মানবতাবিরোধী অপরাধে হাসিনা, কামাল ও কাদেরসহ এখন পর্যন্ত ২২ জনের মৃত্যুদণ্ড
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের সাত মামলায় এ পর্যন্ত ৬৮ জনকে দণ্ড প্রদান করেছেন, যার মধ্যে ২২ জন মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২২ জনের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এবং সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ ১৮ জন পলাতক রয়েছেন এবং চারজন কারাগারে আছেন।
আজ (১৫ সেপ্টেম্বর) ট্রাইব্যুনাল-২ কর্তৃক ঘোষিত সর্বশেষ রায়ের মধ্য দিয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মোট আসামির সংখ্যা হল ২২ জন। ট্রাইব্যুনাল নিষিদ্ধ ঘোষিত দল আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের আরও ছয় নেতাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন।
এই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য ছয়জন হলেন সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, যুবলীগ সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং এর সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। এই সাতজনের অনুপস্থিতিতেই বিচারকাজ সম্পন্ন করা হয়।
এই রায়টি জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঘোষিত সপ্তম রায়।
সাতটি রায়ের পরিসংখ্যান
প্রথম ছয়টি রায়ে মোট ৬১ জনকে দণ্ড প্রদান করা হয়, যার মধ্যে ১৫ জন পৃথক ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। ওই মামলাগুলোতে মোট মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা ছিল ১৬টি, কারণ ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান চানঁখারপুল ও রামপুরা—উভয় মামলাতেই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন। সপ্তম রায়ে নতুন করে আরও সাতজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের তালিকায় যুক্ত হন এবং মোট দণ্ডপ্রাপ্তের সংখ্যায় আরও সাতজন যোগ হন। এর ফলে সার্বিক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে: মোট ৬৮ জন দণ্ডপ্রাপ্ত এবং ২২ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।
সাতটি রায়ের বিবরণ
১. শেখ হাসিনা মামলা — ১৭ নভেম্বর ২০২৫ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, যিনি রাজসাক্ষী হয়েছিলেন, তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা ও কামালের বিচার তাদের অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়।
২. চানঁখারপুল হত্যাকাণ্ড — ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং সাবেক এডিসি শাহ আলম মোহাম্মদ আখতারুল ইসলাম—এই তিন সাবেক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। অন্য পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তাকে তিন থেকে ছয় বছরের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
৩. আশুলিয়া হত্যাকাণ্ড ও লাশ পোড়ানো — ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম এবং যুবলীগ ক্যাডার রনি ভূঁইয়াসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সাজাপ্রাপ্ত অন্য চার সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা হলেন এএফএম সায়েদ, আব্দুল মালেক, বিশ্বজিৎ সাহা এবং মুকুল চোখদার। এ ছাড়া অন্য নয়জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়—যার মধ্যে সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং দুজনকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
৪. আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড — ৯ এপ্রিল ২০২৬ সাবেক এএসআই আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অন্য তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
৫. রামপুরা-বনশ্রী হত্যাকাণ্ড — ২৮ জুন ২০২৬ ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। চঞ্চল চন্দ্র সরকার ২০ বছরের কারাদণ্ড এবং তরিকুল ইসলাম ভূঁইয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পান।
৬. হাসানুল হক ইনু মামলা — ৩০ জুন ২০২৬ জাসদ সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে আটটি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে দোষী সাব্যস্ত করে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বাকি পাঁচটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়।
৭. ওবায়দুল কাদের মামলা — ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাদ্দাম হোসেন এবং শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান—এই সাতজনকেই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২২ জন
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২২ জন পৃথক ব্যক্তি হলেন: ১. শেখ হাসিনা — সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি
২. আসাদুজ্জামান খান কামাল — সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
৩. ওবায়দুল কাদের — আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক
৪. আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম — আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
৫. মোহাম্মদ আলী আরাফাত — সাবেক প্রতিমন্ত্রী
৬. শেখ ফজলে শামস পরশ — যুবলীগ সভাপতি
৭. মাইনুল হোসেন খান নিখিল — যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক
৮. সাদ্দাম হোসেন — ছাত্রলীগ সভাপতি
৯. শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান — ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক
১০. মো. সাইফুল ইসলাম — ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য
১১. রনি ভূঁইয়া — যুবলীগ ক্যাডার
১২. হাবিবুর রহমান — ডিএমপির সাবেক কমিশনার
১৩. সুদীপ কুমার চক্রবর্তী — ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার
১৪. শাহ আলম মোহাম্মদ আখতারুল ইসলাম — ডিএমপির সাবেক এডিসি
১৫. এএফএম সায়েদ — আশুলিয়া থানার সাবেক ওসি
১৬. আব্দুল মালেক — আশুলিয়া থানার সাবেক এসআই
১৭. বিশ্বজিৎ সাহা — আশুলিয়া থানার সাবেক এএসআই
১৮. মুকুল চোখদার — সাবেক পুলিশ কনস্টেবল
১৯. আমির হোসেন — সাবেক পুলিশ এএসআই
২০. সুজন চন্দ্র রায় — সাবেক পুলিশ কনস্টেবল
২১. মো. রাশেদুল ইসলাম — ডিএমপির সাবেক এডিসি
২২. মো. মশিউর রহমান — রামপুরা থানার সাবেক ওসি
নোট: হাবিবুর রহমান চানঁখারপুল ও রামপুরা—উভয় মামলার রায়েই অভিযুক্ত হয়েছেন। তাই দুটি পৃথক মৃত্যুদণ্ড দেওয়া সত্ত্বেও ২২ জনের হিসাবে তাকে একবারই গণনা করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের ব্যক্তিবর্গ
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২২ জনের মধ্যে ১১ জন আওয়ামী লীগ বা এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী: শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাদ্দাম হোসেন, শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, সাইফুল ইসলাম এবং রনি ভূঁইয়া।
বাকি ১১ জন পুলিশ কর্মকর্তা।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২২ জন আসামির মধ্যে চারজন বর্তমানে কারাগারে আছেন এবং ১৮ জন পলাতক রয়েছেন। কারাগারে থাকা চারজন হলেন—আশুলিয়া মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আব্দুল মালেক ও মুকুল চোখদার এবং আবু সাঈদ মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আমির হোসেন ও সুজন চন্দ্র রায়।
