, সন্দেহাতীতভাবে এসব ব্যক্তির মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। আর সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণ করা ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি।'
এসময় মানবাধিকার কমিশন আইন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানান, সকালে তিনি ইউএনডিপি'র কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভের কাছ থেকে একটি বার্তা পেয়েছেন, যেখানে বলা হয়েছে—'আমরা আমাদের দেশে একটি শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা করেছি।'
আইনমন্ত্রী বলেন, 'আইনের কিছু ধারা নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে। তবে আমরা অত্যন্ত সতর্ক ও সচেতনভাবে এই আইন প্রণয়ন করেছি, যাতে এ দেশের মানুষের অধিকার নিরাপদ থাকে এবং যথাযথভাবে সুরক্ষিত হয়। আমরা মানবাধিকার কমিশন আইনে 'অপক্যাট' অন্তর্ভুক্ত করেছি, যা অনেক দেশ করেনি। নির্বাচন কমিটিতেও আমরা প্রেস ক্লাব এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বিধান রেখেছি।'
প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমাদের প্রতিবেশী দেশসহ যেসব দেশ মানবাধিকারের ক্ষেত্রে 'এ' ক্যাটাগরিভুক্ত হিসেবে বিবেচিত, সেসব দেশে মানবাধিকার কমিশনের নির্বাচন কমিটির নেতৃত্বে থাকেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু আমাদের দেশে এই নির্বাচন কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন স্পিকার এবং এতে বিরোধীদলীয় নেতাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনারের বক্তব্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিসটেনসন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সূচনা হয়েছে 'উই দ্য পিওপল'—এই সরল অথচ তাৎপর্যপূর্ণ বাক্য দিয়ে। ১৭৮৭ সালের গ্রীষ্মে ফিলাডেলফিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের জন্য প্রতিনিধিরা সমবেত হয়েছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য ও বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও তারা এমন একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে ক্ষমতার পৃথকীকরণ ও পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যাতে সম্পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়।
রাষ্ট্রদূত বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর কনস্টিটিউশন ডে পালিত হয়। এ দিনটি দেশটির সাংবিধানিক ঐতিহ্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে ভাবনার একটি সুযোগ তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান বিভিন্ন সময়ে সংশোধিত হয়েছে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রেখেছে।
তিনি আরও বলেন, সাংবিধানিক শাসন, আইনের শাসন এবং জনগণের অংশগ্রহণের বিষয়গুলো শুধু কোনো একটি দেশের জন্য নির্দিষ্ট নয়; বরং নিজস্ব রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনায় আগ্রহী সব সমাজের জন্যই এসব গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন ও সাংবিধানিক চর্চার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশও একটি নতুন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। ক্ষমতার পৃথকীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশেও গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকরামুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্ব শেষে 'ইউএস কনস্টিটিউশন' বিষয়ক একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ব্যবস্থা, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক অধিকার এবং দুই দেশের সাংবিধানিক অভিজ্ঞতার তুলনামূলক দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। আলোচনায় শিক্ষক, আইনজীবী, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন।
