ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা নেই: বিপিসি চেয়ারম্যান
জ্বালানি তেল কেনাকাটায় চ্যালেঞ্জ এবং নৌপথে নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে কোনো জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রামে বিপিসি সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা জানান।
বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, 'ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহে কোনো সমস্যা হবে না।' তিনি উল্লেখ করেন, জ্বালানি তেল সংগ্রহ বা কেনাকাটা বর্তমানে বিপিসির অন্যতম স্বল্পমেয়াদি চ্যালেঞ্জ, তবে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'আমাদের যা প্রয়োজন, আমরা তা-ই করছি। জ্বালানি সংগ্রহ একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবে কোনো বিঘ্ন যাতে না ঘটে সে জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি।'
তিনি আরও জানান, জ্বালানি সরবরাহ অবকাঠামো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কয়েকটি তাৎক্ষণিক উদ্যোগ বাস্তবায়নে ডিসেম্বরকে লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে নির্ধারণ করেছে বিপিসি। কারিগরি, আইনি ও অন্যান্য ব্যবহারিক সমস্যার কারণে কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশি সময় লাগতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'আমি নির্দিষ্ট তারিখ ও ডেডলাইন মেনে কাজ করায় বিশ্বাসী।'
ঢাকা-চট্টগ্রাম জ্বালানি পাইপলাইন পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাকি বাধাগুলো দূর করতে বিপিসি কাজ করছে বলে জানান সংস্থাটির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বিপিসি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করেছে এবং সুনির্দিষ্ট সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করছে।
এই পাইপলাইনটি চালু হলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে জ্বালানি পরিবহন উন্নত হবে এবং সড়কপথের ওপর নির্ভরতা কমবে।
এ ছাড়া 'জেট-১' পাইপলাইন প্রকল্পটি যত দ্রুত সম্ভব শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান আগামী মার্চের মধ্যে কাজটি শেষ করতে চাইলেও বিপিসি এটি ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার জন্য চাপ দিচ্ছে। তিনি বলেন, 'আমরা চাই এটি ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হোক। আমরা যত দ্রুত সম্ভব এটি শেষ করার চেষ্টা করব।'
দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে রফিকুল ইসলাম জানান, এ বিষয়ে শিগগিরই একটি অগ্রগতি জানা যেতে পারে। তিনি বলেন, 'আমরা আশা করছি আগামীকাল এ বিষয়ে ইতিবাচক কিছু শুনতে পাব।' এসপিএম প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হলো আমদানি করা অপরিশোধিত ও পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য দ্রুত খালাস করা এবং বিদ্যমান জ্বালানি খালাস অবকাঠামোর ওপর চাপ কমানো।
অন্যদিকে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) ইউনিট-২ প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ এগিয়ে চলছে বলে জানান বিপিসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, প্রকল্প পরিচালক ইতোমধ্যে প্রকল্প কার্যালয় স্থাপন করেছেন এবং যেসব কাজ অবিলম্বে শুরু করা যায় তা চিহ্নিত করছেন।
তিনি বলেন, 'কিছু অগ্রিম কাজ শুরু করা যেতে পারে। আমরা সেই কাজগুলো চিহ্নিত করেছি এবং সেগুলো শিগগিরই শুরু হবে।' তবে আদালতসংক্রান্ত মামলা ও অন্যান্য জটিলতার কারণে কিছু প্রকল্প বিলম্বিত হতে পারে স্বীকার করে তিনি জানান, সব ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সমাপ্তির তারিখ দেওয়া কঠিন।
লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে ধারাবাহিক বিঘ্ন ঘটার প্রেক্ষাপটে বিপিসি এলপিজি আমদানির জন্য বিকল্প উৎস ও রুট খুঁজে দেখছে বলে জানান সংস্থাটির চেয়ারম্যান। তিনি জানান, নাইজেরিয়া থেকে সম্ভাব্য এলপিজি আমদানির বিষয়ে মঙ্গলবার একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে বিপিসির অর্থ পরিচালক উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, 'আমাদের কাছে উপলব্ধ সমস্ত কার্যক্রম ও বিকল্পগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি।'
সরকারি অনুমোদনের পর এলপিজি আমদানি প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম বলেন, এই মাসের শেষের দিকে এলপিজির একটি চালান আসতে পারে। বিপিসি দুটি উপায়ের কথা বিবেচনা করছে উল্লেখ করে তিনি জানান, একটি উপায়ে বিদ্যমান সুবিধা বা টার্মিনাল ব্যবহার করে এলপিজি আমদানি করা হবে এবং পরে অপারেটরদের মাধ্যমে তা বিতরণ করা হবে। অন্য উপায়ে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মাধ্যমে একটি চালান আনা হতে পারে। চলতি মাসেই প্রথম চালানটি আসতে পারে, আর বিএসসির মাধ্যমে আনা চালানটি ডিসেম্বর বা জানুয়ারির দিকে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা কতটুকু করতে পারি তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছি। কাজ চলমান রয়েছে।'
সরকার এই খাতের জন্য কৌশলগত নীতি গ্রহণের পর বাংলাদেশে এলপিজির বাজার উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে বলে জানান রফিকুল ইসলাম। তিনি স্মরণ করে বলেন, ২০১৬ সালে যখন তিনি খসড়া নীতি নিয়ে কাজ করছিলেন, তখন এলপিজির ব্যবহার ছিল ৫ লাখ টনের কম। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টনে, যেখানে এই বাজারের ধারণক্ষমতা প্রায় ৬৭ লাখ টনে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, 'অনেক নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সেগুলো এখনো পরিপক্ব পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবে আমরা সেগুলো যত দ্রুত সম্ভব পরিপক্ব করার চেষ্টা করছি।' এলপিজি সরকারের একটি অগ্রাধিকারমূলক বিষয় হওয়ায় বিপিসি এসব উদ্যোগ নিয়ে এগোচ্ছে বলে তিনি জানান।
তবে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ থাকলে রাতারাতি নতুন জ্বালানি অবকাঠামো তৈরি করা কঠিন মন্তব্য করে বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, 'বেসরকারি খাতের সঙ্গে কাজ করার সময় অনেক ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা থাকে। সেই গ্যাপগুলো মেটাতে সময়ের প্রয়োজন হয়।'
উক্ত মতবিনিময় সভায় বিপিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কর্মরত সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
